ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত গৌরবের স্বীকৃতি পাওয়ার রেশ কাটতে না কাটতেই ভিন্ন সুর শোনা গেল হ্যারি কেইনের মুখে। কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লামিনে ইয়ামালকে পেছনে ফেলে মাত্র এক সপ্তাহ আগেই জীবনের প্রথম ‘ব্যালন ডি’অর’ পুরস্কার জিতেছেন তিনি। অথচ বিশ্বসেরা এই ফুটবলারের কাছে ব্যক্তিগত এই স্বীকৃতির চেয়েও ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ ‘চ্যাম্পিয়ন্স লিগ’-এর শিরোপা অনেক বেশি মূল্যবান। জার্মান ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখের এই ইংলিশ স্ট্রাইকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, দুটি অর্জনের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকলে তিনি নিঃসংকোচে চ্যাম্পিয়ন্স লিগকেই বেছে নেবেন। একই সঙ্গে ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে স্পেনের ঐতিহ্যবাহী লা লিগায় খেলার একটি অপূর্ণ ইচ্ছার কথাও গণমাধ্যমের সামনে খোলামেলা প্রকাশ করেছেন ৩৩ বছর বয়সী এই তারকা।
আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাতে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের লিগ পর্বে স্পেনের স্বনামধন্য ক্লাব আতলেটিকো মাদ্রিদের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বায়ার্ন মিউনিখ। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের ঐতিহাসিক মেত্রোপলিতানো স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য হাইভোল্টেজ এই ম্যাচটি বাংলাদেশ সময় আগামীকাল বুধবার (৪ নভেম্বর) ভোর ২টায় মাঠে গড়ানোর কথা রয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগের দিন সোমবার আয়োজিত আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে নিজের বর্তমান ফুটবল ক্যারিয়ার, ব্যক্তিগত অর্জন এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন কেইন।
গত ২৬ অক্টোবর লন্ডনে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বিশ্বসেরা ফুটবলারের ব্যালন ডি’অর খেতাব অর্জন করেন হ্যারি কেইন। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ২৫ বছর পর এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার জেতার গৌরব অর্জন করলেন কোনো ইংলিশ ফুটবলার। গত মৌসুমে নিজের ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখ ও জাতীয় দলের হয়ে দুর্দান্ত ফর্মে থেকে সর্বমোট ৬৫টি ম্যাচে ৭৩টি গোল করেন এই ইংলিশ জাতীয় দলের অধিনায়ক। মূলত তাঁর অসাধারণ আক্রমণাত্মক নৈপুণ্যের ওপর ভর করেই বায়ার্ন বুন্দেসলিগা, জার্মান কাপ এবং জার্মান সুপার কাপের মতো ঘরোয়া শিরোপাগুলো নিজেদের শোকেসে তোলে।
এত বড় ঐতিহাসিক ব্যক্তিগত অর্জনের শিখরে পৌঁছানোর পরও হ্যারি কেইনের প্রধান লক্ষ্য এখন ইউরোপীয় ফুটবলের মুকুট জয় করা। সংবাদ সম্মেলনে তাকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছিল—ব্যালন ডি’অর ট্রফিটি ফিরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে যদি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তিনি সেটি গ্রহণ করবেন কি না।
জবাবে কেইন দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “আমি সবসময়ই বলে এসেছি যে, একজন ফুটবলার মূলত দলগত ট্রফি ও সাফল্য অর্জনের জন্যই মাঠে লড়াই করে। আমাদের খেলার দুনিয়ায় দলের সামগ্রিক সাফল্যই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
অবশ্য গত সপ্তাহে পাওয়া ব্যালন ডি’অর জয়ের অতুলনীয় অনুভূতি যে তাঁর হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে, সেটিও অস্বীকার করেননি তিনি। ইংলিশ স্ট্রাইকার বলেন, “গত সপ্তাহের ব্যালন ডি’অর জয় আমার পুরো জীবন ও ফুটবল ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা এবং রোমাঞ্চকর অনুভূতি ছিল। ব্যক্তিগতভাবে ওই সন্ধ্যাটি আমার জন্য ছিল সত্যিই অসাধারণ।”
তবে ব্যক্তিগত পুরস্কারের অর্জনের চেয়ে সতীর্থদের সঙ্গে একত্রে কোনো বড় ট্রফি উদ্যাপনের আনন্দকে অনেক উঁচুতে রাখছেন তিনি। কেইনের বিশ্বাস, সতীর্থদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বায়ার্নের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতে ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরার আনন্দ হবে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য।
দুটি অর্জনের মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিয়ে তিনি বলেন, “আমি নিশ্চিতভাবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগকেই বেছে নেব। তবে সৃষ্টিকর্তার কৃপায় আমি এখন এমন একটি সৌভাগ্যবান অবস্থানে আছি, যেখানে আমার সামনে এই দুটি অর্জনই একসঙ্গে পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী ঘটে।”
কেইনের এমন মন্তব্যের পেছনে রয়েছে তাঁর অতীতের একটি তিক্ত ও অপূর্ণ স্মৃতি। ব্যক্তিগতভাবে ফুটবলের শীর্ষ স্থানে পৌঁছালেও তিনি আজ পর্যন্ত ক্লাব ক্যারিয়ারে কোনো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে পারেননি। আজ থেকে সাত বছর আগে অর্থাৎ ২০১৯ সালে টটেনহ্যাম হটস্পারের হয়ে তিনি এই টুর্নামেন্টের ফাইনালেও উঠেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ঠিক আজকের এই মাদ্রিদের মেত্রোপলিতানো স্টেডিয়ামেই লিভারপুলের কাছে ২-০ গোলে হেরে তাঁর প্রথম শিরোপাস্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল।
দীর্ঘ সাত বছর পর জীবনের তাগিদে আবার সেই পুরোনো মাঠে ফিরে আসার অনুভূতি ব্যক্ত করে কেইন বলেন, “এখন পর্যন্ত এই স্টেডিয়ামের স্মৃতিগুলো আমার জন্য খুব একটা সুখকর নয়। তবে এত দিন পর এখানে আবার ফিরে আসতে পেরে সত্যি ভালো লাগছে। আশা করছি, আগামীকালের ম্যাচে আমরা একটি চমৎকার নতুন স্মৃতি তৈরি করতে পারব।”
কেবল বায়ার্নের হয়েই নয়, বরং আগামী সপ্তাহে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের জার্সিতেও এই একই মাঠে স্পেনের বিপক্ষে খেলতে নামবেন কেইন। তাঁর সুপ্ত আশা, চলতি মৌসুমের শেষ ধাপেও চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল খেলার সুবাদে তিনি যেন আবার এই মাঠে ফিরে আসতে পারেন এবং ২০১৯ সালের সেই তিক্ত ও বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতাকে একটি মধুর সাফল্যে রূপান্তরিত করতে পারেন।
সংবাদ সম্মেলনে এদিন স্প্যানিশ ফুটবলের প্রতি নিজের গভীর ভালোলাগার কথাও জানান কেইন। বিশেষ করে ছোটবেলায় লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দুর্দান্ত দ্বৈরথ তাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের দুই প্রবাদপ্রতিম মহাতারকার ফুটবল জাদুকরি দেখে বড় হওয়ার সেই স্মৃতি আজও তাঁর মনে গেঁথে আছে।
স্প্যানিশ ফুটবল সম্পর্কে কেইন বলেন, “ছোটবেলায় বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে স্পেনের জাতীয় দল আমাকে সবসময়ই মুগ্ধ করত। তারা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও বিশ্বকাপ জিতেছে। এছাড়া বার্সেলোনা এবং রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে মেসি ও রোনালদোর মতো অসাধারণ সব ফুটবলারের খেলা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। স্প্যানিশ ফুটবলের মান সবসময়ই অতুলনীয়ভাবে উঁচুতে থাকে।”
তবে ফুটবলের এই ভূখণ্ডে এত অনুরাগ থাকা সত্ত্বেও কেইনের পেশাদার ক্লাব ক্যারিয়ারে কখনোই স্প্যানিশ লা লিগায় খেলার কোনো সুযোগ হয়ে ওঠেনি। ক্যারিয়ারের দীর্ঘ ও সোনালী সময়টা তিনি কাটিয়েছেন টটেনহ্যাম হটস্পারে। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে তিনি ইংলিশ পাঠ চুকিয়ে জার্মান ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখে পাড়ি জমান।
স্পেনে খেলার অপূর্ণ বাসনার কথা উল্লেখ করে তিনি যোগ করেন, “আসলে স্প্যানিশ ক্লাবে খেলার সুযোগটি কখনো সেভাবে বাস্তবসম্মতভাবে আসেনি। তবে উপযুক্ত ও সঠিক সময়ে সুযোগ পেলে লা লিগার মতো মঞ্চে খেলা এবং সেখানকার শীর্ষ মানের ডিফেন্ডারদের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আমার জন্য একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা হতো।”
যদিও স্পেনে খেলার সুপ্ত ইচ্ছার কথা তিনি প্রকাশ করেছেন, তবে এর মানে এই নয় যে তিনি বর্তমান ক্লাব ছেড়ে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা করছেন। বরং জার্মান ক্লাব বায়ার্নে নিজের বর্তমান অবস্থান ও পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে তিনি যে ভীষণ সন্তুষ্ট, সেটি স্পষ্ট করে দিয়েছেন কেইন। তাঁর মতে, প্রতিটি ফুটবলারের ক্যারিয়ার আলাদা আলাদা পথে এগিয়ে যায় এবং বায়ার্নে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি আজ পর্যন্ত অত্যন্ত আনন্দিত।
এদিকে বর্তমান ক্লাব বায়ার্ন মিউনিকের সঙ্গে তার নতুন চুক্তি নবায়ন করা নিয়েও বর্তমানে আলোচনা চলছে। যদিও তার বর্তমান চুক্তির মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত বলবৎ রয়েছে, তবুও সেটি আরও দীর্ঘায়িত করার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এখন একেবারে শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে কেইন জানিয়েছেন যে, চুক্তির বড় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ইতোমধ্যে উভয় পক্ষের মধ্যে পূর্ণ সমঝোতা হয়ে গেছে। এখন কেবল কিছু দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতা ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা বাকি আছে। তাঁর জোরালো প্রত্যাশা, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন চুক্তির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত রূপ পাবে।
অন্যদিকে, মেত্রোপলিতানো স্টেডিয়ামে আতলেটিকোর বিপক্ষে নামার আগে বায়ার্ন ফরোয়ার্ড কেইনের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন প্রতিপক্ষ দলের আর্জেন্টাইন কোচ দিয়েগো সিমিওনে। অভিজ্ঞ এই কোচের মতে, হেইন কেবল একজন অসাধারণ ও নিখুঁত ফুটবলারই নন, বরং তিনি ব্যালন ডি’অরের মুকুট অর্জনের শতভাগ যোগ্য দাবিদার। কেবল গোল করার জন্মগত দক্ষতাই নয়, বরং দলের প্রয়োজনে মাঠে তাঁর অসামান্য পরিশ্রম ও দায়িত্বশীল মানসিকতারও উচ্চ প্রশংসা করেছেন সিমিওনে।
প্রতিপক্ষ কোচের এমন উদার প্রশংসার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে কেইনও সিমিওনেকে আধুনিক বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা ও ট্যাকটিক্যাল কোচ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে মাঠের খেলায় যে আগামী ৯০ মিনিট এক কঠিন ও রক্তক্ষয়ী লড়াই অপেক্ষা করছে, সে বিষয়েও দারুণ সচেতন বায়ার্নের এই তারকা স্ট্রাইকার।
উল্লেখ্য, চলতি মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লিগের গ্রুপ বা লিগ পর্বে এখন পর্যন্ত তিনটি ম্যাচ খেলে মাত্র পাঁচ পয়েন্ট সংগ্রহ করে পয়েন্ট তালিকার ১৪তম অবস্থানে রয়েছে বায়ার্ন মিউনিখ। টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে নরওয়ের ক্লাব বোদো/গ্লিমটকে হারালেও পরবর্তী সময়ে ভাইকিং ও জায়ান্ট আর্সেনালের বিপক্ষে ড্র নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে জার্মান জায়ান্টদের। অন্যদিকে, তাদের প্রতিপক্ষ আতলেটিকো মাদ্রিদ চার পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের ১৬তম স্থানে রয়েছে। ফলে দুই দলেরই প্রধান লক্ষ্য থাকবে সরাসরি শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করার লড়াইয়ে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করা।


























