উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ায় সমুদ্রপথে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টাকালে আটক হয়ে ডিটেনশন সেন্টারে দীর্ঘ বন্দিদশায় থাকা ৩৬ জনসহ মোট ১৭৪ জন বাংলাদেশি নাগরিক অবশেষে নিরাপদে স্বদেশে ফিরে এসেছেন। গতকাল মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে লিবিয়ার বেসরকারি বিমান সংস্থা ‘বুরাক এয়ার’-এর একটি বিশেষ বিমানে চেপে তাঁরা ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকভাবে পৌঁছান। মানবিক সহায়তা এবং সর্বাত্মক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে লিবিয়া থেকে একসঙ্গে এই বৃহৎ সংখ্যার বাংলাদেশিদের দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
ত্রিপোলিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) যৌথ উদ্যোগ ও প্রত্যক্ষ সার্বিক সহযোগিতায় এই জটিল প্রত্যাবাসন কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়। ঢাকায় ফেরত আসা এই বিশাল দলের মধ্যে অন্তত ৪১ জন নাগরিক বিভিন্ন রকমের জটিল শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন বলে জানা গেছে।
লিবিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের দাপ্তরিক তথ্যসূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, সমুদ্রপথে ঝুঁকি নিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপে পাড়ি জমানোর সময় লিবীয় কোস্টগার্ড ও নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক হয়ে ৩৬ জন বাংলাদেশি নাগরিক রাজধানী ত্রিপোলির অত্যন্ত বিপজ্জনক ‘তাজুরা ডিটেনশন সেন্টারে’ কারাবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিলেন। অন্যদিকে, বাকি ১৩৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক লিবিয়ার রাজধানী শহর ত্রিপোলির বিভিন্ন অঞ্চলে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ঝুঁকিপূর্ণ মানবপাচারকারীদের কবল থেকে রক্ষা পেতে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় স্বদেশে ফিরে আসার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন।
এর আগে বাংলাদেশিদের দেশে পাঠাবার প্রক্রিয়াকালে লিবিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের সম্মানিত রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল মো. হাবীব উল্লাহ Tripoli দূতাবাস প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়ে দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা এই নাগরিকদের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময় করেন। এ সময় দূতাবাসের কাউন্সেলর (শ্রম) এবং প্রথম সচিবসহ (শ্রম) অন্যান্য কূটনীতিকেরা উপস্থিত ছিলেন।
উক্ত সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে উপস্থিত বাংলাদেশিদের উদ্দেশে রাষ্ট্রদূত অনিয়মিত ও অবৈধ পথে বিদেশ পাড়ি দেওয়ার মারাত্মক প্রাণঘাতী ঝুঁকি এবং এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক সামাজিক ও আইনি পরিণতির কথা বিস্তারিত তুলে ধরে সবাইকে গভীরভাবে সচেতন করেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলেন, দালালদের প্রলোভনে পড়ে অনিয়মিত অবৈধ পথে বিদেশ গমনের চরম মাশুল হিসেবে সাধারণ মানুষকে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন, তীব্র মানসিক যন্ত্রণা এবং নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার মতো আর্থিক অপপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। এর চরম প্রভাব কেবল তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের ওপরই পড়ে না, বরং তাঁদের পরিবার এবং গোটা সমাজব্যবস্থাকেও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
রাষ্ট্রদূত নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে নতুন উদ্যমে সৎভাবে জীবনযাপন শুরু করার পরামর্শ প্রদান করেন এবং ভবিষ্যতে কাজের প্রয়োজনে কখনো বিদেশে যেতে হলে সব সময় সরকারের বৈধ ও নিয়মভিত্তিক পন্থা অনুসরণের জোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে অবৈধ অনিয়মিত অভিবাসনের চরম বিপদ সম্পর্কে নিজ নিজ এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে এবং দেশের সক্রিয় মানবপাচারকারী ও আন্তর্জাতিক অবৈধ দালাল চক্রের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার অনুরোধ করেন তিনি।
বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে পুনরায় আশ্বস্ত করে জানানো হয়েছে, লিবিয়ার বিভিন্ন কারাগারে ও বন্দিশিবিরে আটক থাকা এবং কাজের খোঁজে গিয়ে বিপদে পড়ে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে ইচ্ছুক সকল অবরুদ্ধ বাংলাদেশিদের নিরাপদ ও মানবিক প্রত্যাবাসন সুনিশ্চিত করতে তাঁরা অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন। প্রাতিষ্ঠানিক এই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে আগামী ২৮ অক্টোবর লিবিয়ার মিসরাতা শহর থেকে স্বেচ্ছায় স্বদেশে ফিরতে আগ্রহী আরও ১৭৫ জন আটকে থাকা বাংলাদেশি নাগরিককে সফলভাবে দেশে ফেরানোর উদ্দেশ্যে যাবতীয় দাপ্তরিক কাজ ও প্রস্তুতি পুরোদমে এগিয়ে চলছে।


























