দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশ বুলগেরিয়া ১ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোজোনে যোগ দিতে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে দেশটি ইউরো ব্যবহারকারী ২১তম সদস্য রাষ্ট্রে পরিণত হবে। তবে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে দেশটির ভেতরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেক বুলগেরিয়ান আশঙ্কা করছেন, ইউরো গ্রহণের ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং জাতীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারিয়ে যাবে।
২০০৭ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিলেও দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্নীতির অভিযোগের কারণে এত দিন ইউরোজোনে প্রবেশ করতে পারেনি বুলগেরিয়া। অবশেষে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দেশটি প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ও আইনি শর্ত পূরণ করেছে বলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিশ্চিত করে। এরপর ইউরোপীয় কাউন্সিল, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও আর্থিক বিষয়ক কাউন্সিল আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়।
ইউরো গ্রহণের ফলে ইউরোপে একক মুদ্রা ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৩৫ কোটি ৬০ লাখে। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো কৃষ্ণ সাগর অঞ্চলে ইউরোর বিস্তার ঘটবে। তবে বুলগেরিয়ার মতো ইউরোপীয় ইউনিয়নের দরিদ্রতম দেশের একটি অংশ মনে করছে, এই পরিবর্তন অর্থনৈতিক সংকট ডেকে আনতে পারে।
দেশটিতে সরকারের প্রতি আস্থাহীনতাও এই বিতর্ককে আরও ঘনীভূত করেছে। গত ডিসেম্বরে প্রস্তাবিত বাজেটে কর বৃদ্ধির পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে ক্ষমতাসীন জোট সরকার পদত্যাগে বাধ্য হয়। বাজেট প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হলেও আন্দোলন থামেনি, বরং তা দুর্নীতিবিরোধী ও রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে রূপ নেয়।
ইউরোজোনে যোগ দিতে হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মাস্ট্রিখ্ট চুক্তি অনুযায়ী পাঁচটি শর্ত পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে মূল্যস্ফীতি, বাজেট ঘাটতি, সরকারি ঋণ, বিনিময় হার ও সুদের হার সংক্রান্ত মানদণ্ড। এসব শর্ত পূরণের পরই বুলগেরিয়াকে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়।
নির্ধারিত বিনিময় হার অনুযায়ী, ১ ইউরোর মূল্য ধরা হয়েছে ১ দশমিক ৯৫৫৮৩ বুলগেরিয়ান লেভ। বাস্তবে ১৯৯৯ সাল থেকেই লেভ কার্যত ইউরোর সঙ্গে যুক্ত ছিল, কারণ তার আগে বুলগেরিয়া নিজেদের মুদ্রাকে জার্মান মার্কের সঙ্গে বেঁধে দিয়েছিল। এ কারণে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, ইউরো গ্রহণে বাস্তব পরিবর্তন আশঙ্কার তুলনায় কম হতে পারে।
রূপান্তর প্রক্রিয়ায় ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত দোকানে পণ্যের দাম লেভ ও ইউরো—দুই মুদ্রাতেই দেখানো হবে। জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত লেভ লেনদেনেও ব্যবহার করা যাবে। ছয় মাসের জন্য ব্যাংক ও ডাকঘরে বিনা খরচে লেভ বদলে ইউরো নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
তবু জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, দেশটির জনগণ এ বিষয়ে প্রায় সমানভাবে বিভক্ত। ২০২৫ সালের মে মাসে করা এক জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৪৬ শতাংশ মানুষ ইউরো গ্রহণের পক্ষে, আর প্রায় একই সংখ্যক মানুষ বিপক্ষে। বিরোধিতাকারীদের বড় অংশ গ্রাম ও ছোট শহরের বাসিন্দা, যাঁদের মধ্যে অনেকেই বয়স্ক।
ইউরো বিরোধিতার প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দাম বাড়ার আশঙ্কা, ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং মজুরি হ্রাসের ভয়। যদিও ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবি, ইউরো গ্রহণে মূল্যস্ফীতির প্রভাব খুবই সীমিত থাকবে।
এ ছাড়া অনেকের আশঙ্কা, ইউরো চালু হলে বুলগেরিয়ান পরিচয়ের একটি প্রতীক হারিয়ে যাবে। লেভ নোটে দেশটির বিখ্যাত শিল্পী ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের ছবি রয়েছে, যা জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
গত চার বছরে সাতবার জাতীয় নির্বাচন হওয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতাও জনগণের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রেসিডেন্ট রুমেন রাদেভ ইউরো গ্রহণ নিয়ে গণভোটের প্রস্তাব দিলেও সংসদ তা নাকচ করে দেয়।
ইউরো বিরোধী দলগুলো, বিশেষ করে রাশিয়াপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলো, দাবি করছে ইউরো গ্রহণ করলে বুলগেরিয়ার আর্থিক সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হবে এবং দেশটি ব্রাসেলসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। অন্যদিকে ব্যবসায়ী মহল ও পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্তরা মনে করছেন, ইউরো চালু হলে সীমান্তপারের বাণিজ্য সহজ হবে এবং অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব সদস্য রাষ্ট্রের জন্য ইউরো গ্রহণ আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক হলেও নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। বর্তমানে ছয়টি দেশ এখনো নিজেদের জাতীয় মুদ্রা ধরে রেখেছে। তবে বুলগেরিয়ার সিদ্ধান্ত ইউরোপের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
















