ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতার মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চ উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে দারুণ ছন্দে থাকা ও জয়ের ধারায় ভাসমান অ্যাস্টন ভিলাকে থামিয়ে দিয়ে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করেছে স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনা। নিজেদের ঘরের মাঠ স্পটিফাই ক্যাম্প ন্যু স্টেডিয়ামে আয়োজিত এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব অ্যাস্টন ভিলাকে ৩-০ গোলের বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছে পাঁচবারের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নরা। কাতালানদের এই চমৎকার জয়ে ম্যাচের মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড রাফিনিয়া, যিনি একাই দুটি গোল করে দলের জয় নিশ্চিত করেন। এছাড়া দলের পক্ষে অপর গোলটি আসে তরুণ স্প্যানিশ বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামালের পা থেকে।
এই জয়ের সুবাদে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় নিজেদের আগের ম্যাচে বর্তমান ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন প্যারিস সেন্ট জার্মেইর (পিএসজি) বিপক্ষে হজম করা হারের ক্ষত ও ধাক্কা সফলভাবে সামলে নিয়ে ছন্দে ফিরেছে বার্সেলোনা। একই সঙ্গে, চলমান প্রতিযোগিতার লিগ পর্বের পয়েন্ট তালিকার শীর্ষ আটটি দলের মধ্যে সরাসরি জায়গা করে নেওয়ার লড়াইয়ে নিজেদের শক্ত অবস্থান আরও সুদৃঢ় করল হান্সি ফ্লিকের দল।
ম্যাচের শুরু থেকেই সফরকারী অ্যাস্টন ভিলার রক্ষণভাগের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে আগ্রাসী ফুটবল খেলতে থাকে বার্সেলোনা। স্বাগতিকদের এই উচ্চ মাত্রার ‘হাই প্রেসিং’ কৌশল সামলাতে গিয়ে ম্যাচের শুরুতেই বড় ধরনের ভুল করে বসে উনাই এমেরির শিষ্যরা। খেলার সপ্তম মিনিটে সেই সুযোগের শতভাগ সদ্ব্যবহার করে বার্সেলোনাকে ১-০ গোলে এগিয়ে দেন লামিন ইয়ামাল। নিজেদের রক্ষণভাগের ডি-বক্সের ভেতর থেকে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে মারাত্মক ভুল পাস দিয়ে বসেন ভিলার মিডফিল্ডার জোয়াও গোমেস। বলটি সরাসরি গিয়ে পৌঁছায় তরুণ উইঙ্গার লামিন ইয়ামালের পায়ে। ১৯ বছর বয়সী এই অপ্রতিরোধ্য স্প্যানিশ তারকা বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে সুযোগটি কাজে লাগান এবং নিখুঁত শটে ভিলার গোলরক্ষক জিয়ন সুজুকিকে পরাস্ত করে বল সরাসরি জালে জড়ান।
এই একটি গোলের সুবাদে চ্যাম্পিয়নস লিগের সর্বকালের ইতিহাসে নতুন এক অনন্য রেকর্ড গড়েছেন বার্সেলোনার এই তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল। অ্যাস্টন ভিলার বিপক্ষে করা এই গোলটি তাঁকে চ্যাম্পিয়নস লিগের মূল ইতিহাসের টেবিলে টিনেজ বা কিশোর ফুটবলারদের মধ্যে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে আসীন করেছে।
চলতি প্রতিযোগিতা পর্যন্ত চ্যাম্পিয়নস লিগের মূল পর্বে মোট ১৪টি গোল করে ফেলেছেন ইয়ামাল। এর মাধ্যমে তিনি পেছনে ফেলে দিয়েছেন রেকর্ড বইয়ের সাবেক শীর্ষাধিকারী ফরাসি মহাতারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে। অপ্রাপ্তবয়স্ক বা কিশোর বয়সে ইউরোপীয় এই প্রতিযোগিতায় এমবাপ্পের মোট গোলসংখ্যা ছিল ১৩টি। তালিকার ঠিক তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন নরওয়ের বিশ্বখ্যাত স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড, কিশোর বয়সে যাঁর চ্যাম্পিয়নস লিগে মোট গোলসংখ্যা ছিল ১০টি।
বার্সেলোনার বিপক্ষে ম্যাচের শুরুতেই এমন আকস্মিক গোল হজম করার পর কিছুটা রক্ষণাত্মক চাপে পড়ে যায় অ্যাস্টন ভিলা। তবে ভেঙে না পড়ে দ্রুতই ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে নামে সফরকারীরা। প্রথমার্ধের দীর্ঘ সময়ে স্বাগতিকদের রক্ষণভাগে বেশ কয়েকবার বড় ধরনের ভীতি তৈরি করে তারা। দলের পক্ষে ম্যাটি ক্যাশের একটি গতিশীল ও জোরালো শট প্রতিপক্ষের গায়ে প্রতিহত হয়ে অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। পরবর্তীতে জোয়াও গোমেসের আরও একটি দুর্দান্ত আক্রমণ আটকে দেন বার্সেলোনার পর্তুগিজ ডিফেন্ডার জোয়াও কানসেলো। এছাড়া প্রতিপক্ষের একটি বিপজ্জনক থ্রু বলের লাইনে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে স্ট্রাইকার নিকোলাস জ্যাকসনের পায়ে বল পৌঁছানোর আগেই তা নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন বার্সার গোলরক্ষক গার্সিয়া।
অন্যদিকে, বার্সেলোনার আক্রমণাত্মক প্রেসিংয়ের ফাঁদে পড়ে নিজেদের রক্ষণভাগ থেকে স্বাভাবিক উপায়ে বল পাস করে ওপরে তুলে আনতে মারাত্মক বেগ পেতে হয়েছিল ভিলা খেলোয়াড়দের। বিরতির আগে অ্যান্থনি গর্ডনের একটি জোরালো শট দক্ষতার সঙ্গে প্রতিহত করেন গোলরক্ষক সুজুকি। এরপর জোহান মানজাম্বির একটি প্রচেষ্টা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সামাল দিতে হয় গার্সিয়াকে। দুই দলই সমানতালে আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণে ব্যস্ত থাকায় প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তের দিকে ম্যাচের উত্তেজনার পারদ চরমে পৌঁছেছিল।
খেলার বিরতির পর মাঠের লড়াইতে ফিরে আক্রমণের ধার ও গতি আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় বার্সেলোনা। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের একেবারে শুরুর দিকেই ব্যবধান দ্বিগুণ করে দলের স্কোরলাইন ২-০ তে উন্নীত করেন ফর্মে থাকা রাফিনহা। সতীর্থ মিডফিল্ডার ফারমিন লোপেজের কাছ থেকে নিখুঁত পাস পেয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণদুর্গ পুরোপুরি ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়েন এই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। এরপর অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় এক নিখুঁত শটে বল সরাসরি পাঠিয়ে দেন গোলপোস্টের নিচের কোণ দিয়ে জালে। চলতি ফুটবল মৌসুমে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা এই ফরোয়ার্ডের বুট থেকে আসা এটি ছিল আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গোল।
এরপর ব্যবধান কমিয়ে ম্যাচে ফেরার আপ্রাণ চেষ্টা চালায় অ্যাস্টন ভিলা। তবে খেলার মাঠের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলেই শক্তভাবে বজায় রাখে বার্সেলোনা। ম্যাচের একপর্যায়ে ডিফেন্ডার কানসেলোর একটি বুলেট গতির শট ক্রসবারের ওপর দিয়ে বাইরে চলে যায়। তবে পরবর্তীতে তাঁরই করা একটি দারুণ নিখুঁত ক্রস থেকে বার্সেলোনার হয়ে ম্যাচের তৃতীয় ও শেষ গোলটি আদায় করে নেন রাফিনহা।
ম্যাচের এই পর্যায়ে ডান পায়ের জাদুকরি বাইরের অংশ ব্যবহার করে অত্যন্ত নিখুঁত দক্ষতায় বল বাড়িয়ে দেন কানসেলো। আর ঠিক কাছ থেকে সেই দারুণ ক্রসে আলতো পা ছুঁইয়ে নিজের ব্যক্তিগত দ্বিতীয় ও দলের তৃতীয় গোলটি নিশ্চিত করেন রাফিনহা। চলতি মৌসুমে ক্লাব ফুটবলের সব প্রতিযোগিতা মিলে এটি ছিল তাঁর ১৯তম গোল। বর্তমান ফুটবল মৌসুমে বার্সেলোনার আক্রমণভাগের মূল কেন্দ্রবিন্দু বা মেইন ফরোয়ার্ডের ভূমিকায় নিজেকে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন তিনি।
এদিকে, এই ম্যাচটি শুরু হওয়ার ঠিক আগে প্রথা অনুযায়ী মাঠে বাজানো হয়নি উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় বাদ্যের সংগীত। স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের একটি ফুটবল ম্যাচে ঠিক আগের দিন ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের পর হঠাৎ হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মর্মান্তিকভাবে মারা যাওয়া তেনেরিফের উদীয়মান স্ট্রাইকার হেসুস দে মিগেলের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতেই এমন ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। মঙ্গলবার ভোরের দিকে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর হৃদয়বিদারক খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে সমগ্র ফুটবল বিশ্বে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।
ম্যাচটি শেষে বিজয়ী দলের নায়ক হিসেবে নিজের ব্যক্তিগত জয়ের আনন্দ প্রকাশ করার চেয়েও প্রয়াত ফুটবলারের শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানোকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ব্রাজিলিয়ান তারকা রাফিনহা। স্প্যানিশ জনপ্রিয় সম্প্রচারমাধ্যম মুভিস্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, আজকের এই চমৎকার জয়টি তিনি ক্লাবের সকল সমর্থককে উৎসর্গ করতে চান। তবে একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিতে ফুটবল নিয়ে কোনো দীর্ঘ বা আনন্দের কথা বলতে তিনি মোটেও ইচ্ছুক নন।
সংবেদনশীল কণ্ঠে রাফিনহা বলেন, “আমি আমাদের এই দারুণ জয়টি ক্লাবের সকল নিবেদিতপ্রাণ সমর্থককে উৎসর্গ করতে চাই। তবে আজকের দিনে ফুটবল নিয়ে কোনো বিস্তারিত কথা বলতে আমার ইচ্ছা করছে না। আমি শুধু আমাদের প্রয়াত সহকর্মী হেসুসের শোকাহত পরিবারের প্রতি আমার গভীরতম সমবেদনা জানাতে চাই। তাঁর বিদেহী আত্মা যেন চিরশান্তিতে থাকে, সেই প্রার্থনা করছি।”
তিনি আরও আবেগঘন সুরে বলেন, “এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা বা আকস্মিক ঘটনা যেকোনো ফুটবলারের জীবনের সঙ্গে যে কারও ক্ষেত্রে ঘটে যেতে পারে। বিষয়টি সত্যিই অত্যন্ত কঠিন ও হৃদয়বিদারক। আপনি একটি সাধারণ ম্যাচ খেলতে মাঠে নামবেন, আর ঠিক একই ধরনের দুর্ঘটনা আপনার নিজের সঙ্গেও ঘটে যেতে পারে। আমি ক্লাবের পক্ষ থেকে তাঁর পরিবারের প্রতিটি সদস্যের সুস্বাস্থ্য এবং এই কঠিন শোক কাটিয়ে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত শক্তি ও সাহস কামনা করছি।”
উল্লেখ্য, বার্সেলোনার বিপক্ষে অনুষ্ঠিত এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচটি অ্যাস্টন ভিলার অভিজ্ঞ কোচ উনাই এমেরির জন্যও ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও কঠিন ছিল। এর আগে অতীতে ফরাসি ক্লাব পিএসজির প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০১৭ সালে ক্যাম্প ন্যু স্টেডিয়ামে বার্সেলোনার মাঠে ৬-1 গোলের ব্যবধানে এক ঐতিহাসিক ও লজ্জাজনক হারের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল তাঁর ঝুলিতে।
এবারও ম্যাচের শুরুতে দ্রুত গোল হজম করে বসার কারণে বড় ধরনের বিপর্যয় ও ঐতিহাসিক পরাজয়ের পুরোনো আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল তাঁর মনে। তবে ম্যাচের প্রথমার্ধে কৌশলগত পরিবর্তনের মাধ্যমে দলটিকে কোনোভাবে লড়াইয়ে টিকিয়ে রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বার্সেলোনার আক্রমণভাগের অতি উচ্চমানের নিখুঁত দক্ষতার কাছে শেষ রক্ষা হয়নি উনাই এমেরির ভিলার।


























