যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়ায় একের পর এক আফ্রিকান দেশ পাল্টা ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। সর্বশেষ মালি ও বুরকিনা ফাসো ঘোষণা দিয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য ভিসা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তকে তারা ‘পারস্পরিকতার নীতি’ অনুযায়ী পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।
মালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র যেসব শর্ত ও বিধিনিষেধ মালির নাগরিকদের ওপর আরোপ করেছে, একই নিয়ম এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। একই সুরে বুরকিনা ফাসোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী করামোকো জঁ-মারি ত্রাওরে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের জবাব হিসেবেই এই নিষেধাজ্ঞা।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন নতুন ভিসা নির্দেশনা জারি করে, যার আওতায় আফ্রিকা, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার মোট ৩৯টি দেশের নাগরিকদের ওপর পূর্ণ বা আংশিক ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই তালিকায় মালি ও বুরকিনা ফাসোর পাশাপাশি লাওস, নাইজার, সিয়েরা লিওন, দক্ষিণ সুদান ও সিরিয়ার নাম রয়েছে। এ ছাড়া ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের দেওয়া ভ্রমণ নথিপত্রধারীদেরও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব দেশের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা যাচাই, তথ্য আদান–প্রদান, ভিসার মেয়াদ শেষে ফিরে না যাওয়া এবং নিজ দেশের নাগরিকদের ফেরত নিতে অনীহার মতো বিষয়গুলো সমস্যা তৈরি করছে। কিছু ক্ষেত্রে সন্ত্রাসী তৎপরতার উপস্থিতিকেও কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগেই আফ্রিকার কয়েকটি দেশ পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। নাইজার যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞার জবাবে মার্কিন নাগরিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর আগে জুন মাসে চাদও একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে কিছু ছাড় রাখা হয়।
মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজার—এই তিন দেশই বর্তমানে সামরিক শাসনের অধীনে এবং দীর্ঘদিন ধরে আল-কায়েদা ও আইএসআইএস সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতার শিকার। নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় তারা ২০২৪ সালে ‘অ্যালায়েন্স অব সাহেল স্টেটস’ গঠন করে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আফ্রিকার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতি অনেকটাই তার প্রথম মেয়াদের মতো, যখন তথাকথিত ‘মুসলিম নিষেধাজ্ঞা’ জারি হয়েছিল। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ৩৯ দেশের মধ্যে ২৬টিই আফ্রিকার।
ভিসা ইস্যুর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র-আফ্রিকা বাণিজ্য ও সহায়তা সম্পর্কেও টানাপোড়েন চলছে। যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকান গ্রোথ অ্যান্ড অপরচুনিটি অ্যাক্টের মেয়াদ বাড়ায়নি, ফলে অনেক আফ্রিকান দেশ শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা হারিয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সহায়তা কমানোর সিদ্ধান্তে স্বাস্থ্য ও মানবিক খাতে সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা।
এ পরিস্থিতিতে আফ্রিকান দেশগুলোর পাল্টা ভিসা নিষেধাজ্ঞা শুধু কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়াই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক আফ্রিকা নীতির প্রতি বাড়তে থাকা অসন্তোষেরও প্রতিফলন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
















