দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় প্রতিনিয়ত বিকৃত যৌন লালসার শিকার হওয়া অসহায় শিশুদের ব্যাপারে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের মুখে কোনো ধরনের রা বা প্রতিবাদ নেই বলে চরম ক্ষোভ ও কড়া মন্তব্য করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের।
গতকাল রোববার (২৫ অক্টোবর) নিজের ব্যক্তিগত ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক তাত্পর্যপূর্ণ ও দীর্ঘ স্ট্যাটাসে তিনি এই বিস্ফোরক মন্তব্য ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণগুলো তুলে ধরেন।
প্রকাশিত ফেসবুক পোস্টে আব্দুল কাদের লেখেন, “ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের তথাকথিত ধ্বজাধারী হিসেবে নিজেদের দাবি করা এনসিপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে আমি সাধারণত আর কথা বলি না এবং এখন কথা বলার কোনো বিশেষ প্রয়োজনও মনে করি না। তবে সুদীর্ঘ ইতিহাসের কঠিন দায়বদ্ধতা থেকে কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্পষ্ট নোকতা দিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।”
তিনি পিরোজপুরের সাম্প্রতিক একটি মর্মান্তিক ও অমানবিক ঘটনার বিবরণ দিয়ে লেখেন, “সম্প্রতি দেশের একটি জেলায় একজন বৃদ্ধ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন। অথচ স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা মব তৈরি করে জোরপূর্বক তার লাশ দাফন করতে বাধা দিচ্ছিল। শুধু তাই নয়, চরম ক্ষোভের বশে তার শেষ দাফনের জন্য পরিবারের খোঁড়া কবরটি পর্যন্ত জোরপূর্বক মাটি দিয়ে ভরাট করে ফেলে তারা! অবশেষে দীর্ঘ ১৭টি ঘণ্টা ধরে মরদেহের সাথে উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করার পর, মধ্যরাতের আঁধারে মোবাইল ফোনের সীমিত আলো জ্বেলে ধাতব প্লেট দিয়ে মাটি খুড়ে সেই বৃদ্ধ মানুষটিকে শেষ দাফন করতে বাধ্য হয়েছেন তার বৃদ্ধা বোন ও কন্যাসন্তান!”
এমন চরম অমানবিক ও সংবেদনশীল ঘটনার পর এনসিপির সাংগঠনিক ভূমিকা নিয়ে কঠোর প্রশ্ন তুলে আব্দুল কাদের লেখেন, “এত বড় একটি অমানবিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও এনসিপি দলগত ও সাংগঠনিকভাবে একেবারে নির্বিকার ও চরম নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করেছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদী বিবৃতি দেওয়া তো অনেক দূরের কথা; দলের সুপরিচিত কোনো একজন শীর্ষ নেতাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে একটা টু শব্দ পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি! নিহত ওই বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি সমাজে একজন গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই ঘটনার ক্ষেত্রে এনসিপি পরোক্ষভাবে তাদের রাজনৈতিক শরিক দল—যারা একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধিতা করেছিল—তাদের পক্ষই অবলম্বন করেছে এবং প্রকাশ্য মব কালচারকে নীরব সমর্থন জুগিয়েছে। অথচ ওনারা আবার মুখে দাবি করেন যে তারা নাকি মহান মুক্তিযুদ্ধকে নিজেদের অন্তরে ‘ওউন’ করেন! মুক্তিযুদ্ধকে ওউন করার এটাই কি তাদের আসল নমুনা?”
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ভঙ্গের উসকানি দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে সাবেক এই সমন্বয়ক তীব্র অভিযোগ করে লেখেন, “কয়েক দিন আগেই ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব দুর্গাপূজার সময় মন্দির প্রাঙ্গণে মন্দিরের নির্মাণকাজে সংরক্ষিত অবশিষ্ট ইট ব্যবহার করে মাংস রান্না করার একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে এর জের ধরে পাল্টা শক্তি প্রদর্শন করতে সেখানে বিতর্কিত গরুভোজের আয়োজন করা হয়। আর সেই উসকানিমূলক গরুভোজের প্রত্যক্ষ আয়োজন ও নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং এনসিপির ছাত্রসংগঠন ‘জাতীয় ছাত্রশক্তি’-র জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য সচিব! তাহলে দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের প্রকৃত নেপথ্য আয়োজক কারা? অথচ ছাত্রশক্তি, শিবির এবং মজলিসের এমন বিতর্কিত ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে ঘটার পর উল্টো এনসিপির প্রভাবশালী নেতা নাহিদ ইসলাম দাবি তুলেছেন যে, দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ার সমুদয় ক্রেডিট নাকি বিরোধী দলগুলোর, বর্তমান সরকারের নয়!”
নারীর ওপর নির্যাতন ও যৌন নিপীড়ন ইস্যুতে এনসিপির নীরবতা ও দ্বিমুখী ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে আব্দুল কাদের লেখেন, “চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের ভেতরে এক সাধারণ নারীকে প্রকাশ্যে লাফিয়ে ‘ফ্লাইং কিক’ দেওয়ার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা থেকে শুরু করে জামায়াত নেতা গাজী নজরুলের বিকৃত যৌন লালসার শিকার হয়ে অকালে জীবন দেওয়া সেই অসহায় তরুণীর ঘটনা—এসব নিপীড়িত ও পাশবিক নির্যাতনের শিকার কোনো নারীর পক্ষেই এনসিপির নারী নেতৃত্ব কিংবা দলের কোনো দায়িত্বশীল নেতা আজ পর্যন্ত একটা টু শব্দও করেননি, ভিক্টিমদের পাশে এসে দাঁড়াননি। কিন্তু তারা কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল ও ফায়দা লুটতে হাতিয়া এলাকায় শাপলাকলি প্রতীকে ভোট দেওয়ার জেরে ভুয়া ধর্ষণের মিথ্যা প্রোপাগান্ডার ঘটনায় রাজপথে আন্দোলনে নেমেছিলেন! অথচ তাদের বহুল প্রচারিত তথাকথিত ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তে’ নাকি নারীদের সুরক্ষা ও অধিকার রক্ষার বিষয়টাই সবচেয়ে অগ্রভাগে রাখা হয়েছে! বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় প্রতিনিয়ত এত এত শিশু যে বিকৃত যৌন লালসার শিকার হচ্ছেন, এ বিষয়ে এনসিপি নেতাদের মুখে কোনো প্রকার রা বা প্রতিবাদ নেই!”
স্ট্যাটাসের একদম শেষ পর্যায়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে আব্দুল কাদের লেখেন, “হ্যাঁ, এটাই হচ্ছে মূলত জামায়াতে ইসলামী দ্বারা গোপনে পরিচালিত এনসিপির তথাকথিত মধ্যপন্থি রাজনীতি, মহান মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, নারীর অধিকার রক্ষায় চরম অঙ্গীকারবদ্ধ থাকা এবং সর্বোপরি তাদের প্রচারিত ‘নতুন বন্দোবস্তের’ প্রকৃত আসল রূপ ও নমুনা।”


























