ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা উত্তরে, সাবেক যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ক্লার্ক এয়ার বেসের বিস্তীর্ণ এলাকায় সরকার গড়ে তুলছে বহু বিলিয়ন ডলারের একটি ‘স্মার্ট সিটি’। প্রেসিডেন্ট ফের্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়রের স্বপ্নের এই নিউ ক্লার্ক সিটি ভবিষ্যতে পর্যটক ও বিনিয়োগকারীদের বড় আকর্ষণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
নিউ ক্লার্ক সিটি প্রকল্পটি ম্যানিলার তীব্র জনঘনত্ব কমানো ও বিদেশি বিনিয়োগ টানার কৌশলের অংশ। একই সঙ্গে কাছের বিমানবন্দর এলাকাকে কেন্দ্র করে নতুন রেললাইন, রানওয়ে সম্প্রসারণ এবং প্রায় ৫১৫ মিলিয়ন ডলারের একটি আধুনিক স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বড় কনসার্ট আয়োজনের উপযোগী হবে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এই উন্নয়ন প্রকল্পের মাঝখানেই পড়ে গেছে আদিবাসী এইতা জনগোষ্ঠীর গ্রাম সাপাং কাওয়ায়ান। প্রায় ৫০০ পরিবার নিয়ে গঠিত এই গ্রামে বাঁশ ও খড়ের ঘরে বসবাস করেন বাসিন্দারা। তাদের আশঙ্কা, উন্নয়নের নামে দ্রুতই তাদের বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করা হতে পারে।
গ্রামপ্রধান পেত্রোনিলা কাপিজ বলেন, তারা স্প্যানিশ বা মার্কিন শাসনেরও আগে এই ভূমিতে বসবাস করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জমি একের পর এক দখল হয়ে যাচ্ছে। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৮৯৮ সালে ফিলিপাইন দখলের পর যুক্তরাষ্ট্র ১৯২০-এর দশকে এই এলাকায় সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলে, যার ফলে বহু এইতা পরিবার তাদের পৈতৃক ভূমি হারায়।
১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ঘাঁটি হস্তান্তর করার পর ফিলিপাইন সরকারের একটি সংস্থা এলাকাটির দায়িত্ব নেয়। বর্তমানে ক্লার্ক অঞ্চলে প্রায় ২০ হাজার এইতা বাসিন্দা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যারা ৩২টি গ্রামে ছড়িয়ে আছে। তবে তাদের অধিকাংশের ভূমির মালিকানা এখনো সরকারিভাবে স্বীকৃত নয়।
সাপাং কাওয়ায়ানের বাসিন্দারা আশঙ্কা করছেন, ভূমির আইনি স্বীকৃতি পাওয়ার আগেই উন্নয়ন প্রকল্প তাদের উচ্ছেদ করবে। তাই তারা ফিলিপাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সহায়তায় দ্রুত পৈতৃক ভূমির স্বীকৃতির আবেদন প্রক্রিয়া শেষ করার চেষ্টা করছেন। জানুয়ারি, জুলাই ও সেপ্টেম্বর মাসে গ্রামে একাধিক সমাবেশ করে বংশতালিকা, পুরোনো ছবি ও মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহ করা হয়েছে, যাতে প্রমাণ করা যায় তারা ঔপনিবেশিক শাসনের আগ থেকেই সেখানে বসবাস করছে।
এইতা জনগোষ্ঠীর দাবি করা প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর জমির বড় অংশই নিউ ক্লার্ক সিটির জন্য নির্ধারিত এলাকার সঙ্গে মিলে যায়। পাশাপাশি কাছেই বিমানবন্দর ও স্টেডিয়াম প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে তাদের কৃষিজমি, নদী ও পাহাড়ি সম্পদ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
সরকার বলছে, নিউ ক্লার্ক সিটি একটি পরিবেশবান্ধব ও দুর্যোগ-সহনশীল আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। ২০১৮ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ২০১৯ সালের দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় গেমসের জন্য কিছু অবকাঠামো ব্যবহার করা হয়। পুরো প্রকল্প সম্পন্ন হতে ৩০ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
তবে মানবাধিকার সংগঠন ও গবেষকদের দাবি, প্রকল্প শুরুর পর থেকেই শত শত এইতা পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। কেউ কেউ অল্প সময়ের নোটিশে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। সরকারি সংস্থা ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের কথা বললেও আদিবাসীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
সরকারি কর্তৃপক্ষের দাবি, যেসব এলাকায় উন্নয়ন হচ্ছে সেখানে আইনি স্বীকৃত কোনো আদিবাসী ভূমি নেই। অন্যদিকে আদিবাসী অধিকারকর্মীরা বলছেন, দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার কারণে ভূমির স্বীকৃতি পেতে দেরি হচ্ছে, আর এই বিলম্বই এইতা জনগোষ্ঠীকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
তাদের আশঙ্কা, পৈতৃক ভূমির স্বীকৃতি না মিললে উন্নয়নের চাপে এইতা জনগোষ্ঠী নিজ ভূমিতেই পরিণত হবে ভূমিহীন মানুষের মতো।
















