একজন মাত্র ক্রিকেটার হলেও তাঁকে ঘিরে আবেগ, উন্মাদনা ও ভালোবাসার ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে গোটা একটি প্রবাসী কমিউনিটিতে। বাংলাদেশের বিশ্বখ্যাত পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে কেন্দ্র করে এবার ঠিক এমনই এক অভূতপূর্ব ও আবেগঘন দৃশ্যের অপেক্ষায় রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার ক্রীড়া নগরী মেলবোর্ন। অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় টি-টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ বিগ ব্যাশে বাংলাদেশের এই তারকা বাঁহাতি পেসারের বর্ণাঢ্য অভিষেককে কেন্দ্র করে কেবল মাঠের ভেতরকার কৌশলগত প্রস্তুতিই নয়, বরং সুদূর গ্যালারিতেও তৈরি করা হচ্ছে এক ব্যতিক্রমী ও উৎসবমুখর আবহ। প্রবাসী বাংলাদেশি সমর্থকদের জন্য ঐতিহাসিক মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে (এমসিজি) সম্পূর্ণ আলাদা এবং বিশেষ একটি গ্যালারির ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে মেলবোর্ন রেনেগেডস!
ফ্র্যাঞ্চাইজিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ‘দ্য ফিজ বে’ নামের এই বিশেষ ও ব্যতিক্রমী আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হলো সুদূর প্রবাসে বসবাসকারী হাজার হাজার বাংলাদেশি সমর্থককে একই ছাদের নিচে, অর্থাৎ নির্দিষ্ট একটি গ্যালারিতে একত্রিত করা। আগামী বছরের ১ এবং ১৬ জানুয়ারি এমসিজিতে মেলবোর্ন রেনেগেডসের নির্ধারিত ম্যাচগুলোকে কেন্দ্র করেই মূলত এই বিশেষ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে। এর ফলে মাঠে বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুরের দুর্দান্ত বোলিং পারফরম্যান্স উপভোগ করার পাশাপাশি গ্যালারিতে উপস্থিত প্রবাসী বাংলাদেশিরা নিজেদের মতো করে নিজেদের ভাষায় ও ভঙ্গিতে দল ও খেলোয়াড়কে জোরালো সমর্থন জানানোর দুর্দান্ত সুযোগ পাবেন।
এই পুরো আয়োজনটিকে আরও বেশি আকর্ষণীয় ও জনমুখী করে তুলতে টিকিটের মূল্যেও রাখা হয়েছে আকর্ষণীয় বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা। আগ্রহী দর্শকরা ‘FIZZBAY’ নামের নির্ধারিত এই প্রোমো কোড ব্যবহার করে প্রথম ২০০টি ফ্যামিলি বা পরিবারভিত্তিক টিকিট ক্রয় করলেই সরাসরি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বিশাল ছাড় উপভোগ করতে পারবেন। ফলে খুব সহজেই তুলনামূলক কম খরচে ঘরের মাঠে বসে মুস্তাফিজকে সরাসরি চোখের সামনে দেখতে স্টেডিয়ামে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হচ্ছে ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য। মেলবোর্ন রেনেগেডসের এমন উদ্যোগ থেকে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, তারা কেবল একজন বিশ্বমানের বিদেশি ক্রিকেটারকেই দলে ভেড়ায়নি, বরং তাঁর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত বিশাল এক সমর্থকগোষ্ঠী ও কমিউনিটিকেও নিজেদের আপন করে পাশে টানতে চায়।
আসন্ন বিগ ব্যাশ লিগের ১৬তম আসরে এই প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছেন কাটার মাস্টার খ্যাত মুস্তাফিজুর রহমান। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং নিজের বলের গতি ও বৈচিত্র্য নিখুঁতভাবে পরিবর্তনের অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে বিশ্বের অন্যান্য বোলারদের চেয়ে সবসময়ই এক আলাদা উচ্চতায় রেখেছে। তাঁর নিখুঁত কাটার এবং ধূর্ত স্লোয়ারের দারুণ মিশেলে বিশ্বমানের যেকোনো ব্যাটারের ব্যাটিং ছন্দ মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করে দিতে জুড়ি মেলা ভার। এর পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নামী-দামী ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে দীর্ঘদিন ধরে খেলে আসার পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে।
মুস্তাফিজের মতো একজন পরীক্ষিত পারফর্মারকে নিজেদের স্কোয়াডে যুক্ত করতে পেরে ভীষণ আশাবাদী ও আনন্দিত মেলবোর্ন রেনেগেডসের প্রধান কোচ লুক রনকি। প্রধান কোচ বিশ্বাস করেন যে, বাংলাদেশের এই অভিজ্ঞ পেসার ম্যাচের যেকোনো সংকটময় বা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলের জন্য কাঙ্ক্ষিত উইকেট এনে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের দলের সামগ্রিক বোলিং আক্রমণে সম্পূর্ণ নতুন ও ভয়ংকর এক মাত্রা যোগ করবেন। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের স্নায়ুক্ষয়ী চাপের মুহূর্তগুলোতে মুস্তাফিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দলটিকে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এনে দিতে বড় ভূমিকা রাখবে বলেই জোরালো বিশ্বাস করছে ফ্র্যাঞ্চাইজি ম্যানেজমেন্ট।
মূলত মেলবোর্ন রেনেগেডসের স্কোয়াডে মুস্তাফিজের এই অন্তর্ভুক্তি ও দলবদলের নেপথ্যে বড় কারণ ছিল তাদের দলের বোলিং বিভাগে একজন নির্ভরযোগ্য বাঁহাতি পেসারের তীব্র প্রয়োজনীয়তা। দলের নিয়মিত তারকা বোলার জেসন বেহরেনডর্ফ ইনজুরির কারণে দল থেকে ছিটকে যাওয়ায় তাঁরা একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ বাঁহাতি পেসারের খোঁজ করছিলেন, ঠিক সেই সংকটকালেই সঠিক বিকল্প হিসেবে মুস্তাফিজকে বেছে নেওয়া হয়েছে। এখন সম্পূর্ণ নতুন এই ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে নিজের অর্জিত সামর্থ্য শতভাগ প্রমাণ করার পাশাপাশি দলের আস্থার প্রতিদান দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সফলভাবে পালন করতে হবে তাঁকে।
তবে বিগ ব্যাশের পিচে বল হাতে নামার ঠিক আগমুহূর্তে বেশ ব্যস্ত সময় পার করতে হবে মুস্তাফিজকে। এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মর্যাদাপূর্ণ আইএলটি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে ব্যস্ততা রয়েছে তাঁর। সেখানে দুবাই ক্যাপিটালসের হয়ে নির্ধারিত ম্যাচগুলোর খেলা শেষ করেই সরাসরি রেনেগেডস শিবিরে এসে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। ফলে দলের সঙ্গে তাঁর ঠিক কোন সময়ে চূড়ান্ত যোগাদান ঘটে এবং কোন ম্যাচে তিনি মাঠে নামেন, তা নিয়ে ক্রিকেটপ্রেমী ও সমর্থকদের আগ্রহের অন্ত থাকবে না।
ক্রিকেটীয় হিসাব-নিকাশ বা রণকৌশলের বাইরেও মুস্তাফিজকে কেন্দ্র করে এমসিজির এই বিশেষ আয়োজনটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে কেবল একটি খেলা নয়, বরং প্রবাসের মাটিতে দেশের একজন কৃতি সন্তানকে ঘিরে একসঙ্গে মিলিত হওয়ার এক অপূর্ব সুযোগ। মাতৃভূমি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও ভিনদেশে বসে দেশের লাল-সবুজ পতাকা হাতে নিয়ে গ্যালারিতে গলা ফাটিয়ে উল্লাস করার এই আনন্দ তাঁদের কাছে সম্পূর্ণ অন্যরকম এক আবেগের নাম!

























