জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার রুকিন্দীপুর ইউনিয়নের আওয়ালগাড়ী-উলিপুর মাঠে বৈদ্যুতিক খুঁটিতে আগুন লাগার পর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘ প্রায় পাঁচ মাস ধরে তিনটি গভীর নলকূপ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর ফলে চলতি আমন মৌসুমে উক্ত স্কিমগুলোর আওতাধীন প্রায় ৫০০ বিঘা জমির কৃষকেরা এক মারাত্মক ও তীব্র সেচ সংকটের মুখে পড়েছেন। সময়মতো জমিতে প্রয়োজনীয় সেচ বা পানি দিতে না পারার কারণে অনেক জমির উর্বর মাটি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে এবং কোথাও কোথাও ধানের গোছাগুলো শুকিয়ে বিবর্ণ ও ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ছে। এর ফলে আমন ধান ঘরে তোলার ঠিক অন্তিম মুহূর্তে এসে ফসলের বাম্পার ফলন নিয়ে চরম উৎকণ্ঠা ও আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও গভীর নলকূপের মালিকদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরপরই এই জটিলতা নিরসনের জন্য পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি এবং বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা বিএমডিএ-এর স্থানীয় কার্যালয়গুলোতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কোনো কার্যকর ও দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে তাদের বারংবার পাঠানো হয়েছে। এভাবে দুই দপ্তরের মধ্যে ফাইল ও মৌখিক অভিযোগে ঘুরতে ঘুরতেই দীর্ঘ প্রায় পাঁচ মাস সময় পার হয়ে গেছে। অথচ আমন ধানের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সময়ে সেচের চরম অভাবে এলাকার কৃষকেরা এখন বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন।
সরেজমিনে আওয়ালগাড়ী-উলিপুর মাঠে গিয়ে দেখা যায়, মাঠের অধিকাংশ জমিতেই প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বা রস অনুপস্থিত। রোদের তাপে কোথাও কোথাও জমির মাটি ফেটে চৌচির রূপ নিয়েছে এবং ধানের গোছাগুলো শুকিয়ে হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে। মাঠে কৃষকদের সুবিধার্থে স্থাপিত গভীর নলকূপগুলো অলস ও নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে রয়েছে। আকাশে বৃষ্টির ব্যাকুল আশায় অনেকে তাকিয়ে থাকলেও সময়মতো কৃত্রিম সেচের পানি না পেলে ধানের ফলন বিপর্যয়করভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা। স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আমন আবাদে স্বাভাবিক বৃষ্টির ভূমিকা থাকলেও এবার প্রকৃতিতে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় জমিতে সেচ দেওয়াটা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় প্রধান সেচের উৎস এই তিনটি নলকূপ কোনোভাবেই চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
আওয়ালগাড়ী মাঠের চার বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন কৃষক আবু বক্কর সিদ্দিক। তিনি চরম হতাশা প্রকাশ করে জানান যে, জমিতে সময়মতো সেচ দিতে না পারায় মাটি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে এবং গাছগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। মৌসুমের শেষ মুহূর্তে এসে যদি অবিলম্বে সেচের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা করা না হয়, তবে তাঁর পুরো মৌসুমের সমস্ত বিনিয়োগ ও পরিশ্রম সম্পূর্ণ জলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আরেক কৃষক সেকেন্দার আলী জানান, বর্তমান সময়ে ধানের জমিতে প্রচুর পানির প্রয়োজন, কিন্তু নলকূপগুলো বন্ধ থাকায় তারা কোনোভাবেই সেচ দিতে পারছেন না। এভাবে আরও কিছুদিন চলতে থাকলে কাঙ্ক্ষিত ধানের ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পাবে।
গভীর নলকূপের মালিক আনোয়ার হোসেন জানান, আজ থেকে প্রায় পাঁচ মাস আগে ইরি বা বোরো মৌসুমের শেষ পর্যায়ে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে এলাকার একটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে আকস্মিক আগুন ধরে যায়। ওই একই প্রধান লাইন থেকেই তাঁর দুটি এবং পাশেই অবস্থিত আরেকটি স্কিমের গভীর নলকূপে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। আগুনে লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এই তিনটি নলকূপের সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে গত জুন মাসে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আক্কেলপুর জোনাল অফিসে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হলেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, একাধিকবার পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে গেলে বিএমডিএ কার্যালয়ে যেতে বলা হয়, আবার বিএমডিএ অফিসে গেলে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। দুই দপ্তরের এই দীর্ঘসূত্রতা ও উদাসীনতার মাঝে পড়ে প্রায় পাঁচ মাস কেটে গেছে। অথচ এই মুহূর্তে আমন ধানের সেচের তীব্র সময়ে প্রায় ৫০০ বিঘা জমি এই নলকূপগুলোর ওপর নির্ভরশীল থাকায় কৃষকেরা চরম বিপদে পড়েছেন। যত দ্রুত সম্ভব সংযোগ চালু করা না হলে শত শত কৃষকের কষ্টের ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।
এই বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমন কুমার সাহা জানান যে, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি সম্প্রতি অবগত হয়েছেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশেষভাবে অবহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি খুব শীঘ্রই সরেজমিন মাঠ পরিদর্শন করে দ্রুত সমস্যাটির সমাধান করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিএমডিএর আক্কেলপুর কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী মনসুর আলী সরদার জানিয়েছেন যে, বিষয়টি তিনি দুই দিন আগে জেনেছেন এবং তা জানার পরই গভীর নলকূপগুলোতে দ্রুত বৈদ্যুতিক সংযোগ পুনঃস্থাপনের জন্য পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন। বর্তমানে সংযোগ চালুর বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, জয়পুরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আক্কেলপুর জোনাল অফিসের ডিজিএম মো. আব্দুর রহমান সরকার দাবি করেছেন যে, ইরি মৌসুমের শেষের দিকে নলকূপের মালিকরা একটি দায়সারা গোছের অভিযোগ দিয়ে চলে গিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে তারা নিয়মিত যোগাযোগ করেননি। তবে সম্প্রতি তারা পুনরায় অফিসে আসায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে জয়পুরহাট থেকে একটি কাঠের খুঁটির ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় চালু করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
তবে স্থানীয় কৃষকদের অভিমত, এই তিনটি গভীর নলকূপ দীর্ঘদিন ধরে অচল ও বন্ধ থাকার বিষয়টি যদি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল দপ্তরগুলোর আগে থেকেই জানা থাকত, তবে আমন মৌসুমের প্রধান কাজ শুরু হওয়ার আগেই সংযোগ সচল করা সম্পূর্ণ সম্ভব ছিল। ফসলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মুহূর্তে এসে সেচ সংকট তৈরি হওয়ায় এর সমস্ত ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত অসহায় কৃষকদের ঘাড়েই এসে চাপছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনর্বহাল করে বন্ধ থাকা তিনটি গভীর নলকূপ সচল না করা হলে প্রায় ৫০০ বিঘা জমির আমন ধান রক্ষায় বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে জোর আশঙ্কা করছেন তারা।


























