গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর একটি রাজনৈতিক ও জাতীয় স্লোগানকে পবিত্র হাদিসের সঙ্গে তুলনা টেনে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়া ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) নির্বাহী পরিচালক (সচিব পদমর্যাদা) মোহাম্মদ মসিউর রহমানকে অবশেষে তাঁর স্বীয় পদ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পদ হারানোর পর তাঁকে সরাসরি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন নিয়োগ-১ শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত এক আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব জেতী প্রু। জনস্বার্থে জারিকৃত এই বিশেষ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে গত ১ নভেম্বর রাজধানী ঢাকায় গণপরিবহনে সার্বিক শৃঙ্খলা ও আধুনিকায়ন আনয়নকল্পে ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ উদ্যোগের আওতায় গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি রুটে পরীক্ষামূলক বাস সার্ভিসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি ওই বিতর্কিত ও সংবেদনশীল মন্তব্যটি করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সর্বসাধারণের সামনে বক্তব্য প্রদানের একপর্যায়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বহুল চর্চিত ও রাজনৈতিকভাবে প্রচারিত ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানটির সঙ্গে সরাসরি ইসলাম ধর্মের পবিত্র হাদিসের সরাসরি তুলনা টানেন।
উক্ত অনুষ্ঠানে নিজের দেওয়া বক্তব্যে মসিউর রহমান মন্তব্যের পক্ষে অদ্ভূত ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ স্লোগানকে হাদিস অভিহিত করলে অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন যে তিনি তাঁর চাকরি জীবনে পরবর্তী কোনো ভালো বা লোভনীয় পদায়নের উদ্দেশ্যে তোষামোদ বা তেল মর্দন করছেন; তবে তাঁর ব্যক্তিগত দৃষ্টিতে এটি এক চিরন্তন ও শাশ্বত সত্য।
নিজের বক্তব্যকে আরও চড়া সুরে সমর্থন করে মসিউর রহমান মন্তব্য করেছিলেন, “‘আমার আগে আমরা, সবার আগে দেশ’—এই চিরন্তন কথাটি কে অস্বীকার করতে পারবেন? একমাত্র চরম স্বার্থপর, যার ন্যূনতম দেশপ্রেম বলতে কিছু নেই, কেবল সেই ব্যক্তিই বলতে পারে, না, আমি এটি মানি না। আমাকে বাদ দিয়ে আমরা সবাই মিলে মিশে থাকব, আর সবার আগে স্থান পাবে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি দেশ। তারপরে ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—এটি একদম হাদিস, হাদিস! এটি শাশ্বত বাণী।”
কথার একপর্যায়ে তিনি আরও যোগ করে বলেন, “এই একই কথা যদি কোনো আলেম বা হুজুররা জনসভায় বলতেন, তবে তা সঙ্গে সঙ্গে হাদিস হিসেবে গণ্য হয়ে যেত। কিন্তু ওনার (প্রধানমন্ত্রীর) মুখে দাড়ি নেই, তিনি মাথায় টুপি পরেন না, আর ঠিক এই কারণেই এটি হাদিস হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি! তবে এটি মূল অর্থে হাদিসই।”
একটি ইসলামি পবিত্র বাণী বা হাদিসের সঙ্গে সম্পূর্ণ দলীয় ও রাজনৈতিক স্লোগানের এমন বিতর্কিত ও তুলনামূলক বক্তব্য দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ হয়ে মুহূর্তের মধ্যে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের ধর্মপ্রাণ সমাজ, সচেতন নাগরিক ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ, কঠোর প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে চরম তোলপাড় ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে কালবিলম্ব না করে তাঁকে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালকের গুরুদায়িত্ব থেকে অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত বা ন্যস্ত করার নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হলো।






















