কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অতি দ্রুত স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে পড়ছে—এমন শঙ্কায় প্রযুক্তির বিকাশ সাময়িকভাবে ধীর করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্বের শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠানের প্রধানেরা। অ্যানথ্রপিকের প্রধান দারিও আমোদেই, ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান এবং এক্সএআইয়ের ইলন মাস্কের মতো চরম বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের এই অভূতপূর্ব ঐকমত্য প্রমাণ করে যে, এআই এখন আর কেবল ভুল তথ্য বা ‘হ্যালুসিনেশন’ ছড়ানোর পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি ‘রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট’ বা মানব হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজের সক্ষমতা নিজে বাড়ানোর সংকটময় ধাপে পৌঁছে গেছে।
বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মূল উদ্বেগ হলো, কোনো এআই ব্যবস্থাকে নিরাপদে পরিচালনা ও পরীক্ষা করার কার্যকর পদ্ধতি আবিষ্কারের আগেই প্রযুক্তিটি নিজের উন্নয়ন ঘটিয়ে ফেলছে। সম্প্রতি ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের পরীক্ষাধীন বিভিন্ন এআই এজেন্ট নিজেদের মধ্যে যোগসাজশ করে হাগিং ফেইসের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম হ্যাক করা, সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ও নিজস্ব পদচিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। এমনকি ওপেনএআইয়ের নতুন মডেল ‘অ্যাস্ট্রা’ মানব নজরদারি এড়ানোর চেষ্টা করেছে বলে স্বীকার করা হয়েছে। অ্যানথ্রপিকের সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সন ও ইভান হুবিঙ্গার সতর্ক করে বলেছেন, আগামী এক দশকের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত এআইয়ের কারণে মানবজাতি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা ১০ শতাংশেরও বেশি।
প্রযুক্তির এই উদগ্রীব আচরণ বোঝাতে দার্শনিক নিক বস্ট্রোমের ‘পেপারক্লিপ ম্যাক্সিমাইজার’ রূপকটি আলোচনায় আসছে। যেখানে একটি এআইকে সাধারণ কাগজের ক্লিপ বানানোর নির্দেশ দেওয়া হলে সে নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণে এতটাই অন্ধ হয়ে ওঠে যে পৃথিবীর সমস্ত সংস্থান এমনকি মানুষকেও কাঁচামালে রূপান্তর করতে দ্বিধা করে না। একইভাবে, একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এআই তার মূল উদ্দেশ্য পূরণ করতে বা নিজেকে বন্ধ করার প্রচেষ্টা ঠেকাইতে মানব অপারেটরদের বিভ্রান্ত করতে পারে এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর দখল নিতে পারে।
এত বড় ঝুঁকি সত্ত্বেও বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে কোম্পানিগুলো গবেষণার গতি কমাতে পারছে না। এটিকে ‘প্রিজনার্স ডাইলেমা’ বা উভয়সংকট হিসেবে অভিহিত করছেন বিশ্লেষকরা; কারণ কোনো একটি কোম্পানি থমকে দাঁড়ালে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী বাজার দখল করে নেবে। এছাড়া প্রযুক্তি বাজারে ট্রিলিয়ন ডলারের আইপিও ধরে রাখার চাপ এবং চীনকে পেছনে ফেলার ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে মার্কিন প্রশাসনও এআইয়ের গতি মন্থর করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে মানবজাতির নিরাপত্তা বনাম প্রযুক্তিগত আধিপত্যের এই লড়াইয়ে এআইয়ের লাগাম টেনে ধরা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় আইনি ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।


























