রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার অন্তর্গত সাজেক ইউনিয়নে একটানা সড়ক অবরোধ চলায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দারুণভাবে ব্যাহত হয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা জোড়াব্রীজ থেকে শুরু করে সাজেক ভ্যালি পর্যন্ত সংযোগ সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ থমকে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আনা-নেওয়া এবং দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সাপ্তাহিক হাটবার হওয়া সত্ত্বেও স্থানীয় বাজারগুলোতে ক্রেতা ও বিক্রেতার সমাগম খুবই নগণ্য। পর্যাপ্ত যাতায়াত ব্যবস্থার অনুপস্থিতির কারণে উৎপাদিত জুমের ফসল যথাসময়ে বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে না পারায় পাহাড়ি চাষিরা গভীর উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এই অবরোধ কর্মসূচি যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তবে এলাকায় মারাত্মক খাদ্যঘাটতি সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকালের পর থেকে নির্ধারিত রুটগুলোতে কোনো ধরনের গাড়ি চলাচল করতে দেখা যায়নি। পিকেটাররা রাস্তার বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে নিজেদের জোরালো অবস্থান জানান দেয়। এমন নাজুক পরিস্থিতিতে সাজেক অঞ্চলের লুসাই, ত্রিপুরা, চাকমা এবং মারমা সম্প্রদায়ের প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষ বড় ধরনের ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেনের ভাষ্যমতে, সড়কজুড়ে অবরোধ কর্মসূচি চলমান রয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথেষ্ট সতর্ক অবস্থানে আছে। এই অবরোধের ফলে সাজেক ইউনিয়নের প্রায় ৩০ হাজার বাসিন্দা চরম দুর্দشায় পড়েছেন।
মূল উপত্যকায় জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা বিধান, এলাকায় সক্রিয় সশস্ত্র দলগুলোর সদস্যদের এলাকা থেকে অপসারণ এবং সাধারণ মানুষকে অহেতুক হেনস্তা করার প্রবণতা বন্ধে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে এই সড়ক অবরোধের ডাক দিয়েছে ‘সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি’ ও ‘সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন’। এর আগে গত ১১ অক্টোবর উক্ত দুটি সংগঠন অনির্দিষ্টকালের জন্য এই অবরোধের ডাক দিয়েছিল। পরবর্তীতে প্রশাসনের তরফ থেকে কার্যকর আশ্বাসের প্রেক্ষিতে ৪৮ ঘণ্টার জন্য আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। তবে পূর্বনির্ধারিত দাবিগুলো আদায় না হওয়ার অভিযোগ তুলে গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) এক যৌথ প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সংগঠনগুলো পুনরায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চালুর ঘোষণা দেয়। সংশ্লিষ্ট নেতাদের অভিযোগ, সাজেকের মাচালংসহ বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় একাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলের সরব উপস্থিতি রয়েছে। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে এসব সশস্ত্র ব্যক্তিদের ওই এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার জোর দাবি জানিয়ে আসছেন তারা।
এর পূর্বে চলমান অবরোধের মাঝে সাজেক অঞ্চলে আটকাপড়া দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে আনতে সেনাবাহিনীর বিশেষ সুরক্ষায় যখন গাড়ি বহর রওনা হয়, তখন উজো বাজার অংশে এসে সেটি আটকে দেয় অবরোধকারীরা। পরবর্তীতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা আলোচনার টেবিলে সমঝোতার পর পর্যটকবাহী ওই গাড়িগুলোকে গন্তব্যে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় এবং এরপর দুই দিনের জন্য অবরোধ শিথিল করা হয়েছিল। পর্যটকদের জীবনঝুঁকি ও সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরবর্তীতে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক পর্যটনকেন্দ্রে ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন।
সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের লড়াইকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক দুটি রাজনৈতিক দল—ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু গ্রুপ) মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে চলেছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর সকালে মাচালং অঞ্চলের মন্দিরছড়া পাড়ায় চলা সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয় মাচালং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া নয় বছরের শিশু সঞ্জিতা ত্রিপুরা। একের পর এক ঘটে চলা এসব সশস্ত্র গোলাগুলির ঘটনায় এলাকার সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে বলে জানিয়েছেন ওয়াকিবহাল মহল।
অপরপক্ষে, সাজেকের বন্ধ থাকা সড়ক যোগাযোগ যত দ্রুত সম্ভব স্বাভাবিক করার দাবিতে গত বুধবার খাগড়াছড়ি শহরের প্রাণকেন্দ্র শাপলা চত্বরে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ পালন করেন পর্যটন খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের কর্মীরা। সেখানে তারা প্রশাসনের প্রতি ২৪ ঘণ্টার একটি কঠোর সময়সীমা বা আল্টিমেটাম প্রদান করেন। এই অবরোধের ফলে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের ভোগান্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি সাজেকের সমগ্র পর্যটন ব্যবসা মারাত্মক অনিশ্চয়তার আবর্তে পড়েছে। অতিসত্বর এই সংকট নিরসনপূর্বক সড়কপথ সচল করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসীসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ।


























