রাশিয়ায় লোভনীয় বেতনের বেসামরিক চাকরির ফাঁদে ফেলে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়ে যাওয়ার পর তাদের জোরপূর্বক রুশ সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার এবং ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর অবস্থান শনাক্ত করতে মানবীয় ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করার এক ভয়াবহ চিত্র আন্তর্জাতিক ও দেশীয় অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রাথমিক অনুসন্ধানী তথ্যানুযায়ী, এ পর্যন্ত রাশিয়ায় পাচার হওয়া ত্রিশজন বাংলাদেশির মধ্যে অন্তত কুড়িজন প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে সতেরো জনই সম্মুখ সমরে মোতায়েনের প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
এই ন্যক্কারজনক চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) মিজানুর রহমান ও আবু তাহের লেন্টু নামের দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ভুক্তভোগীদের গন্তব্যে পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে রুশ সামরিক কর্তৃপক্ষের হাতে সঁপে দেওয়া হতো। মাত্র একুশ দিনের সংক্ষিপ্ত সামরিক তালিম শেষে তাদের সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখভাগে ঠেলে দেওয়া হতো।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এবং মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডসের পৃথক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই মানবপাচারের গভীর নেটওয়ার্ক উন্মোচিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, রাঁধুনি বা ইলেকট্রিশিয়ানের মতো সাধারণ পদে মোটা বেতনের চাকরির মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে কিংবা ইউরোপে উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী ঋণ করে বা সম্পত্তি বিক্রি করে দালালদের হাতে অর্থ তুলে দিয়েছেন। রুশ ভাষার অপরিচিত নথিতে স্বাক্ষর করিয়ে তাদের অজান্তেই সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সংকলিত তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস নাগাদ অন্তত ১০৪ জন বাংলাদেশি নাগরিকের রুশ সেনাবাহিনীতে সম্পৃক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে, যার মধ্যে অন্তত চৌত্রিশ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছিল। এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডে মানবপাচার ও জোরপূর্বক সামরিক নিয়োগের অপরাধের আওতায় পড়ে।
বাংলাদেশি অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এর আগে মুহাম্মদ আলমগীর হোসেনসহ একটি মানবপাচারকারী চক্রের মূল হোতাদের আইনের আওতায় এনেছে। পাশাপাশি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় রাশিয়ায় আটকা পড়া নাগরিকদের ফিরিয়ে আনার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছে এবং প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কেবল দালাল চক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণই যথেষ্ট নয়; বরং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রস্তুত, আহত ও আটকে থাকা শ্রমিকদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন, মানবপাচারকারী চক্রের আর্থিক উৎস সন্ধান এবং রুশ সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, বিদেশে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখা সাধারণ মানুষ এমন ভয়াবহ প্রতারণার শিকার হতেই থাকবে।


























