টেসলা ও এক্সএআই-এর প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক দীর্ঘদিন ধরেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং হিউম্যানয়েড রোবটের অভাবনীয় বিকাশ নিয়ে ধারাবাহিক পূর্বাভাস দিয়ে আসছেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২০২৭ থেকে ২০৩৬ সাল পর্যন্ত তাঁর ১০ বছরের বছরভিত্তিক ভবিষ্যদ্বাণীর একটি তালিকা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরাম, সাক্ষাৎকার ও প্রযুক্তি সম্মেলনে মাস্কের দেওয়া বক্তব্যগুলোর ভিত্তিতে তৈরি এই পর্যালোচনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আগামী এক দশকে মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনব্যবস্থায় এক অভাবনীয় রূপান্তর ঘটতে চলেছে।
মাস্কের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে কম্পিউটারভিত্তিক প্রায় সব জ্ঞাননির্ভর কাজ মানুষের চেয়েও দক্ষভাবে সম্পাদন করতে সক্ষম হবে এআই। ২০২৮ সালের দিকে সফটওয়্যার কোডিংয়ের ক্ষেত্রে এআই এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠবে যে, মানুষের পক্ষে সরাসরি প্রতিটি লাইনের কোড লেখা অর্থহীন হয়ে পড়বে—যা আধুনিক দাবার শক্তিশালী ইঞ্জিনগুলোর সাথে মানুষের প্রতিযোগিতার মতোই অপ্রাসঙ্গিক। অন্যদিকে, ২০২৯ সালের মধ্যে টেসলার হিউম্যানয়েড রোবট ‘অপটিমাস’ মানুষের সূক্ষ্ম শারীরিক ক্লান্তি ও সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে পৃথিবীর সেরা চিকিৎসকদের চেয়েও নিখুঁতভাবে জটিল অস্ত্রোপচার করতে পারবে। ২০৩০ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে এআই ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’ অর্জন করবে, যার বুদ্ধিমত্তা সমগ্র মানবজাতির সম্মিলিত সক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে যাবে।
অর্থনীতি ও উৎপাদন খাতেও রোবটিক্সের ব্যাপক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন মাস্ক। তাঁর মতে, ২০৩১ সাল নাগাদ বিশ্বে ১০০ কোটি পর্যন্ত হিউম্যানয়েড রোবটের উপস্থিতি নিশ্চিত হতে পারে, যার ফলে ২০৩২ সালের মধ্যে পণ্য উৎপাদন নাটকীয়ভাবে বেড়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি পেনশন বা ঐতিহ্যগত সঞ্চয়ের ধারণা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে চালু হতে পারে ‘ইউনিভার্সাল হাই ইনকাম’ ব্যবস্থা। ২০৩৫ সালে বেঁচে থাকার তাগিদে কাজ করার বাধ্যবাধকতা থাকবে না; মানুষ কেবল আনন্দ বা শখের তাগিদে কাজ করবে, ঠিক যেমন আনন্দ পেতে মানুষ নিজের আঙিনায় বাগান করে। পরিশেষে, ২০৩৬ সাল নাগাদ বিপুল পণ্য ও সেবার সহজলভ্যতার কারণে বিনিময় মাধ্যম হিসেবে অর্থের বিদ্যমান গুরুত্বই হয়তো বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
যদিও ইলন মাস্কের অতীতে দেওয়া অনেক সময়সীমা বাস্তবতার চেয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে এবং মর্গান স্ট্যানলির মতো বৈশ্বিক বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠানগুলো এমন পরিবর্তনের জন্য আরও দীর্ঘ সময় দেখছে, তবুও এআইয়ের বর্তমান দ্রুত অগ্রগতি এই পূর্বাভাসগুলোকে পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে দেয় না। তবে প্রযুক্তির এই অতিদ্রুত রূপান্তরের সাথে বিশ্ব অর্থনীতি ও মানবসমাজ কতটা খাপ খাইয়ে নিতে পারবে, আর মানুষ জীবনধারণের তাগিদ ছাড়া তার অস্তিত্ব ও পরিচয়ের নতুন কী অর্থ খুঁজে পাবে—সেটিই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।


























