বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে দেশজুড়ে উৎকণ্ঠা চলছিল গত কয়েক সপ্তাহ ধরে। ডিসেম্বরের শুরুতে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের সামনে বিএনপির এক কর্মীর হাতে লেখা প্ল্যাকার্ড সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সেখানে লেখা ছিল তিনি প্রয়োজনে নিজের কিডনি দান করতে প্রস্তুত। এই দৃশ্য অনেকের কাছেই খালেদা জিয়ার প্রতি দলের কর্মীদের আবেগ ও আনুগত্যের প্রতীক হয়ে ওঠে।
তবে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে ৩০ ডিসেম্বর ভোরে। ৭৯ বছর বয়সে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয় বলে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়। দলের পক্ষ থেকে বলা হয় ভোর ছয়টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনে দেয়। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে খালেদা জিয়া ও তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনা দেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছেন। এই দুই নেত্রীকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে ক্ষমতা পরিবর্তন আন্দোলন নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংঘাত। শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। এমন বাস্তবতায় খালেদা জিয়ার প্রয়াণ একটি যুগের ইতি নির্দেশ করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার একরঙা নয়। তিনি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রেখেছেন। আবার ক্ষমতায় থাকাকালে দুর্নীতির অভিযোগ ও কঠোর রাজনৈতিক কৌশলের কারণে সমালোচনার মুখেও পড়েছেন। তার নেতৃত্ব একদিকে যেমন সমর্থকদের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীক ছিল অন্যদিকে বিরোধীদের কাছে বিতর্কের উৎস।
খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন পূর্ববঙ্গের দিনাজপুরে। তার রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ মূলত ঘটে স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯৮১ সালে নিহত হওয়ার পর। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির নেতৃত্ব শূন্য হয়ে পড়ে এবং দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে খালেদা জিয়াকে সামনে আনা হয়। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে যোগ দেন ১৯৮২ সালে এবং দ্রুত দলের শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন।
১৯৮০ এর দশকে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে খালেদা জিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক নেতৃত্বে পরিণত হন। গ্রেপ্তার গৃহবন্দি ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও তিনি আপসহীন অবস্থান বজায় রাখেন। ১৯৯১ সালে সামরিক শাসনের পতনের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।
তিনি তিনবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত প্রথম মেয়াদ এরপর স্বল্প সময়ের জন্য ১৯৯৬ সালে এবং পরে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত। তার শাসনামলে অর্থনৈতিক উদারীকরণ রপ্তানি খাত বিশেষ করে পোশাক শিল্পের প্রসার মেয়েদের শিক্ষায় অগ্রগতি ও গণমাধ্যমের বিকাশের মতো ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা তুলে ধরেন তার সমর্থকেরা।
তবে এই সময়েই নানা বিতর্কও তৈরি হয়। কৃষক আন্দোলনে পুলিশের গুলিবর্ষণ রাজনৈতিক সহিংসতা দুর্নীতির অভিযোগ এবং তার বড় ছেলে তারেক রহমানকে ঘিরে ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র গড়ে ওঠার অভিযোগ সরকারকে চাপে ফেলে। ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা এবং অস্ত্র চোরাচালান সংক্রান্ত ঘটনাও তার সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করে।
২০০৬ সালের শেষে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হলে ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নেয়। এই সময় খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা উভয়ই রাজনীতির বাইরে চলে যান। পরবর্তী সময়ে দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়া কারাবরণ করেন এবং দীর্ঘদিন রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকেন। তার স্বাস্থ্যও ক্রমে অবনতির দিকে যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ব্যক্তিগত জীবনে নানা ট্র্যাজেডি সত্ত্বেও খালেদা জিয়া দেশ ছাড়েননি। চাপ ও প্রতিকূলতার মুখেও তিনি দেশে থেকে পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছেন। অনেকের চোখে এটি তার দৃঢ়তার বড় উদাহরণ।
শেখ হাসিনার পতনের পর ২০২৪ সালে খালেদা জিয়া প্রতিশোধের রাজনীতি এড়িয়ে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তার এই অবস্থানও অনেকের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখন কেন্দ্রীয় ভূমিকায়। সমর্থকদের আশা তিনি মায়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করবেন। সমালোচকদের মতে তার নেতৃত্ব এখনও বড় পরীক্ষার মুখে।
ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন বিএনপির জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি এটি নির্ধারণ করবে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ভবিষ্যতে কীভাবে মূল্যায়িত হবে।
















