বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা উন্নয়নে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে চীন বাংলাদেশের প্রধান সামরিক সহযোগী হলেও, ঢাকা এখন প্রতিরক্ষা খাতে তুরস্কের অংশগ্রহণ বাড়াতে আগ্রহী হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা বিশেষ করে ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ও কৌশলগত বাস্তবতায় ভারত একটি প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছে। এই অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ভারতের প্রভাবের মধ্যে থাকলেও রাশিয়া, চীন ও পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীলতাও রয়েছে। তবে বিশ্ব রাজনীতিতে বহুমুখী শক্তির ধারণা জোরদার হওয়ায় মধ্যম শক্তির দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় নতুন অংশীদার খুঁজছে। এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশ ও তুরস্কের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাজারে তুরস্কের প্রবেশ চীনের দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে তুরস্কের তৈরি হিসার ও প্লাস এবং সিপার মাঝারি ও দীর্ঘ পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাংলাদেশে সরবরাহের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। ভারতের দৃষ্টিতে, বঙ্গোপসাগর ও পূর্ব সীমান্তে তাদের আকাশ ও কৌশলগত প্রাধান্য কিছুটা হলেও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। যদিও এসব তুর্কি ব্যবস্থা ভারতের এস চারশো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমতুল্য নয়, তবুও এগুলো বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পারে।
ভারত মনে করে, তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ন্যাটো মানের এবং তুলনামূলক কম শর্তে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও যৌথ উৎপাদনের সুযোগ দেয়। এ কারণে তুরস্ককে শুধু অস্ত্র সরবরাহকারী নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ। এতে দক্ষিণ এশিয়ায় রাশিয়া ও চীনের আধিপত্যের বাইরে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হয়। একই সঙ্গে তুরস্কের সঙ্গে ঢাকার ঘনিষ্ঠতা এবং ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির পুনরুত্থান নিয়ে ভারত উদ্বিগ্ন। ভারতের আশঙ্কা, পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশও তুরস্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠতে পারে।
তুরস্কের এশিয়া অ্যাগেইন নীতির আওতায় ২০১৯ সালের পর দক্ষিণ এশিয়ায় সক্রিয়তা বাড়ে। ২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশ ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। অস্ত্র কেনাবেচার সীমা ছাড়িয়ে এই সম্পর্ক এখন যৌথ উৎপাদন, শিল্প সহযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপ নিচ্ছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে তুরস্কের বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করেছে এবং ২০২১ সালের পর দেশটি তুর্কি প্রতিরক্ষা পণ্যের অন্যতম বড় ক্রেতায় পরিণত হয়েছে।
তুরস্কের সহায়তায় বাংলাদেশে সামরিক প্রশিক্ষণ, নৌবাহিনীর জাহাজ মেরামত, গোলাবারুদ উৎপাদন লাইন স্থাপন এবং প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সন্ত্রাস দমন, সাইবার অপরাধ মোকাবিলা, মাদকবিরোধী অভিযান ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়েও সহযোগিতা বাড়ছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় মানবিক ও কারিগরি সহায়তাও দিচ্ছে তুরস্ক।
২০২৫ সালে তুরস্কের তৈরি যুদ্ধ ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ এবং যৌথ উৎপাদন নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা ভারতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ভারতের ধারণা, এটি কেবল একটি অস্ত্রচুক্তি নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের পুরোনো কাঠামো ভাঙার ইঙ্গিত।
বাংলাদেশের জন্য মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা এবং সীমান্ত ও আকাশসীমা লঙ্ঘন একটি বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে কৌশলগত অসমতা ভারসাম্যে আনার বিষয়টিও ঢাকার বিবেচনায় রয়েছে। এ কারণে প্রতিরক্ষা অংশীদার বৈচিত্র্যকরণ বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হয়ে উঠেছে।
তুরস্কের পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গেও বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা যোগাযোগ নতুন করে সক্রিয় হয়েছে। এতে ভারত আশঙ্কা করছে, চীন, পাকিস্তান ও তুরস্ককে ঘিরে একটি নতুন সমীকরণ গড়ে উঠছে, যা ভারতের আঞ্চলিক প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ভৌগোলিক বাস্তবতা বাংলাদেশ ও ভারতের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পক্ষে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উপেক্ষা করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি ভারতের জন্যও অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ ঢাকাকে আরও দূরে ঠেলে দিতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তুরস্কের ভূমিকা শূন্য সমষ্টির খেলা হিসেবে না দেখে পারস্পরিক লাভের সুযোগ হিসেবেই দেখাই যুক্তিসংগত বলে মনে করছেন অনেকে।
















