২০২৫ সাল বৈশ্বিক রাজনীতিতে পরাশক্তির কঠোর প্রতিযোগিতার প্রত্যাবর্তনের বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বাণিজ্য প্রযুক্তি ভূখণ্ড ও সন্ত্রাস আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে। কূটনীতি এই প্রতিযোগিতার সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খায়। ভারতের জন্য বছরটি ছিল কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের কঠিন পরীক্ষা যেখানে চাপ মোকাবিলার পাশাপাশি নিজের অবস্থান ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট হয়েছে।
বছরের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র ভারতের পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়। ওয়াশিংটনের ভাষায় এটি বাণিজ্য সংশোধন হলেও বাস্তবে এটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ধরা পড়ে। এর ফলে ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও কঠোরতা দেখা যায়। একই সঙ্গে এটি স্পষ্ট করে দেয় যে চীনের মতো অভিন্ন উদ্বেগ থাকলেও অর্থনৈতিক চাপ থেকে ভারত যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক মুক্ত নয়।
নয়াদিল্লি এ পরিস্থিতিতে তাড়াহুড়ো করে সমঝোতায় না গিয়ে ধীরস্থির কৌশল নেয়। ভারত বিকল্প বাণিজ্য অংশীদার খোঁজে জ্বালানি নিরাপত্তায় রাশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে এবং জানিয়ে দেয় যে চাপের মাধ্যমে কৌশলগত অংশীদারত্ব টেকসই হয় না। এতে সংঘাত বাড়েনি এবং ভারত স্বল্পমেয়াদি ক্ষতি মেনে নিয়েও দীর্ঘমেয়াদি স্বায়ত্তশাসন রক্ষার বার্তা দেয়।
এই টানাপোড়েন কোয়াড জোটের ওপরও প্রভাব ফেলে। যুক্তরাষ্ট্র ভারত জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার এই জোটের শীর্ষ বৈঠক পিছিয়ে যায়। তবে কোয়াড ভেঙে পড়েনি। সমুদ্র নিরাপত্তা সরবরাহ শৃঙ্খল প্রযুক্তি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা চলতে থাকে। ঘোষণাভিত্তিক রাজনীতির বদলে কার্যভিত্তিক সমন্বয় জোরদার হয়।
ইউরোপে রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ ২০২৫ সালেও অব্যাহত থাকে। আলোচনার উদ্যোগ থাকলেও যুদ্ধের অবসান হয়নি। সামরিক উত্তেজনা ড্রোন হামলা ও বেসামরিক দুর্ভোগ চলতে থাকে। ভারত আলোচনার পক্ষে অবস্থান নিলেও মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে। এতে পশ্চিমা সমালোচনা এলেও এটি ভারতের বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন বলে বিবেচিত হয়।
চীনের আচরণও বৈশ্বিক বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। তাইওয়ান ঘিরে সামরিক তৎপরতা বাড়ে। একই সঙ্গে বেইজিং বহুপাক্ষিক মঞ্চে কূটনৈতিক তৎপরতা ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে। ভারতের জন্য চীন সবচেয়ে জটিল কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবেই থেকে যায়। সীমান্ত সমস্যা অমীমাংসিত এবং ভারত মহাসাগরে চীনের উপস্থিতি ভারতের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
মধ্যপ্রাচ্যেও অস্থিরতা বাড়ে। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন সংকটে মানবিক পরিস্থিতির অবনতি হয়। বছরের শেষদিকে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি সাময়িক স্বস্তি আনে। ভারত এই অঞ্চলে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে ফিলিস্তিনিদের মানবিক সুরক্ষার পক্ষে অবস্থান নেয়।
২০২৫ সালের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক ছিল বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামপন্থী সন্ত্রাসবাদের পুনরুত্থান। দক্ষিণ এশিয়ায় জম্মু ও কাশ্মীরে হামলা ভারত পাকিস্তান উত্তেজনা বাড়ায়। পরে দিল্লির লালকেল্লার কাছে গাড়িবোমা হামলা দেখিয়ে দেয় যে বড় শহরগুলোও ঝুঁকিমুক্ত নয়। এই হামলার সঙ্গে গোপন দেশীয় নেটওয়ার্ক জড়িত থাকার তথ্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করে।
এই হুমকি শুধু ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে একটি হামলা দেখিয়েছে যে চরমপন্থা সীমান্ত মানে না। একই সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও উগ্রপন্থী তৎপরতা ভারতের প্রতিবেশী নিরাপত্তা ভাবনাকে জটিল করে তোলে।
ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কও আরও খারাপ হয়। পারস্পরিক অভিযোগ ও সামরিক প্রস্তুতি বাড়লেও বড় ধরনের সংঘাত এড়ানো গেছে। তবে অর্থবহ সংলাপের অভাব দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের অচলাবস্থা স্পষ্ট করে।
সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল একটি সহযোগিতার বদলে প্রতিযোগিতামূলক সহাবস্থানের দিকে ঝুঁকে পড়া বিশ্বের ছবি তুলে ধরে। জোট দুর্বল হয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মুখে পড়েছে এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতা অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্র হয়ে উঠেছে। ভারতের জন্য এই বছর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের গুরুত্ব আবারও প্রমাণ করেছে।
বিশ্ব রাজনীতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ২০২৫ ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই অস্থির বাস্তবতায় ভারতের গুরুত্ব শুধু তার আকার বা অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় নয় বরং সংযম দায়িত্বশীলতা ও কৌশলগত স্পষ্টতায়। পরাশক্তির দ্বন্দ্বে পক্ষ নেওয়ার বদলে ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বব্যবস্থা গঠনে ভূমিকা রাখাই ভারতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
















