Dhaka ০৬:১০ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

সংবিধান সংস্কারের নামে সরকার অপচেষ্টা চালাচ্ছে: গোলাম পরওয়ার

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ০১:১৯:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
  • ১৪ বার দেখা হয়েছে

রাষ্ট্রীয় সংবিধান সংস্কারের নাম করে বর্তমান সরকার জাতীয় সংসদে এক ধরনের গভীর অপচেষ্টা ও প্রহসন চালিয়ে যাচ্ছে বলে সরাসরি গুরুতর অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

তিনি অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে, সরকারের এই ধরনের বিতর্কিত ও একপেশে প্রক্রিয়া মূলত ঐতিহাসিক ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ও জনগণের রক্তের সাথে প্রকাশ্য বিশ্বাসঘাতকতার সম্পূর্ণ সমতুল্য। তাই সরকারের উচিত অবিলম্বে সমস্ত বেআইনি ও ভুয়া পথ থেকে সরে এসে দ্রুত ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের’ আনুষ্ঠানিক অধিবেশন আহ্বান করা।

আজ রবিবার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কঠোর মন্তব্য করেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার তাঁর মূল্যবান বক্তব্যে বলেন, “আজকের এই বিশেষ আলোচনা সভায় দেশের বরেণ্য অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও খ্যাতিমান আইনজীবীরা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও মূল্যবান আলোচনা উপস্থাপন করেছেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, দেশের সচেতন জাতির সামনে নতুন করে আর কিছু বিশদভাবে বোঝানোর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। এ দেশের আপামর জনসাধারণ এখন খুব ভালোভাবেই বুঝে গেছে যে, সরকার নিজেদের পায়ের তলার রাজনৈতিক মাটি সরে যেতে দেখে দিশেহারা হয়ে পড়েছে এবং আবোল-তাবোল কথা বলে নানামুখী প্রতারণার মাধ্যমে জাতিকে কোন অন্ধকার গহ্বরের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।”

সরকারের বর্তমান সংসদীয় কার্যক্রমের সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, “আজকে বিশেষ কমিটির নামে জাতীয় সংসদে সালাহউদ্দিন সাহেবের সরাসরি নেতৃত্বে সংবিধান সংশোধনের আড়ালে যে গভীর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে, সেখানে বসে মূলত জুলাই সনদের সাথে বেঈমানি করা যায়—এমন সব নতুন নতুন ক্ষতিকর চিন্তাচর্চা করা হচ্ছে। আপনারা নানান মহলের সাথে গোপন বৈঠক ও আলোচনা করে এখন জাতির সামনে সম্পূর্ণ নতুন সব ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। স্পিকারকে পদোন্নতি দিয়ে কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান করা যায় কি না কিংবা অন্য কোনো ফন্দি আঁটা যায় কি না—এমন নানান কায়দা-কানুনের চিন্তা আপনারা করছেন, যা শহীদদের রক্তের স্মৃতির সাথে চরমতম বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।”

বাংলাদেশের সংবিধানের সুনির্দিষ্ট ১৫২ অনুচ্ছেদের আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরে জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা বলেন, “সালাহউদ্দিন সাহেব সংসদে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে আজকে নিজে তার সভাপতিত্ব করছেন এবং সম্পূর্ণ অনৈতিক পন্থায় যে প্রক্রিয়া শুরু করেছেন, তা প্রচলিত আইনের দৃষ্টিতে এবং খোদ বাংলাদেশের সংবিধানের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বেআইনি। আমি জানতে চাই, আপনারা কোন ক্ষমতাবলে এই বেআইনি কাজ শুরু করেছেন?”

তিনি আরও যোগ করেন, “আমাদের দেশের সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যেকোনো ধরনের প্রেসিডেনশিয়াল অর্ডার বা জারি করা অর্ডিন্যান্স বাংলাদেশের সংবিধানের বিধান অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ আইনের মর্যাদা লাভ করবে। গত ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর যে ঐতিহাসিক প্রেসিডেনশিয়াল বা রাষ্ট্রপতির আদেশ জারি হয়েছিল, সেই আদেশের ভেতরেই স্পষ্টভাবে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন, গণভোট এবং জাতীয় নির্বাচনের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি নিখুঁতভাবে সন্নিবেশিত ছিল। এমনকি তার প্রায় ১২ দিন পরে অর্থাৎ ২৫ নভেম্বর গণভোটের আয়োজনের জন্য সুনির্দিষ্ট আরেকটি অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এই উভয় আদেশই আইনিভাবে পূর্ণাঙ্গ বৈধতা ও মর্যাদা পেয়েছে।”

জুলাই জাতীয় সনদের মূল ভিত্তির ওপর আয়োজিত গণভোটের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “পুরো জুলাই সনদের মৌলিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে সুনির্দিষ্ট চারটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের মাধ্যমে দেশজুড়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সে সময় দেশের সাধারণ মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেই ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদান করেছে। জুলাই সনদের প্রতি ঐতিহাসিক সম্মতি এবং এই গণভোটের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মূলত সংবিধান সংস্কার পরিষদসংক্রান্ত তৎকালীন রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশটি আইনগতভাবে অনুমোদিত হয়ে গেছে। ফলে বিএনপির পক্ষ থেকে পূর্বে দেওয়া সমস্ত ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত ওই গণভোটের রায়ের মধ্য দিয়ে চিরতরে খারিজ হয়ে গেছে।”

তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন, “বর্তমান সরকারকে যেকোনো মূল্যে এখন সংবিধান সংস্কার করতেই হবে। গত ১৩ নভেম্বরের নির্ধারিত আইনি কাঠামো এবং প্রেসিডেনশিয়াল অর্ডারে যে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেই অনুযায়ী অবিলম্বে একটি স্বাধীন ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করে এই পরিষদকে দিয়ে পরবর্তী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এর বাইরে অন্য কোনো মনগড়া ফোরাম বা বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের যেকোনো উদ্যোগ নেওয়ার অর্থ হলো সরাসরি সংবিধান ও জনগণের সাথে প্রতারণা করা।”

বিরোধী দলের ওপর ব্যর্থতা চাপানোর সরকারি অপপ্রচারের তীব্র সমালোচনা করে গোলাম পরওয়ার বলেন, “আপনারা এখন বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে নির্লজ্জের মতো বলছেন যে, বিরোধী দল নাকি সরকারকে কোনো সহযোগিতা করছে না। আপনারা উচ্চকক্ষে আপনাদের নিজস্ব স্পিকারকে উপরাষ্ট্রপতি বানালে কেমন হয় কিংবা স্পিকারকে কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান করলে কেমন হয়—এমন সব অদ্ভুত চিন্তা ও কাল্পনিক ন্যারেটিভ তৈরি করে চলেছেন। আপনাদের দলীয় সাগরেদদের নিয়ে আপনারা যেসব অবাস্তব চিন্তাভাবনার জন্ম দিচ্ছেন, তার মাধ্যমে আপনারা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়েছেন।”

বর্তমান সরকারের উদ্দেশে তিনি কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “জনসাধারণের সাথে আর কোনো ধরনের প্রতারণা বা লুকোচুরি করা চলবে না। অবিলম্বে এই সমস্ত বেআইনি ও একপেশে প্রক্রিয়া চিরতরে বন্ধ করে জাতীয় সংসদে ফিরে আসুন। এখনও যথেষ্ট সময় হাতে রয়েছে, দেরি না করে অবিলম্বে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের’ আনুষ্ঠানিক অধিবেশন ডাকুন। সেখানেই তো পুরো জুলাই জাতীয় সনদ গণভোটে বিপুল ভোটে পাস হয়ে গেছে, সমস্ত ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট বহু আগেই খারিজ হয়ে গেছে। এখন আর নতুন করে কোনো বিশেষ কমিটির কোনো প্রয়োজন নেই। এ দেশের সচেতন জনগণ সেই কমিটি অনেক আগেই গঠন করে দিয়েছে, আর সেই সাংবিধানিক কমিটিই হলো—‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’।”

সরকারের প্রতি অনতিবিলম্বে বোধোদয়ের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আপনারা অবিলম্বে সমস্ত বেআইনি ও ভুল পথ থেকে ফিরে আসুন। নিজেদের জন্মগত ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢাককোর জন্য অহেতুক বিরোধী দলের ওপর কোনো কাল্পনিক দায় চাপানোর চেষ্টা করবেন না। আমাদের দলের শীর্ষ নেতারা আগেই জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন যে, এই জুলাই সনদ অনুযায়ী আপনারা সংবিধান সংস্কার করুন, দেশের বিরোধী দল আপনাদের সব ধরনের গঠনমূলক সহযোগিতা প্রদান করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। তাহলে কেন আপনারা বিনা কারণে বিরোধী দলকে এর জন্য দায়ী করছেন? আপনাদের যাবতীয় অনৈতিক ও বেআইনি কাজকে ধামাচাপা দিতে সাহায্য করার জন্য জাতীয় সংসদের বিরোধী দল কখনোই কোনো ধরনের সহায়ক ভূমিকা পালন করবে না।”

পরিশেষে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের ঐতিহাসিক দিনটির কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “জুলাই সনদ যেমন আমরা বিগত ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর অত্যন্ত আশাবাদ নিয়ে স্বাক্ষর করেছিলাম, সেখান থেকে ইতিমধ্যে প্রায় চার মাস সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। এরপর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, আপনারা দলবেঁধে মন্ত্রী হয়েছেন, কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। আপনারা ক্ষমতায় কুর্সিতে বসে আজ পর্যন্ত কখনো এই রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশের বিরুদ্ধে একটি টু শব্দ পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি। একই দিনে সাংবিধানিক নিয়মে দুটি ভোট সম্পন্ন হলো; যার মধ্যে একটি অংশ সানন্দে মেনে নিয়ে আপনারা দিব্যি মন্ত্রীত্বের লোভনীয় স্বাদ নিলেন, অথচ আরেকটি মৌলিক অংশ সম্পূর্ণ অস্বীকার করলেন। নিজের অতীতে দেওয়া স্বাক্ষর ও রাজনৈতিক অবস্থানকে অস্বীকার করার চেয়ে বড় কোনো জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতা বা প্রতারণা আর কিছু হতে পারে না।”

জনপ্রিয়

মোংলা বন্দরে দুটি আধুনিক কন্টেইনার জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী

সংবিধান সংস্কারের নামে সরকার অপচেষ্টা চালাচ্ছে: গোলাম পরওয়ার

সর্বশেষ হালনাগাদ : ০১:১৯:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

রাষ্ট্রীয় সংবিধান সংস্কারের নাম করে বর্তমান সরকার জাতীয় সংসদে এক ধরনের গভীর অপচেষ্টা ও প্রহসন চালিয়ে যাচ্ছে বলে সরাসরি গুরুতর অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

তিনি অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে, সরকারের এই ধরনের বিতর্কিত ও একপেশে প্রক্রিয়া মূলত ঐতিহাসিক ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ও জনগণের রক্তের সাথে প্রকাশ্য বিশ্বাসঘাতকতার সম্পূর্ণ সমতুল্য। তাই সরকারের উচিত অবিলম্বে সমস্ত বেআইনি ও ভুয়া পথ থেকে সরে এসে দ্রুত ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের’ আনুষ্ঠানিক অধিবেশন আহ্বান করা।

আজ রবিবার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কঠোর মন্তব্য করেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার তাঁর মূল্যবান বক্তব্যে বলেন, “আজকের এই বিশেষ আলোচনা সভায় দেশের বরেণ্য অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও খ্যাতিমান আইনজীবীরা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও মূল্যবান আলোচনা উপস্থাপন করেছেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, দেশের সচেতন জাতির সামনে নতুন করে আর কিছু বিশদভাবে বোঝানোর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। এ দেশের আপামর জনসাধারণ এখন খুব ভালোভাবেই বুঝে গেছে যে, সরকার নিজেদের পায়ের তলার রাজনৈতিক মাটি সরে যেতে দেখে দিশেহারা হয়ে পড়েছে এবং আবোল-তাবোল কথা বলে নানামুখী প্রতারণার মাধ্যমে জাতিকে কোন অন্ধকার গহ্বরের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।”

সরকারের বর্তমান সংসদীয় কার্যক্রমের সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, “আজকে বিশেষ কমিটির নামে জাতীয় সংসদে সালাহউদ্দিন সাহেবের সরাসরি নেতৃত্বে সংবিধান সংশোধনের আড়ালে যে গভীর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে, সেখানে বসে মূলত জুলাই সনদের সাথে বেঈমানি করা যায়—এমন সব নতুন নতুন ক্ষতিকর চিন্তাচর্চা করা হচ্ছে। আপনারা নানান মহলের সাথে গোপন বৈঠক ও আলোচনা করে এখন জাতির সামনে সম্পূর্ণ নতুন সব ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। স্পিকারকে পদোন্নতি দিয়ে কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান করা যায় কি না কিংবা অন্য কোনো ফন্দি আঁটা যায় কি না—এমন নানান কায়দা-কানুনের চিন্তা আপনারা করছেন, যা শহীদদের রক্তের স্মৃতির সাথে চরমতম বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।”

বাংলাদেশের সংবিধানের সুনির্দিষ্ট ১৫২ অনুচ্ছেদের আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরে জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা বলেন, “সালাহউদ্দিন সাহেব সংসদে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে আজকে নিজে তার সভাপতিত্ব করছেন এবং সম্পূর্ণ অনৈতিক পন্থায় যে প্রক্রিয়া শুরু করেছেন, তা প্রচলিত আইনের দৃষ্টিতে এবং খোদ বাংলাদেশের সংবিধানের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বেআইনি। আমি জানতে চাই, আপনারা কোন ক্ষমতাবলে এই বেআইনি কাজ শুরু করেছেন?”

তিনি আরও যোগ করেন, “আমাদের দেশের সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যেকোনো ধরনের প্রেসিডেনশিয়াল অর্ডার বা জারি করা অর্ডিন্যান্স বাংলাদেশের সংবিধানের বিধান অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ আইনের মর্যাদা লাভ করবে। গত ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর যে ঐতিহাসিক প্রেসিডেনশিয়াল বা রাষ্ট্রপতির আদেশ জারি হয়েছিল, সেই আদেশের ভেতরেই স্পষ্টভাবে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন, গণভোট এবং জাতীয় নির্বাচনের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি নিখুঁতভাবে সন্নিবেশিত ছিল। এমনকি তার প্রায় ১২ দিন পরে অর্থাৎ ২৫ নভেম্বর গণভোটের আয়োজনের জন্য সুনির্দিষ্ট আরেকটি অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এই উভয় আদেশই আইনিভাবে পূর্ণাঙ্গ বৈধতা ও মর্যাদা পেয়েছে।”

জুলাই জাতীয় সনদের মূল ভিত্তির ওপর আয়োজিত গণভোটের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “পুরো জুলাই সনদের মৌলিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে সুনির্দিষ্ট চারটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের মাধ্যমে দেশজুড়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সে সময় দেশের সাধারণ মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেই ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদান করেছে। জুলাই সনদের প্রতি ঐতিহাসিক সম্মতি এবং এই গণভোটের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মূলত সংবিধান সংস্কার পরিষদসংক্রান্ত তৎকালীন রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশটি আইনগতভাবে অনুমোদিত হয়ে গেছে। ফলে বিএনপির পক্ষ থেকে পূর্বে দেওয়া সমস্ত ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত ওই গণভোটের রায়ের মধ্য দিয়ে চিরতরে খারিজ হয়ে গেছে।”

তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন, “বর্তমান সরকারকে যেকোনো মূল্যে এখন সংবিধান সংস্কার করতেই হবে। গত ১৩ নভেম্বরের নির্ধারিত আইনি কাঠামো এবং প্রেসিডেনশিয়াল অর্ডারে যে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেই অনুযায়ী অবিলম্বে একটি স্বাধীন ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করে এই পরিষদকে দিয়ে পরবর্তী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এর বাইরে অন্য কোনো মনগড়া ফোরাম বা বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের যেকোনো উদ্যোগ নেওয়ার অর্থ হলো সরাসরি সংবিধান ও জনগণের সাথে প্রতারণা করা।”

বিরোধী দলের ওপর ব্যর্থতা চাপানোর সরকারি অপপ্রচারের তীব্র সমালোচনা করে গোলাম পরওয়ার বলেন, “আপনারা এখন বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে নির্লজ্জের মতো বলছেন যে, বিরোধী দল নাকি সরকারকে কোনো সহযোগিতা করছে না। আপনারা উচ্চকক্ষে আপনাদের নিজস্ব স্পিকারকে উপরাষ্ট্রপতি বানালে কেমন হয় কিংবা স্পিকারকে কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান করলে কেমন হয়—এমন সব অদ্ভুত চিন্তা ও কাল্পনিক ন্যারেটিভ তৈরি করে চলেছেন। আপনাদের দলীয় সাগরেদদের নিয়ে আপনারা যেসব অবাস্তব চিন্তাভাবনার জন্ম দিচ্ছেন, তার মাধ্যমে আপনারা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়েছেন।”

বর্তমান সরকারের উদ্দেশে তিনি কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “জনসাধারণের সাথে আর কোনো ধরনের প্রতারণা বা লুকোচুরি করা চলবে না। অবিলম্বে এই সমস্ত বেআইনি ও একপেশে প্রক্রিয়া চিরতরে বন্ধ করে জাতীয় সংসদে ফিরে আসুন। এখনও যথেষ্ট সময় হাতে রয়েছে, দেরি না করে অবিলম্বে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের’ আনুষ্ঠানিক অধিবেশন ডাকুন। সেখানেই তো পুরো জুলাই জাতীয় সনদ গণভোটে বিপুল ভোটে পাস হয়ে গেছে, সমস্ত ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট বহু আগেই খারিজ হয়ে গেছে। এখন আর নতুন করে কোনো বিশেষ কমিটির কোনো প্রয়োজন নেই। এ দেশের সচেতন জনগণ সেই কমিটি অনেক আগেই গঠন করে দিয়েছে, আর সেই সাংবিধানিক কমিটিই হলো—‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’।”

সরকারের প্রতি অনতিবিলম্বে বোধোদয়ের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আপনারা অবিলম্বে সমস্ত বেআইনি ও ভুল পথ থেকে ফিরে আসুন। নিজেদের জন্মগত ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢাককোর জন্য অহেতুক বিরোধী দলের ওপর কোনো কাল্পনিক দায় চাপানোর চেষ্টা করবেন না। আমাদের দলের শীর্ষ নেতারা আগেই জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন যে, এই জুলাই সনদ অনুযায়ী আপনারা সংবিধান সংস্কার করুন, দেশের বিরোধী দল আপনাদের সব ধরনের গঠনমূলক সহযোগিতা প্রদান করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। তাহলে কেন আপনারা বিনা কারণে বিরোধী দলকে এর জন্য দায়ী করছেন? আপনাদের যাবতীয় অনৈতিক ও বেআইনি কাজকে ধামাচাপা দিতে সাহায্য করার জন্য জাতীয় সংসদের বিরোধী দল কখনোই কোনো ধরনের সহায়ক ভূমিকা পালন করবে না।”

পরিশেষে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের ঐতিহাসিক দিনটির কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “জুলাই সনদ যেমন আমরা বিগত ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর অত্যন্ত আশাবাদ নিয়ে স্বাক্ষর করেছিলাম, সেখান থেকে ইতিমধ্যে প্রায় চার মাস সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। এরপর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, আপনারা দলবেঁধে মন্ত্রী হয়েছেন, কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। আপনারা ক্ষমতায় কুর্সিতে বসে আজ পর্যন্ত কখনো এই রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশের বিরুদ্ধে একটি টু শব্দ পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি। একই দিনে সাংবিধানিক নিয়মে দুটি ভোট সম্পন্ন হলো; যার মধ্যে একটি অংশ সানন্দে মেনে নিয়ে আপনারা দিব্যি মন্ত্রীত্বের লোভনীয় স্বাদ নিলেন, অথচ আরেকটি মৌলিক অংশ সম্পূর্ণ অস্বীকার করলেন। নিজের অতীতে দেওয়া স্বাক্ষর ও রাজনৈতিক অবস্থানকে অস্বীকার করার চেয়ে বড় কোনো জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতা বা প্রতারণা আর কিছু হতে পারে না।”