গত এক দশকে পদ্মা তীরবর্তী রাজশাহী মহানগরীতে জলাশয়ের ভৌগোলিক মানচিত্র আশঙ্কাজনকভাবে বদলে গেছে। এক সময় যেখানে নগরজুড়ে ছড়িয়ে ছিল পৌনে এক হাজারেরও বেশি ছোট-বড় পুকুর ও দিঘি, সেখানে অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের কবলে পড়ে এখন টিকে রয়েছে মোটে দুই শ’র কাছাকাছি।
পরিবেশ বিষয়ক তথ্য ও সরকারি পরিসংখ্যানের তথ্যমতে, ২০১৪ সালেও রাজশাহীতে অন্তত ৯৫২টি সক্রিয় পুকুর বিদ্যমান ছিল। তবে মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে প্রায় ৮০০টি জলাশয় ভরাট করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন, আবাসিক এলাকা ও বিপণিবিতান। পুকুর কমার পাশাপাশি বিগত তিন দশকে নগরীর সবুজ আচ্ছাদন কমেছে প্রায় ২৬ শতাংশ। বিপরীতে ইটের তৈরি অবকাঠামো বা নির্মিত এলাকার আয়তন ৯.৭৩ বর্গকিলোমিটার থেকে একলাফে প্রায় ২২.৯৯ বর্গকিলোমিটারে গিয়ে পৌঁছেছে। ফলে স্থানীয় আবহাওয়া, স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং ভূগর্ভস্থ পানির সঞ্চয় প্রক্রিয়ায় এর প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরিমানা ও আইনি কড়াকড়ি থাকা সত্ত্বেও জলাধার ভরাটের অসাধু প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না।
অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক অভিযানে ভরাটকৃত জলাশয় উদ্ধার করা হলেও পরবর্তীতে নিয়মিত নজরদারির ঘাটতিতে সেখানে পুনরায় মাটি ফেলার অভিযোগ মিলছে। এর বড় উদাহরণ নগরীর হড়গ্রামের প্রায় দুই বিঘা আয়তনের একটি পুকুর। বিগত বছর এটি ভরাটের চেষ্টা করা হলে নভেম্বরে জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসনের যৌথ অভিযানে পুকুরটি পুনরুদ্ধার করা হয়। কিন্তু কিছুদিনের ব্যবধানে সেখানে আবারও রাতের আঁধারে মাটি ফেলার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
বাসিন্দারা অভিযোগ করে জানান, দিনের বেলায় প্রশাসনিক তৎপরতা থাকলেও রাতের সুযোগ নিয়ে ট্রাকে করে মাটি ও বর্জ্য এনে জলাশয়গুলো ভরাট করা হচ্ছে। অনেক জায়গায় ধীরে ধীরে ময়লা ফেলে গভীরতা কমিয়ে রূপান্তর ঘটানো হয়। নগরীর বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন এলাকায় পুকুর ভরাট করে ভবন নির্মাণ করা গেলে জমির বাজারমূল্য বহু গুণ বেড়ে যায়— এই লোভেই মূলত প্রভাবশালী অসাধু চক্র জলাধার দখলে মেতে উঠেছে। স্থানীয় অধিবাসী মুকুল আলী আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, একসময় এলাকা জুড়ে প্রচুর পুকুর থাকলেও অসাধু মানুষের লোভে সেগুলো হারিয়ে গেছে। শুধু সাময়িক অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করলেই হবে না, উদ্ধার পরবর্তী সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত না করতে পারলে বাকি জলাশয়গুলো রক্ষাও কঠিন হবে।
আরেক অধিবাসী আরাফাত হোসেন জানান, আবাসন ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের হিড়িকে দ্রুত উধাও হচ্ছে পুকুরগুলো। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। ভবিষ্যতে জনসংখ্যা ও নতুন অবকাঠামো আরও বাড়লে এই নাগরিক দুর্ভোগ ভয়াবহ রূপ নেবে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. চন্দন রায় জানান, রাজশাহীতে বেশ কয়েকটি বড় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকায় অন্যান্য জেলা থেকে পড়াশোনা ও জীবিকার তাগিদে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটছে। অতিরিক্ত আবাসন ও নাগরিক সুবিধার চাহিদা মেটাতে গিয়ে প্রাকৃতিক জলাশয় ও ফাঁকা জায়গাগুলোর ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, প্রতিটি পুকুর একেকটি স্বতন্ত্র ইকোসিস্টেম বা প্রতিবেশ বজায় রাখে। বর্ষায় এগুলো বৃষ্টির পানি ধারণ করে ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমায় এবং বাষ্পীভবনের মাধ্যমে স্থানীয় পরিবেশ ঠাণ্ডা রাখতে ভূমিকা রাখে।
এগুলো হারিয়ে গেলে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা নগর তাপদ্বীপ প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যায়, যার ফলে নগরজুড়ে তীব্র গরম অনুভূত হয় এবং প্রজাতিগত জীববৈচিত্র্যের চরম ক্ষতি হয়। আবহাওয়া অফিসের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০০৫ সালে রাজশাহীতে সর্বোচ্চ ৪২.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নথিভুক্ত হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে ৪২.০২, ২০০৯ সালে ৪১.০৮, ২০১০ সালে ৪২.৫, ২০১২ সালে ৪২, এবং ২০১৪ ও ২০২৩ সালে ৪২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। ২০২৪ সালে তাপমাত্রার পারদ রেকর্ড ৪৩ ডিগ্রিতে ওঠে। আর সাম্প্রতিক ২০২৬ সালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তাপমাত্রার ঊর্ধ্বগতি কেবল পুকুর হ্রাসের একক ফল নয়; বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি স্থানীয় ভূমির রূপান্তরও এর জন্য দায়ী। কংক্রিট ও পিচঢালা অবকাঠামো দিনের বেলা তাপ ধরে রাখে, অথচ জলাশয় পরিবেশকে ঠাণ্ডা রাখতে ভূমিকা রাখে। জলাধার ও গাছপালা কমে যাওয়ায় উত্তাপের অস্বস্তি বেড়েই চলেছে।
অন্যদিকে, নগরীতে জলাশয় কমে যাওয়ায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডে জরুরি পানির উৎস খুঁজে পেতে চরম বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে বলে জানিয়েছে রাজশাহী ফায়ার সার্ভিস। ভবনগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানির রিজার্ভার থাকলেও অগ্নিনির্বাপণের সময় উন্মুক্ত প্রাকৃতিক পানির বিকল্প নেই। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা)-র তথ্যানুযায়ী, রাজশাহীর একাধিক নদ-নদী বর্তমানে মারাত্মক সংকটে রয়েছে। একই সাথে স্থানীয় পর্যায়ে শতাধিক নদী-নালা ও খাল-বিল দখল ও ভরাটের শিকার হয়েছে।
বেলার রাজশাহী অঞ্চলের সমন্বায়ক তন্ময় কুমার সান্যাল জানান, রাজশাহীতে গ্রীষ্মের প্রখর তাপ ও শীতের প্রখণ্ডতা বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে জলাভূমি ও পরিবেশের এই বিপর্যয় সরাসরি দায়ী। প্রকৃতির ওপর মানুষের হস্তক্ষেপের পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিবর্তনও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। একই সাথে গ্রামপর্যায়ে কৃষিজমি কেটে অপরিকল্পিত মাছের পুকুর তৈরি করা এবং উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বৃক্ষনিধনের ফলে সার্বিক পরিবেশের ওপর চরম চাপ তৈরি হচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মহিনুল হাসান নিশ্চিত করেন, পুকুর ভরাটের খবর পাওয়ার সাথে সাথেই তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অবশিষ্ট জলাধার বাঁচাতে গত দুই বছরে মহানগরের কোনো পুকুরের শ্রেণী পরিবর্তনের অনুমোদন দেওয়া হয়নি এবং এ সংক্রান্ত নীতি অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলা হচ্ছে।
বোয়ালিয়া থানার সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের কর্মকর্তা রাহাতুল কবির মিজান জানান, পুকুর সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদী সমন্বিত পর্যবেক্ষণ জরুরি। পুকুরগুলোর ডিজিটাল তালিকা তৈরি, স্যাটেলাইট চিত্র নজরদারি, ভূমির শ্রেণী পরিবর্তন রোধ, নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা তৈরি এবং দাগ-খতিয়ানসহ তথ্য হালনাগাদ করা প্রয়োজন। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অসাধু উপায়ে পুকুর ভরাট করে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন, যা নগরবাসীর কাছে অজানা নয়। পরিবেশ রক্ষা ও রাজশাহীকে বাসযোগ্য রাখতে ভবিষ্যতে কেউ যেন আর কোনো জলাশয় ভরাট করতে না পারে, সেজন্য পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


























