রাজধানী ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ৪১ জন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের নির্ধারিত শুনানির দিন আজ বুধবার (৭ অক্টোবর ২০২৬) অনুষ্ঠিত হয়নি। আসামিপক্ষের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অতিরিক্ত সময় চেয়ে আবেদন করা হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করে শুনানি পিছিয়ে দেন। পরবর্তীতে বিচারিক প্যানেল মামলাটির অভিযোগ গঠনের পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১ নভেম্বর নতুন দিন ধার্য করেছেন।
এর আগে গত ২৬ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনাল ৭ অক্টোবর এই মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছিলেন। ওই সময় চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে, শাপলা চত্বরের মর্মান্তিক ঘটনার সঙ্গে জড়িত ৪১ জন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আমলে নিয়ে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য এই দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল। আলোচিত এই মামলার অভিযুক্ত মোট ৪১ জনের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩০ জন আসামিই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। জাতীয় দৈনিকে যথাযথ নিয়ম মেনে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরও তারা আদালতে আত্মসমর্পণ না করায় প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচার কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি রাষ্ট্রের খরচে তাদের পক্ষে আইনি সহায়তার জন্য স্টেট ডিফেন্স বা সরকারি আইনজীবী নিয়োগের সুনির্দিষ্ট আবেদন জানানো হয়।
এদিকে, এদিন কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে কারাগারে আটক থাকা ১১ জন আসামিকে অত্যন্ত সুরক্ষিত পাহারায় সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত থাকা এই ১১ জন হাইপ্রোফাইল আসামির মধ্যে রয়েছেন—সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, আব্দুর রাজ্জাক, দীপু মনি, হাসানুল হক ইনু, সাবেক প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক, সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, সাবেক ডিআইজি আব্দুল জলিল মণ্ডল, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, একাত্তর টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু এবং সাংবাদিক ফারজানা রূপা।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালে দাখিলকৃত আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে যে, ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের ঐতিহাসিক সমাবেশকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা জেলায় ব্যাপক ধ্বংসাত্মক সহিংসতা, নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং নির্বিচার দমন-পীড়নের ঘটনা ঘটেছিল। তৎকালীন ওইসব সহিংস ঘটনায় বহু নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান এবং অনেকেই গুরুতর আহত হন। মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা প্রণয়ন, গভীর ষড়যন্ত্র, উসকানি প্রদান, আক্রমণ পরিচালনার নির্দেশনা এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতার গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রসিকিউশনের জোরালো দাবি অনুযায়ী, তৎকালীন সরকারের অতি উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ স্থানীয় কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সরাসরি সমন্বয় ও নির্দেশেই হেফাজতের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে অংশ নেওয়া নিরস্ত্র নেতাকর্মীদের ওপর এই পৈশাচিক অভিযান চালানো হয়েছিল।
অভিযোগে আরও বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে যে, হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ বলপূর্বক দমন করা এবং আন্দোলনরত নেতাকর্মীদের ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেওয়ার অসদুদ্দেশ্যে রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্মমভাবে ব্যবহার করা হয়। অভিযানের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে আসামিদের বিভিন্ন প্ররোচনামূলক বক্তব্য, গোপন বা প্রকাশ্য বৈঠক, সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা এবং দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই মূলত এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়া এই ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের সংঘটিত হওয়ার পর কুশীলবরা যাতে রক্ষা পেতে পারে, সেজন্য ঘটনাগুলো ধামাচাপা দেওয়া, প্রকৃত তথ্য গোপন করা এবং এর সম্পূর্ণ দায় এড়ানোর নানা অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পুরো ঘটনাপ্রবাহকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ হিসেবে গণ্য করার জন্য প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালের কাছে বিশেষ আবেদন জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৭ জুলাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ৪১ জনের বিরুদ্ধে এই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেছিল প্রসিকিউশন টিম, যা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিকভাবে আমলে নেন। এই মামলার অভিযুক্ত আসামিদের দীর্ঘ তালিকায় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছাড়াও রয়েছেন—সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, হাসানুল হক ইনু, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আব্দুর রাজ্জাক, মাহবুবউল আলম হানিফ, হাছান মাহমুদ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, মৃণাল কান্তি দাস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, দীপু মনি, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, ওমর ফারুক চৌধুরী, সালাউদ্দিন মাহমুদ এবং ইমরান এইচ সরকার প্রমুখ। এছাড়া অভিযুক্ত সাংবাদিকদের তালিকায় শাহরিয়ার কবির, মোজাম্মেল হক বাবু ও ফারজানা রূপার নাম রয়েছে। পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে হাসান মাহমুদ খন্দকার, এ কে এম শহীদুল হক, মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, বেনজীর আহমেদ, মোখলেছুর রহমান, জেনারেল আজিজ আহমেদ, জিয়াউল আহসান, মো. মজিবুর রহমান, আব্দুল জলিল মণ্ডল, শেখ মুহাম্মাদ মারুফ হাসান, মাহবুব হোসেন, মনিরুল ইসলাম, মো. আনোয়ার হোসেন, আশরাফুজ্জামান, এস এম মেহেদী হাসান, হারুন-অর-রশীদ, বিপ্লব কুমার সরকার, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, মো. আসাদুজ্জামান, এস এম শিবলী নোমান ও বিএম ফরমান আলীর নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রসিকিউশনের পরিচালিত বিস্তারিত তদন্তে উঠে এসেছে যে, ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতের সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা জেলায় সংঘটিত সংঘর্ষ ও দমন-পীড়নে সর্বমোট ৫৮ জন মানুষ নিহত হয়েছিলেন। এর মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই ৩২ জন, নারায়ণগঞ্জে ২০ জন, চট্টগ্রামে ৫ জন এবং কুমিল্লায় ১ জনের সুনির্দিষ্ট পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে মামলার তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।


























