Dhaka ০৬:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

কলমাকান্দায় আবারও দুই রোহিঙ্গার অবৈধ এনআইডি তৈরির অভিযোগ

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ১০:২৬:০২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
  • ১২ বার দেখা হয়েছে

নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসে দুর্নীতির পুরোনো চিত্র আবারও নতুন করে উন্মোচিত হয়েছে। উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে সম্পূর্ণ ভুয়া ও বানোয়াট তথ্য ব্যবহার করে নূর হালিমা (২৫) ও মুজিবুর রহমান নামের দুই রোহিঙ্গা নাগরিকের বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে নূর হালিমার নামে তৈরি হওয়া এনআইডি কার্ডটি গত ১১ আগস্ট সফলভাবে হস্তান্তরও করা হয়েছে। অন্যদিকে, অভিযুক্ত মুজিবুর রহমানের এনআইডি কার্ডের যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে তথ্য আপলোড করা হলেও বিষয়টি স্থানীয়ভাবে জানাজানি হয়ে যাওয়ায় তা এখনো হস্তান্তর করা হয়নি।

নির্বাচন অফিস সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, মুজিবুর রহমানের এনআইডি ফাইলের নম্বর ১২ ২০১১৫০৭৯১ এবং তার স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে রংছাতি ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামকে উল্লেখ করা হয়েছে। নূর হালিমা ও মুজিবুর রহমানের এই দুটি এনআইডি তৈরির সমস্ত কাগজপত্র গত ১১ আগস্ট রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসের নিজস্ব আইডি ব্যবহার করে সার্ভারে আপলোড করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট একটি দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি অনুযায়ী, ওই নির্দিষ্ট রাতে অন্য কোনো ভোটার বা নাগরিকের নয়, বরং কেবল এই দুই রোহিঙ্গার তথ্যই সার্ভারে আপলোড করা হয়েছিল। নূর হালিমার ভুয়া এনআইডিতে বাবা হিসেবে শান্তিনগর গ্রামের ওমর আলী এবং মা হিসেবে তাঁর স্ত্রী শরীফা খাতুনের নাম সুকৌশলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে যে, প্রকৃতিকপক্ষে ওমর আলীর পরিবারে নূর হালিমা নামে কোনো সন্তান বা মেয়ে নেই।

সম্প্রতি স্থানীয় সূত্রে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর নূর হালিমার এনআইডির একটি কপি সংগ্রহ করে সরেজমিন শান্তিনগর গ্রামে গিয়ে ওমর আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ করেন। ওমর আলী জানান যে, তাঁর মোট চার সন্তান রয়েছে—দুই ছেলে (কাওছার মিয়া ও শামীম মিয়া) এবং দুই মেয়ে (আসমা আক্তার ও মাইমুনা আক্তার)। তাঁর পরিবারে নূর হালিমা নামে কোনো মেয়ে বা সন্তান নেই। তিনি আরও জানান যে, কিছুদিন আগে নির্বাচন অফিসের কয়েকজন লোক তাঁর বাড়িতে এসে নূর হালিমা সংক্রান্ত বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং নূর হালিমা নামে তাঁর কোনো মেয়ে নেই মর্মে বিভিন্ন ফরমে তাঁর স্বাক্ষর নেন। এ সময় এলাকার আরও কয়েকজনের স্বাক্ষরও সংগ্রহ করা হয়, যা নিয়ে তিনি চরম সামাজিক বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন। ওমর আলীর ছেলে শামীম মিয়াও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, তাঁদের মা-বাবার জাতীয় পরিচয়পত্র ও ব্যক্তিগত তথ্য সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ব্যবহার করে অন্য এক অচেনা নারীকে তাঁদের বোন বানিয়ে কীভাবে এই এনআইডি তৈরি করা হলো, তা তাঁদের বোধগম্য নয়।

স্থানীয় সচেতন নাগরিক জাবেদ মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে গণমাধ্যমকে জানান যে, আইনগতভাবে এবং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে যেকোনো সাধারণ মানুষের বৈধ এনআইডি তৈরি করতে হলে জন্মনিবন্ধন সনদ, নাগরিক সনদ, বাবা-মায়ের এনআইডিসহ বিভিন্ন ধরনের সত্য ও যাচাইকৃত কাগজপত্র জমা দিতে হয় এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়। তাঁর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ হলো, অফিসিয়াল সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা ও অজান্তে এই ধরনের ভুয়া এনআইডি তৈরি করা কিছুতেই সম্ভব নয়। তাই পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে উচ্চপর্যায়ে তদন্ত করে এর সঙ্গে জড়িত কুচক্রী মহল ও অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির দাবি জানান তিনি। তবে মুজিবুর রহমানের এনআইডির কপি তাৎক্ষণিকভাবে হাতে না পাওয়ায় তাঁর বাবা-মায়ের নাম বিস্তারিত জানা সম্ভব হয়নি।

নির্বাচন অফিসের নিয়ম অনুযায়ী, নতুন ভোটার হওয়ার জন্য জন্মনিবন্ধন সনদ, পিতা-মাতার এনআইডি, নাগরিক সনদ এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার বিভিন্ন সনদ বাধ্যতামূলকভাবে জমা দিতে হয়। পরবর্তীতে এসব নথি যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই ও স্ক্যান করার পর কম্পিউটার অপারেটর নিজ নিজ আইডি ব্যবহার করে তথ্য সার্ভারে প্রাথমিকভাবে সংরক্ষণ বা এন্ট্রি করেন এবং পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কর্মকর্তা তা গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করেন। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটির সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বিস্ফোরক তথ্য দিয়ে জানান যে, নূর হালিমা ও মুজিবুর রহমান উভয়েই মূলত রোহিঙ্গা নাগরিক। কলমাকান্দা নির্বাচন অফিসের অফিশিয়াল আইডি ব্যবহার করে একই গভীর রাতে তাদের এনআইডির কাগজপত্র সার্ভারে আপলোড করা হয়েছিল। নিয়মানুযায়ী সাধারণত রাতের বেলা সার্ভারে এনআইডির তথ্য আপলোড করার কোনো বৈধ নিয়ম না থাকলেও ওই নির্দিষ্ট রাতে শুধু এই দুই রোহিঙ্গার ভুয়া তথ্যই আপলোড করা হয়। স্থানীয় কিছু অসাধু দালাল চক্রের সঙ্গে যোগসাজশ করে বড় অঙ্কের মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এই অবৈধ এনআইডি তৈরি করার চুক্তি হয়েছিল বলেও ওই সূত্র দাবি করেছে।

এই বিষয়ে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, ওই দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র কীভাবে বা কার কার সহযোগিতায় তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তাঁর মতে, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ভোটার হওয়ার জন্য নির্বাচন অফিসে আসে, ফলে সবার বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা সবসময় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, নূর হালিমার এনআইডি কার্ড ইতিমধ্যে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং মুজিবুর রহমানের কার্ডটি এখনো হস্তান্তর করা হয়নি। বিষয়টি বর্তমানে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ হলে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান। তবে দুই অভিযুক্তের এনআইডি তৈরির মূল নথিগুলো দেখতে চাইলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তা দেখাতে ব্যর্থ হন। প্রথমে তিনি জানান যে নথিগুলো স্টোরে সংরক্ষিত আছে এবং অনেক নথির ভিড়ে তা খুঁজে পেতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে। পরবর্তীতে এক সপ্তাহ পর আবার নথি দেখতে চাওয়া হলে তিনি জানান যে ফাইলগুলো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এবং পুরো ঘটনাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।

পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আরও জানান যে, অভিযুক্ত ওই দুই ব্যক্তির বিষয়ে নির্দিষ্ট এলাকায় খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে এবং তাদের এনআইডিতে প্রদর্শিত পরিচয়ের সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতার বিন্দুমাত্র মিল পাওয়া যায়নি। তাঁর স্পষ্ট ভাষ্য অনুযায়ী, সম্পূর্ণ ভুয়া ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ওই দুই রোহিঙ্গার নামে এই জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করা হয়েছে। এই গুরুতর বিষয়টি ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে এবং জোরালো তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। নেত্রকোনা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ তোফায়েল হোসেন অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে গণমাধ্যমকে জানান যে, এর আগেও কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসে এ ধরনের অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ ও জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেন বারবার এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে, তা খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ে তদন্ত চলছে।

এই বিষয়ে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না উল্লেখ করে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, পুরো নির্বাচন অফিস দুর্নীতিমুক্ত বা ‘ক্লিন’ করা হবে এবং এর সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট সকল অপরাধীকে নিশ্চিতভাবে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে। উল্লেখ্য, এর পূর্বে গত ২০ জুলাই কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মরত তিনজন কর্মীকে রোহিঙ্গা নাগরিকদের অবৈধভাবে বাংলাদেশি এনআইডি তৈরি করে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে ওই একই ঘটনার প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকেও অন্যত্রে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে একই উপজেলা নির্বাচন অফিসে আবারও দুজন রোহিঙ্গার ভুয়া এনআইডি তৈরির গুরুতর অভিযোগ ওঠায় পুরো নির্বাচন অফিসের কার্যপ্রণালী ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে গভীর প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

জনপ্রিয়

মোংলা বন্দরে দুটি আধুনিক কন্টেইনার জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী

কলমাকান্দায় আবারও দুই রোহিঙ্গার অবৈধ এনআইডি তৈরির অভিযোগ

সর্বশেষ হালনাগাদ : ১০:২৬:০২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসে দুর্নীতির পুরোনো চিত্র আবারও নতুন করে উন্মোচিত হয়েছে। উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে সম্পূর্ণ ভুয়া ও বানোয়াট তথ্য ব্যবহার করে নূর হালিমা (২৫) ও মুজিবুর রহমান নামের দুই রোহিঙ্গা নাগরিকের বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে নূর হালিমার নামে তৈরি হওয়া এনআইডি কার্ডটি গত ১১ আগস্ট সফলভাবে হস্তান্তরও করা হয়েছে। অন্যদিকে, অভিযুক্ত মুজিবুর রহমানের এনআইডি কার্ডের যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে তথ্য আপলোড করা হলেও বিষয়টি স্থানীয়ভাবে জানাজানি হয়ে যাওয়ায় তা এখনো হস্তান্তর করা হয়নি।

নির্বাচন অফিস সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, মুজিবুর রহমানের এনআইডি ফাইলের নম্বর ১২ ২০১১৫০৭৯১ এবং তার স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে রংছাতি ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামকে উল্লেখ করা হয়েছে। নূর হালিমা ও মুজিবুর রহমানের এই দুটি এনআইডি তৈরির সমস্ত কাগজপত্র গত ১১ আগস্ট রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসের নিজস্ব আইডি ব্যবহার করে সার্ভারে আপলোড করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট একটি দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি অনুযায়ী, ওই নির্দিষ্ট রাতে অন্য কোনো ভোটার বা নাগরিকের নয়, বরং কেবল এই দুই রোহিঙ্গার তথ্যই সার্ভারে আপলোড করা হয়েছিল। নূর হালিমার ভুয়া এনআইডিতে বাবা হিসেবে শান্তিনগর গ্রামের ওমর আলী এবং মা হিসেবে তাঁর স্ত্রী শরীফা খাতুনের নাম সুকৌশলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে যে, প্রকৃতিকপক্ষে ওমর আলীর পরিবারে নূর হালিমা নামে কোনো সন্তান বা মেয়ে নেই।

সম্প্রতি স্থানীয় সূত্রে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর নূর হালিমার এনআইডির একটি কপি সংগ্রহ করে সরেজমিন শান্তিনগর গ্রামে গিয়ে ওমর আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ করেন। ওমর আলী জানান যে, তাঁর মোট চার সন্তান রয়েছে—দুই ছেলে (কাওছার মিয়া ও শামীম মিয়া) এবং দুই মেয়ে (আসমা আক্তার ও মাইমুনা আক্তার)। তাঁর পরিবারে নূর হালিমা নামে কোনো মেয়ে বা সন্তান নেই। তিনি আরও জানান যে, কিছুদিন আগে নির্বাচন অফিসের কয়েকজন লোক তাঁর বাড়িতে এসে নূর হালিমা সংক্রান্ত বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং নূর হালিমা নামে তাঁর কোনো মেয়ে নেই মর্মে বিভিন্ন ফরমে তাঁর স্বাক্ষর নেন। এ সময় এলাকার আরও কয়েকজনের স্বাক্ষরও সংগ্রহ করা হয়, যা নিয়ে তিনি চরম সামাজিক বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন। ওমর আলীর ছেলে শামীম মিয়াও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, তাঁদের মা-বাবার জাতীয় পরিচয়পত্র ও ব্যক্তিগত তথ্য সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ব্যবহার করে অন্য এক অচেনা নারীকে তাঁদের বোন বানিয়ে কীভাবে এই এনআইডি তৈরি করা হলো, তা তাঁদের বোধগম্য নয়।

স্থানীয় সচেতন নাগরিক জাবেদ মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে গণমাধ্যমকে জানান যে, আইনগতভাবে এবং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে যেকোনো সাধারণ মানুষের বৈধ এনআইডি তৈরি করতে হলে জন্মনিবন্ধন সনদ, নাগরিক সনদ, বাবা-মায়ের এনআইডিসহ বিভিন্ন ধরনের সত্য ও যাচাইকৃত কাগজপত্র জমা দিতে হয় এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়। তাঁর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ হলো, অফিসিয়াল সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা ও অজান্তে এই ধরনের ভুয়া এনআইডি তৈরি করা কিছুতেই সম্ভব নয়। তাই পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে উচ্চপর্যায়ে তদন্ত করে এর সঙ্গে জড়িত কুচক্রী মহল ও অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির দাবি জানান তিনি। তবে মুজিবুর রহমানের এনআইডির কপি তাৎক্ষণিকভাবে হাতে না পাওয়ায় তাঁর বাবা-মায়ের নাম বিস্তারিত জানা সম্ভব হয়নি।

নির্বাচন অফিসের নিয়ম অনুযায়ী, নতুন ভোটার হওয়ার জন্য জন্মনিবন্ধন সনদ, পিতা-মাতার এনআইডি, নাগরিক সনদ এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার বিভিন্ন সনদ বাধ্যতামূলকভাবে জমা দিতে হয়। পরবর্তীতে এসব নথি যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই ও স্ক্যান করার পর কম্পিউটার অপারেটর নিজ নিজ আইডি ব্যবহার করে তথ্য সার্ভারে প্রাথমিকভাবে সংরক্ষণ বা এন্ট্রি করেন এবং পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কর্মকর্তা তা গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করেন। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটির সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বিস্ফোরক তথ্য দিয়ে জানান যে, নূর হালিমা ও মুজিবুর রহমান উভয়েই মূলত রোহিঙ্গা নাগরিক। কলমাকান্দা নির্বাচন অফিসের অফিশিয়াল আইডি ব্যবহার করে একই গভীর রাতে তাদের এনআইডির কাগজপত্র সার্ভারে আপলোড করা হয়েছিল। নিয়মানুযায়ী সাধারণত রাতের বেলা সার্ভারে এনআইডির তথ্য আপলোড করার কোনো বৈধ নিয়ম না থাকলেও ওই নির্দিষ্ট রাতে শুধু এই দুই রোহিঙ্গার ভুয়া তথ্যই আপলোড করা হয়। স্থানীয় কিছু অসাধু দালাল চক্রের সঙ্গে যোগসাজশ করে বড় অঙ্কের মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এই অবৈধ এনআইডি তৈরি করার চুক্তি হয়েছিল বলেও ওই সূত্র দাবি করেছে।

এই বিষয়ে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, ওই দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র কীভাবে বা কার কার সহযোগিতায় তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তাঁর মতে, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ভোটার হওয়ার জন্য নির্বাচন অফিসে আসে, ফলে সবার বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা সবসময় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, নূর হালিমার এনআইডি কার্ড ইতিমধ্যে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং মুজিবুর রহমানের কার্ডটি এখনো হস্তান্তর করা হয়নি। বিষয়টি বর্তমানে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ হলে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান। তবে দুই অভিযুক্তের এনআইডি তৈরির মূল নথিগুলো দেখতে চাইলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তা দেখাতে ব্যর্থ হন। প্রথমে তিনি জানান যে নথিগুলো স্টোরে সংরক্ষিত আছে এবং অনেক নথির ভিড়ে তা খুঁজে পেতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে। পরবর্তীতে এক সপ্তাহ পর আবার নথি দেখতে চাওয়া হলে তিনি জানান যে ফাইলগুলো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এবং পুরো ঘটনাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।

পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আরও জানান যে, অভিযুক্ত ওই দুই ব্যক্তির বিষয়ে নির্দিষ্ট এলাকায় খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে এবং তাদের এনআইডিতে প্রদর্শিত পরিচয়ের সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতার বিন্দুমাত্র মিল পাওয়া যায়নি। তাঁর স্পষ্ট ভাষ্য অনুযায়ী, সম্পূর্ণ ভুয়া ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ওই দুই রোহিঙ্গার নামে এই জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করা হয়েছে। এই গুরুতর বিষয়টি ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে এবং জোরালো তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। নেত্রকোনা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ তোফায়েল হোসেন অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে গণমাধ্যমকে জানান যে, এর আগেও কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসে এ ধরনের অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ ও জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেন বারবার এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে, তা খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ে তদন্ত চলছে।

এই বিষয়ে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না উল্লেখ করে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, পুরো নির্বাচন অফিস দুর্নীতিমুক্ত বা ‘ক্লিন’ করা হবে এবং এর সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট সকল অপরাধীকে নিশ্চিতভাবে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে। উল্লেখ্য, এর পূর্বে গত ২০ জুলাই কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মরত তিনজন কর্মীকে রোহিঙ্গা নাগরিকদের অবৈধভাবে বাংলাদেশি এনআইডি তৈরি করে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে ওই একই ঘটনার প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকেও অন্যত্রে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে একই উপজেলা নির্বাচন অফিসে আবারও দুজন রোহিঙ্গার ভুয়া এনআইডি তৈরির গুরুতর অভিযোগ ওঠায় পুরো নির্বাচন অফিসের কার্যপ্রণালী ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে গভীর প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।