মালদ্বীপের একটি বিলাসবহুল রিসোর্টে বকেয়া বেতন-ভাতা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, ওভারটাইমের বঞ্চনা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসুবিধার মারাত্মক অভাব দূর করার সুনির্দিষ্ট দাবিতে শ্রমিকদের গড়ে তোলা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
উদ্ভূত এই সংঘাতময় ঘটনায় বাংলাদেশি ও ভারতীয় নাগরিকসহ আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ জন প্রবাসী শ্রমিককে ইতোমধ্যে স্থানীয় পুলিশ সরাসরি আটক করেছে। আটককৃত শ্রমিকদের নিজ নিজ দেশে জোরপূর্বক ফেরত (ডিপোর্ট) পাঠানো হতে পারে বলে আন্দোলনরত শ্রমিকদের পক্ষ থেকে তীব্র আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া এই ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার কারণে প্রায় ১৫০ জন সাধারণ বাংলাদেশি শ্রমিককে একযোগে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বড় ধরনের ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উক্ত রিসোর্টে কর্মরত এক ভুক্তভোগী শ্রমিক জানান, আন্দোলনরত শ্রমিকদের বিশাল একটি অংশ মূলত ‘আইমা’ (Aima) নামের একটি বড় নির্মাণ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে চুক্তিভিত্তিক কাজ করে আসছিলেন। শ্রমিকদের উত্থাপিত অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁদের নিয়োগ চুক্তিপত্রে মাসিক মূল বেতন ৩০০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা থাকলেও বর্তমানে ডলারের পরিবর্তে তাঁদের হাতে মাত্র ৪ হাজার ৬০০ মালদ্বীপিয়ান রুফিয়া তুলে দেওয়া হচ্ছে। তার ওপর বিগত চার থেকে পাঁচ মাস ধরে তাঁদের নিয়মিত বেতন-ভাতা সম্পূর্ণ বকেয়া ফেলে রাখা হয়েছে এবং কোনো অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে না।
বিক্ষুব্ধ প্রবাসীদের আরও দাবি, তাঁদের প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে টানা সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত হাড়ভাঙা দায়িত্ব পালন করার পরও প্রতিদিন গড়ে আরও প্রায় তিন ঘণ্টা অতিরিক্ত বা ওভারটাইম কাজ করতে বাধ্য করা হয়। এসব মিলিয়ে তাঁদের প্রকৃত মাসিক আয় প্রায় ৫ হাজার থেকে ৫ হাজার ৮০০ রুফিয়ার মধ্যে দাঁড়ানোর কথা।
শ্রমিকেরা তাঁদের মানবেতর জীবনের চিত্র তুলে ধরে অভিযোগ করেন, কোনো শ্রমিক অসুস্থতার কারণে মাত্র একদিনের জন্য কাজে অনুপস্থিত থাকলে তাঁর মূল বেতন থেকে সরাসরি ৫ ডলার করে জরিমানা বাবদ কেটে নেওয়া হয়। তাছাড়া কর্মক্ষেত্রে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে শুধুমাত্র প্রাথমিক চিকিৎসার সুযোগ বিনা খরচে দেওয়া হলেও সাধারণ যেকোনো রোগব্যাধিতে রাজধানী মালে শহরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হলে তার সমুদয় খরচ সংশ্লিষ্ট শ্রমিককেই নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। এমনকি কর্মক্ষেত্রে মারাত্মক ও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হলেও চিকিৎসার কোনো দায়ভার বা ব্যয়ভার কোম্পানি বহন করে না বলে প্রবাসীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র সূত্রে জানা গেছে, শ্রমিকদের বেতনসংক্রান্ত তীব্র দাবির মুখে একপর্যায়ে কোম্পানির নীতিনির্ধারকেরা বেতনের অর্ধেক পরিমাণ অর্থ মার্কিন ডলারে দেওয়ার একটি সাময়িক প্রস্তাব রেখেছিল। তবে আন্দোলনকারী প্রবাসীরা সেই আংশিক প্রস্তাবে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। এর পরপরই কোম্পানি কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সংশ্লিষ্ট আন্দোলনকারী শ্রমিকদের সব ধরনের কাজকর্ম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
জানা গেছে, উক্ত রিসোর্টটিতে বাংলাদেশ, ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নাগরিকেরা শ্রম দিয়ে আসছেন। চলমান এই যৌথ আন্দোলনে বাংলাদেশি প্রবাসীদের পাশাপাশি ভারতীয় শ্রমিকেরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিলেও সংখ্যাগত দিক থেকে ভারতীয়দের হারই তুলনামূলক বেশি ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
আইমা কোম্পানির প্রত্যক্ষ বা সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত শ্রমিকের পাশাপাশি বিভিন্ন সাব-কন্ট্রাক্ট গ্রুপের মাধ্যমেও অনেক প্রজাতি প্রাক-চুক্তিতে সেখানে কাজ করতেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই আবার কোনো নির্দিষ্ট কফিল ছাড়া উন্মুক্ত ভিসায় এসে কাজ করছিলেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পুলিশি অভিযান ও আন্দোলনের পর কন্ট্রাক্ট প্রথার অধীনে কর্মরত সাধারণ শ্রমিকদের মাঝেও তীব্র ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের আশঙ্কা, এই ঘটনার অযাচিত সুযোগ নিয়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে তাদের ওপর নানামুখী প্রশাসনিক হয়রানি বা মিথ্যা মামলা চাপিয়ে দিতে পারে। এর পাশাপাশি অনেক শ্রমিকের কষ্টার্জিত কাজের বিল বা ভাউচার এখনো কোম্পানি কর্তৃক অনুমোদিত হয়নি, যার ফলে ভবিষ্যতে বকেয়া বেতন হাতে পাওয়া নিয়েও চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
ঘটনাস্থলের এক শ্রমিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার বিকেল ৪টার দিকে মালদ্বীপ পুলিশের একটি দল ওই রিসোর্টে হঠাৎ আকস্মিক অভিযান চালায়। অভিযানকালে আইমা কোম্পানির অধীনে কর্মরত বাংলাদেশি ও ভারতীয় নাগরিকসহ আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ জন আন্দোলনকারী শ্রমিককে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
সংকটময় পরিস্থিতিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, পুলিশ হাতে আটক ব্যক্তিদের অতি দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে আন্দোলনে যুক্ত থাকা প্রায় ১৫০ জন বাংলাদেশি শ্রমিককে যেকোনো সময় চাকরিচ্যুত করে দেশে ফেরত পাঠানোর সুনির্দিষ্ট আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছে প্রবাসীদের একটি সূত্র।
তবে এখন পর্যন্ত আটককৃত মোট প্রবাসীর সঠিক সংখ্যা, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঠিক কী ধরনের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করছে কিংবা চূড়ান্তভাবে কতজনকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে—সে বিষয়ে প্রশাসনিকভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি। উক্ত স্পর্শকাতর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইমা কোম্পানি, স্থানীয় পুলিশ কিংবা মালদ্বীপের সরকারি কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এমতাবস্থায়, মালদ্বীপে প্রবাসী শ্রমিকদের উত্থাপিত বকেয়া বেতন, বেআইনি কর্মঘণ্টা, অতিরিক্ত ওভারটাইমের পারিশ্রমিক, স্বাস্থ্যসেবার অভাব ও চুক্তিপত্রের নানাবিধ শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ প্রবাসী বাংলাদেশিরা। একই সাথে আটক হওয়া শ্রমিকদের আইনি অধিকার সুরক্ষা, তাঁদের দীর্ঘদিনের বকেয়া পাওনা আদায় এবং ডিপোর্টেশনের বিষয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেট ও সংশ্লিষ্ট উচ্চবাচ কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ ও স্পষ্ট বিবৃতি প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।


























