বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) পরিচালিত ঐতিহ্যবাহী ‘বাটেক্সপো’ প্রদর্শনীতে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বজনীন ও জাতীয় ঐক্যের ধারা অক্ষুণ্ন রাখার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহাসচিব ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) প্রদত্ত এক বিজ্ঞপ্তিতে তিনি এই বিষয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করেন।
বিবৃতিতে গোলাম পরওয়ার উল্লেখ করেন, দীর্ঘ ১২ বছর বিরতির পর বিজিএমইএ পুনরায় ‘বাটেক্সপো ২০২৬’ আয়োজনের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাকে জামায়াত একটি ইতিবাচক ও অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ বলে মনে করে। বিজিএমইএর সাম্প্রতিক ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১৮ ও ১৯ নভেম্বর রাজধানীর ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র’-এ এই বহুল প্রতীক্ষিত আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বিশ্বজুড়ে দেশীয় পোশাকের বৈশ্বিক বাজার সম্প্রসারণ এবং বিদেশি ক্রেতাদের আকর্ষণ করার উদ্দেশ্যে ১৯৮৯ সালে বাটেক্সপোর যাত্রা শুরু হয়েছিল। সময়ের পরিক্রমায় এটি দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরিণত হয়। তবে দীর্ঘ এক যুগ পর এই আয়োজনের প্রত্যাবর্তন ঘটা সত্ত্বেও, এর শুভ উদ্বোধন ও সমাপনী পর্বে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, সে বিষয়ে জামায়াত মহাসচিব নিজের ও দলের পক্ষ থেকে উদ্বেগ ব্যক্ত করেছেন।
জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা বলেন, বাটেক্সপো কেবল কোনো সাধারণ বাণিজ্য মেলা নয়, এটি আমাদের পোশাক শিল্পের সংহতি ও ঐতিহ্যের এক বিরাট প্রতীক। অতীতে বাটেক্সপোর উদ্বোধনী ও সমাপ্তি অনুষ্ঠানে দেশের সরকার ও প্রধান বিরোধী দলের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি বহির্বিশ্বে একটি সুনির্দিষ্ট ও শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দিত। তা হলো—জাতীয় অর্থনীতির মূল ভিত্তি পোশাক শিল্পের প্রশ্নে রাজনৈতিক মতপার্থক্য দূরে ঠেলে দেশের স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দেওয়া।
গোলাম পরওয়ার ব্যাখ্যা করে বলেন, এবার উদ্বোধনী আয়োজনে প্রধানমন্ত্রী এবং সমাপনী পর্বে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্তটি বিজিএমইএর নিজস্ব বিচার-বিবেচনার বিষয়। তবে জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মেলায় অতীতে চলে আসা সর্বজনীন বা অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারা অব্যাহত রাখা হলে তা দেশের রাজনৈতিক সৌহার্দ্য, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং শিল্প খাতের প্রতি সম্মিলিত অঙ্গীকারের বার্তা আরও শক্তিশালীভাবে প্রকাশ করত। বর্তমান অর্থনৈতিক ও বিশ্ব রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই বিষয়টির গুরুত্ব বহুগুণ বেশি। কারণ আজকের দিনে কেবল পণ্য রপ্তানি হয় না; প্রতিটি পণ্যের আড়ালে দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, সক্ষমতা ও মর্যাদার প্রতিচ্ছবিও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উন্মোচিত হয়। বাংলাদেশ থেকে একটি তৈরি পোশাক যেমন আন্তর্জাতিক ক্রেতার কাছে পৌঁছায়, ঠিক তেমনি আমাদের জাতীয় আত্মপরিচয়ও বিশ্ববাজারে তুলে ধরা হয়।
তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর ও দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থার বর্তমান সময়ে দেশের যেকোনো ভালো বা মন্দ খবর নিমেষেই বৈশ্বিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ে। এর সরাসরি প্রভাব গিয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা, বিনিয়োগ পরিস্থিতি এবং সার্বিক ব্র্যান্ড ভাবমূর্তির ওপর। তাই বাটেক্সপোকে কেবল একটি বিক্রেতা-ক্রেতার সম্মেলন হিসেবে বিবেচনা না করে বাংলাদেশকে নতুনভাবে উপস্থাপন করার এক বড় মাধ্যম হিসেবে দেখা উচিত। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রদর্শনীতে অতিথি নির্বাচন ও সামগ্রিক আয়োজনে আরও সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি ও পেশাদারি কৌশলের প্রয়োজন ছিল। বিজিএমইএর মতো একটি অরাজনৈতিক সর্বজনীন সংগঠনের খেয়াল রাখা দরকার, যাতে রাজনৈতিক বিভাজনের কোনো অনিচ্ছাকৃত সংকেত আন্তর্জাতিক অংশীদার ও বিনিয়োগকারীদের কাছে না যায়।
বিবৃতির শেষাংশে গোলাম পরওয়ার স্পষ্ট করেন যে, তাদের এই বক্তব্য কাউকে ছোট করা বা বিজিএমইএর সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করার উদ্দেশ্যে নয়। বরং অরাজনৈতিক ও জাতীয় শিল্প সংস্থা হিসেবে বিজিএমইএকে আরও দূরদর্শী, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং পেশাদার ভূমিকা পালনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প কোনো একক রাজনৈতিক দল, সরকার বা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি নয়। এটি লাখ লাখ শ্রমিকের ঘাম, হাজার হাজার উদ্যোক্তার শ্রম এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও স্থানীয় ব্যবসার একটি যৌথ প্রয়াস। তাই এই খাতের আন্তর্জাতিক আয়োজনগুলোতে এমন একটি পরিবেশ থাকা উচিত, যেখানে কোনো প্রকার বিভেদ বা মতভেদের জায়গা না রেখে কেবল পারস্পারিক সহযোগিতা, সংহতি ও বাংলাদেশের ইতিবাচক দিকটাই মূল হয়ে উঠবে। বিজিএমইএ ভবিষ্যতে নিজেদের যোগ্যতা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও ঐক্যের সঠিক রূপ তুলে ধরবে বলেই তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।


























