Dhaka ০৩:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

শঙ্খ নদে অবৈধ বালু উত্তোলন, ভাঙনঝুঁকিতে ২০০ বসতঘর

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ১০:১৩:৪৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
  • ২১ বার দেখা হয়েছে

চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও বাঁশখালী উপজেলার সংযোগস্থল তৈলারদ্বীপ সেতুর পার্শ্ববর্তী শঙ্খ নদ থেকে অনবরত ও অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলার এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের চরম ক্ষোভ ও দাবি, একটি নির্দিষ্ট বালুমহাল ইজারার আইনি সুযোগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একটি প্রভাবশালী চক্র রাতের আঁধারে নদের বিভিন্ন নিষিদ্ধ স্থান থেকে অবাধে বালু উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছে। লাগামহীন এই বালু উত্তোলনের ফলে শঙ্খ নদের দুই পাড়ে নদীভাঙন অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে বর্তমানে অন্তত ২০০টি বসতঘর, শত শত একর বহুমুখী ফসলি জমি এবং সার্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ তৈলারদ্বীপ সেতু চরম ধস ও ভাঙনঝুঁকির মুখে পড়েছে।

স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ অনুযায়ী, তৈলারদ্বীপ সেতুর ঠিক পূর্ব পাশে তৈলারদ্বীপের ৯ নম্বর ওয়ার্ড সংলগ্ন স্পর্শকাতর এলাকায় দিন-রাত সমানতালে বালু উত্তোলন ও পরিবহন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অবাধে এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় নদের দুই তীরের হাজারো বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ভাঙন আতঙ্ক ও চরম ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। পুরো বিষয়টি স্থানীয় ও জেলা প্রশাসনকে বারবার অবহিত করা সত্ত্বেও দীর্ঘদিনে কোনো প্রকার কার্যকর প্রতিকার কিংবা স্থায়ী আইনি সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না বলে ভুক্তভোগীদের দাবি।

সরেজমিনে আনোয়ারা সংলগ্ন তৈলারদ্বীপ সেতু অতিক্রম করে পিএবি সড়কের পাশে দেখা গেছে বিশাল আকৃতির একটি বালু বিক্রির ডাম্পিং পয়েন্ট বা মজুতকেন্দ্র। সেখানে প্রকাশ্যে টাঙানো নামফলক বা সাইনবোর্ডে ‘শিরোপা বিল্ডার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে উক্ত বালু বিক্রেতা ও মূল সরবরাহকারী হিসেবে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের স্পষ্ট ভাষ্য, রাজনৈতিক পট পরিবর্তন বা দলের পরিচয় বদল হলেও শঙ্খ নদ থেকে বালু উত্তোলনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ হয়নি। বরং স্থানীয় প্রশাসনের একাংশের সঙ্গে অবৈধ অভ্যন্তরীণ সমঝোতা ও সমন্বয় রক্ষা করে দিন-রাত সমানতালে এই পরিবেশ ধ্বংসকারী কার্যক্রম পরিচালনা করার মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে।

এলাকাবাসীর আরও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, পাশ্ববর্তী চন্দনাইশ উপজেলার অধীনস্থ একটি বৈধ বালুমহাল ইজারা নিয়ে সেই ইজারার নথিপত্র ও আইনি দোহাই দেখিয়ে প্রকৃতপক্ষে আনোয়ারা ও বাঁশখালীর সীমানার এই পয়েন্টে বালু উত্তোলন, অবৈধ মজুত ও প্রকাশ্য বিক্রি বা বাণিজ্য চালানো হচ্ছে। এই নদী বিধ্বংসী বালু উত্তোলনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি ক্যাপ্টেন নুর মোহাম্মদ, নুর ইসলাম মেম্বার, মো. শাহিন, জাহাঙ্গীর ও মো. শওকতসহ একাধিক স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রত্যক্ষ জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত অধিবাসীরা। স্থানীয়দের মতে, উক্ত অভিযুক্তদের মধ্যে অনেকেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। দল পরিবর্তন হলেও তাদের অবৈধ বালু ব্যবসার সিন্ডিকেট একভাবেই অপরিবর্তিত রয়েছে।

তৈলারদ্বীপ এলাকার স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দা মাবুদ চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রতিদিন রাত গভীর হলে নদীর বিভিন্ন নিষিদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে আধুনিক ড্রেজার ও বাল্কহেড দিয়ে বালু তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা কখনো এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো আমাদের নানাভাবে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।’ আরেক ক্ষতিগ্রস্ত ভুক্তভোগী দুলাল তীব্র উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে জানান, ‘অযৌক্তিক ও অবৈধ বালু তোলার কারণে শঙ্খ নদীর এপার-ওপার দুই দিকেই হঠাৎ করে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। জেলেপাড়ার দিকে যেমন সাধারণ মানুষের ভিটেমাটি ও ঘরবাড়ি ভেঙে নদীতে বিলীন হচ্ছে, তেমনি আমাদের বসতবাড়ির দিকেও নতুন করে ফাটল ও ভাঙন দেখা দিয়েছে। আমরা পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম জীবনের ঝুঁকির মধ্যে দিন কাটাচ্ছি, কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন রহস্যজনকভাবে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’

ক্ষতিগ্রস্ত অধিবাসীদের মূল অভিযোগ, স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন সাধারণত দিনের আলোয় লোকদেখানো অভিযান পরিচালনা করে। অথচ বালু তোলার মূল তাণ্ডব চালানো হয় মূলত গভীর রাতের আঁধারে। তদুপরি প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই আগাম খবর পেয়ে ড্রেজার, এক্সকাভেটর ও বাল্কহেড দ্রুত অন্যত্রে সরিয়ে ফেলে চক্রটি। মাঝে মাঝেই দু-একটি অভিযানে সামান্য বালু জব্দ কিংবা নামমাত্র জরিমানা করা হলেও অভিযান শেষ হওয়ার অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আবার আগের মতো বালু উত্তোলন শুরু হয়ে যায়। জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে বারবার বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশের পর মাঝে মধ্যে মোবাইল কোর্ট চালুর মাধ্যমে অভিযান চালানো হলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ী ও কার্যকর কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য আইয়ুবের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, বালু তোলার বিষয়ে তিনি লোকমুখে শুনেছেন। তবে স্থানটি তাদের আওতাধীন মূল এলাকা থেকে সামান্য দূরে, বাঁশখালী পয়েন্টের দিকে অবস্থিত। বালু উত্তোলনের কোনো বৈধ আইনি অনুমতি রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘শুনেছি তাদের নাকি অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক যে, সরকার একদিকে বিলিয়ন টাকা খরচ করে নদীর তীর রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করছে, আর অন্যদিকে অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলার অনুমতি প্রদান করছে।’

সরেজমিনে বিস্তারিত অনুসন্ধানে শঙ্খ নদীর সমগ্র তীরবর্তী এলাকা এবং মুরালী খাল সংলগ্ন এলাকায় অন্তত ৪০টি পৃথক স্থানে বিপুল পরিমাণ বালুর অবৈধ মজুত ও প্রকাশ্য বিক্রির ডাম্পিং পয়েন্ট দেখা গেছে। স্থানীয় অধিবাসীদের প্রবল অভিযোগ, আশঙ্কাজনক এই পয়েন্টগুলো বন্ধ করার ক্ষেত্রে আনোয়ারা উপজেলা প্রশাসনের কোনো প্রকার দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা নেই। বিশেষ করে জুঁইদণ্ডী এলাকা, শঙ্খ নদের মূল মোহনা এবং আনোয়ারা, সাতকানিয়া ও চন্দনাইশের ত্রিমুখী সংযোগস্থল চরতী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চালিয়া যাওয়া হচ্ছে।

সামগ্রিক বিষয়ে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রুহুল আমিন জানান, চন্দনাইশ বা সাতকানিয়ার কোনো একটি বৈধ বালুমহাল থেকে নিয়ম মেনে বালু কিনে এনে নির্দিষ্ট জমিতে এনে রাখার অনুমতি নেওয়া হয়েছে বলে তিনি খবর পেয়েছেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান, ‘এখানে বিধি অনুযায়ী বালু এনে মজুত ও বিক্রি করা যাবে, কিন্তু শঙ্খ নদের এই পয়েন্ট থেকে নদী থেকে সরাসরি বালু উত্তোলনের কোনো প্রকার আইনি অনুমতি নেই।’ রাতে শঙ্খ নদ থেকে গোপনে বালু উত্তোলনের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ইউএনও বলেন, রাতের আঁধারে বা দিনে নদী থেকে এভাবে বালু উত্তোলনের কোনো বৈধতা নেই। বিষয়টি আনোয়ারা ও বাঁশখালী প্রশাসনের যৌথ নজরদারিতে রাখা হবে এবং দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অপরদিকে, আনোয়ারা উপজেলা প্রশাসনের অফিসিয়াল তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আনোয়ারা উপজেলার আওতাধীন শঙ্খ নদে কোনো প্রকার অনুমোদিত বালুমহাল বা বালু উত্তোলনের স্থান নেই। তবে নদের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে প্রায়ই অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের গুরুতর অভিযোগ তাদের নিকট রয়েছে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য ও উপজেলা প্রশাসনের অবস্থান জানতে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিনের সঙ্গে টেলিফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

শঙ্খ নদের ভয়াবহ পরিবেশগত সংকট বিষয়ে বিশিষ্ট নদীবিশেষজ্ঞ ও জিএসসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, যেকোনো জীবন্ত নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু তুলে নেওয়ার সরাসরি ফলে নদীতীরের স্থায়ী ভাঙন আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ে, নদের তলদেশের প্রাকৃতিক ভৌগোলিক বিন্যাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়, জলজ প্রাণীর প্রজনন ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সামগ্রিক জলজ জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়ে। নদীর এ ধরনের স্বাভাবিক পরিবেশগত ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য একবার পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেলে তা কোনো প্রযুক্তি বা অর্থে পুনঃরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন ও অসম্ভব হয়ে পড়ে।

জনপ্রিয়

মোংলা বন্দরে দুটি আধুনিক কন্টেইনার জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী

শঙ্খ নদে অবৈধ বালু উত্তোলন, ভাঙনঝুঁকিতে ২০০ বসতঘর

সর্বশেষ হালনাগাদ : ১০:১৩:৪৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও বাঁশখালী উপজেলার সংযোগস্থল তৈলারদ্বীপ সেতুর পার্শ্ববর্তী শঙ্খ নদ থেকে অনবরত ও অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলার এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের চরম ক্ষোভ ও দাবি, একটি নির্দিষ্ট বালুমহাল ইজারার আইনি সুযোগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একটি প্রভাবশালী চক্র রাতের আঁধারে নদের বিভিন্ন নিষিদ্ধ স্থান থেকে অবাধে বালু উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছে। লাগামহীন এই বালু উত্তোলনের ফলে শঙ্খ নদের দুই পাড়ে নদীভাঙন অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে বর্তমানে অন্তত ২০০টি বসতঘর, শত শত একর বহুমুখী ফসলি জমি এবং সার্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ তৈলারদ্বীপ সেতু চরম ধস ও ভাঙনঝুঁকির মুখে পড়েছে।

স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ অনুযায়ী, তৈলারদ্বীপ সেতুর ঠিক পূর্ব পাশে তৈলারদ্বীপের ৯ নম্বর ওয়ার্ড সংলগ্ন স্পর্শকাতর এলাকায় দিন-রাত সমানতালে বালু উত্তোলন ও পরিবহন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অবাধে এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় নদের দুই তীরের হাজারো বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ভাঙন আতঙ্ক ও চরম ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। পুরো বিষয়টি স্থানীয় ও জেলা প্রশাসনকে বারবার অবহিত করা সত্ত্বেও দীর্ঘদিনে কোনো প্রকার কার্যকর প্রতিকার কিংবা স্থায়ী আইনি সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না বলে ভুক্তভোগীদের দাবি।

সরেজমিনে আনোয়ারা সংলগ্ন তৈলারদ্বীপ সেতু অতিক্রম করে পিএবি সড়কের পাশে দেখা গেছে বিশাল আকৃতির একটি বালু বিক্রির ডাম্পিং পয়েন্ট বা মজুতকেন্দ্র। সেখানে প্রকাশ্যে টাঙানো নামফলক বা সাইনবোর্ডে ‘শিরোপা বিল্ডার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে উক্ত বালু বিক্রেতা ও মূল সরবরাহকারী হিসেবে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের স্পষ্ট ভাষ্য, রাজনৈতিক পট পরিবর্তন বা দলের পরিচয় বদল হলেও শঙ্খ নদ থেকে বালু উত্তোলনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ হয়নি। বরং স্থানীয় প্রশাসনের একাংশের সঙ্গে অবৈধ অভ্যন্তরীণ সমঝোতা ও সমন্বয় রক্ষা করে দিন-রাত সমানতালে এই পরিবেশ ধ্বংসকারী কার্যক্রম পরিচালনা করার মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে।

এলাকাবাসীর আরও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, পাশ্ববর্তী চন্দনাইশ উপজেলার অধীনস্থ একটি বৈধ বালুমহাল ইজারা নিয়ে সেই ইজারার নথিপত্র ও আইনি দোহাই দেখিয়ে প্রকৃতপক্ষে আনোয়ারা ও বাঁশখালীর সীমানার এই পয়েন্টে বালু উত্তোলন, অবৈধ মজুত ও প্রকাশ্য বিক্রি বা বাণিজ্য চালানো হচ্ছে। এই নদী বিধ্বংসী বালু উত্তোলনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি ক্যাপ্টেন নুর মোহাম্মদ, নুর ইসলাম মেম্বার, মো. শাহিন, জাহাঙ্গীর ও মো. শওকতসহ একাধিক স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রত্যক্ষ জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত অধিবাসীরা। স্থানীয়দের মতে, উক্ত অভিযুক্তদের মধ্যে অনেকেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। দল পরিবর্তন হলেও তাদের অবৈধ বালু ব্যবসার সিন্ডিকেট একভাবেই অপরিবর্তিত রয়েছে।

তৈলারদ্বীপ এলাকার স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দা মাবুদ চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রতিদিন রাত গভীর হলে নদীর বিভিন্ন নিষিদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে আধুনিক ড্রেজার ও বাল্কহেড দিয়ে বালু তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা কখনো এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো আমাদের নানাভাবে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।’ আরেক ক্ষতিগ্রস্ত ভুক্তভোগী দুলাল তীব্র উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে জানান, ‘অযৌক্তিক ও অবৈধ বালু তোলার কারণে শঙ্খ নদীর এপার-ওপার দুই দিকেই হঠাৎ করে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। জেলেপাড়ার দিকে যেমন সাধারণ মানুষের ভিটেমাটি ও ঘরবাড়ি ভেঙে নদীতে বিলীন হচ্ছে, তেমনি আমাদের বসতবাড়ির দিকেও নতুন করে ফাটল ও ভাঙন দেখা দিয়েছে। আমরা পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম জীবনের ঝুঁকির মধ্যে দিন কাটাচ্ছি, কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন রহস্যজনকভাবে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’

ক্ষতিগ্রস্ত অধিবাসীদের মূল অভিযোগ, স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন সাধারণত দিনের আলোয় লোকদেখানো অভিযান পরিচালনা করে। অথচ বালু তোলার মূল তাণ্ডব চালানো হয় মূলত গভীর রাতের আঁধারে। তদুপরি প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই আগাম খবর পেয়ে ড্রেজার, এক্সকাভেটর ও বাল্কহেড দ্রুত অন্যত্রে সরিয়ে ফেলে চক্রটি। মাঝে মাঝেই দু-একটি অভিযানে সামান্য বালু জব্দ কিংবা নামমাত্র জরিমানা করা হলেও অভিযান শেষ হওয়ার অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আবার আগের মতো বালু উত্তোলন শুরু হয়ে যায়। জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে বারবার বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশের পর মাঝে মধ্যে মোবাইল কোর্ট চালুর মাধ্যমে অভিযান চালানো হলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ী ও কার্যকর কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য আইয়ুবের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, বালু তোলার বিষয়ে তিনি লোকমুখে শুনেছেন। তবে স্থানটি তাদের আওতাধীন মূল এলাকা থেকে সামান্য দূরে, বাঁশখালী পয়েন্টের দিকে অবস্থিত। বালু উত্তোলনের কোনো বৈধ আইনি অনুমতি রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘শুনেছি তাদের নাকি অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক যে, সরকার একদিকে বিলিয়ন টাকা খরচ করে নদীর তীর রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করছে, আর অন্যদিকে অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলার অনুমতি প্রদান করছে।’

সরেজমিনে বিস্তারিত অনুসন্ধানে শঙ্খ নদীর সমগ্র তীরবর্তী এলাকা এবং মুরালী খাল সংলগ্ন এলাকায় অন্তত ৪০টি পৃথক স্থানে বিপুল পরিমাণ বালুর অবৈধ মজুত ও প্রকাশ্য বিক্রির ডাম্পিং পয়েন্ট দেখা গেছে। স্থানীয় অধিবাসীদের প্রবল অভিযোগ, আশঙ্কাজনক এই পয়েন্টগুলো বন্ধ করার ক্ষেত্রে আনোয়ারা উপজেলা প্রশাসনের কোনো প্রকার দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা নেই। বিশেষ করে জুঁইদণ্ডী এলাকা, শঙ্খ নদের মূল মোহনা এবং আনোয়ারা, সাতকানিয়া ও চন্দনাইশের ত্রিমুখী সংযোগস্থল চরতী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চালিয়া যাওয়া হচ্ছে।

সামগ্রিক বিষয়ে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রুহুল আমিন জানান, চন্দনাইশ বা সাতকানিয়ার কোনো একটি বৈধ বালুমহাল থেকে নিয়ম মেনে বালু কিনে এনে নির্দিষ্ট জমিতে এনে রাখার অনুমতি নেওয়া হয়েছে বলে তিনি খবর পেয়েছেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান, ‘এখানে বিধি অনুযায়ী বালু এনে মজুত ও বিক্রি করা যাবে, কিন্তু শঙ্খ নদের এই পয়েন্ট থেকে নদী থেকে সরাসরি বালু উত্তোলনের কোনো প্রকার আইনি অনুমতি নেই।’ রাতে শঙ্খ নদ থেকে গোপনে বালু উত্তোলনের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ইউএনও বলেন, রাতের আঁধারে বা দিনে নদী থেকে এভাবে বালু উত্তোলনের কোনো বৈধতা নেই। বিষয়টি আনোয়ারা ও বাঁশখালী প্রশাসনের যৌথ নজরদারিতে রাখা হবে এবং দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অপরদিকে, আনোয়ারা উপজেলা প্রশাসনের অফিসিয়াল তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আনোয়ারা উপজেলার আওতাধীন শঙ্খ নদে কোনো প্রকার অনুমোদিত বালুমহাল বা বালু উত্তোলনের স্থান নেই। তবে নদের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে প্রায়ই অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের গুরুতর অভিযোগ তাদের নিকট রয়েছে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য ও উপজেলা প্রশাসনের অবস্থান জানতে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিনের সঙ্গে টেলিফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

শঙ্খ নদের ভয়াবহ পরিবেশগত সংকট বিষয়ে বিশিষ্ট নদীবিশেষজ্ঞ ও জিএসসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, যেকোনো জীবন্ত নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু তুলে নেওয়ার সরাসরি ফলে নদীতীরের স্থায়ী ভাঙন আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ে, নদের তলদেশের প্রাকৃতিক ভৌগোলিক বিন্যাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়, জলজ প্রাণীর প্রজনন ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সামগ্রিক জলজ জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়ে। নদীর এ ধরনের স্বাভাবিক পরিবেশগত ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য একবার পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেলে তা কোনো প্রযুক্তি বা অর্থে পুনঃরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন ও অসম্ভব হয়ে পড়ে।