শহরের বিকেল এক অদ্ভুত সময়। দিনের ব্যস্ততা যখন একটু একটু করে স্তিমিত হতে শুরু করে, তখন আকাশের রং বদলায়, তীব্র রোদ নরম হয়ে আসে, আর শহরের ইট, কাঠ, পাথর ও কংক্রিটের বুকে নেমে আসে এক অন্যরকম আলো। সারা দিনের ক্লান্ত শহর তখন যেন নিজের দিকে তাকায়, অথচ থমকে দাঁড়াতে পারে না।
ব্যস্ত লোকালয়ের বিকেল আসলে থেমে যাওয়ার নয়, বরং ব্যস্ততার এক রূপ থেকে আরেক রূপে প্রবেশের সময়। প্রধান সড়কগুলোয় তখন গাড়ির সারি দীর্ঘ হতে থাকে। বাসের দরজায় মানুষের ভিড়, রিকশার ঘণ্টি, মোটরসাইকেলের শব্দ আর একটানা হর্নে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। ফুটপাত ধরে ক্লান্ত মানুষগুলো বাড়ি ফেরার তাড়ায় হাঁটে। কারো মুখে দিন শেষের স্বস্তি, কারো চোখে ক্লান্তি, আবার কারো মুখে পরদিনের চিন্তার ছাপ।
এই শহরে বিকেল মানেই কোথাও না কোথাও যানজট। কয়েক মিনিটের পথ কখনো কখনো এক ঘণ্টার পথ হয়ে যায়। শহরের এই ব্যস্ততা সবার জন্য সমান না হলেও, ক্লান্তিটা যেন সবার শরীরেই কোনো না কোনোভাবে এসে জমা হয়। কংক্রিটের শহরের এই এক অদ্ভুত যন্ত্রণা। চারদিকে এত মানুষ, অথচ প্রত্যেকেই নিজের নিজের জীবনের মধ্যে বন্দি। এত আলো, অথচ কোথাও কোথাও গভীর অন্ধকার। এত শব্দ, অথচ অনেক মানুষের কথা বলার মতো কেউ নেই। তবু মানুষ এই শহরেই বাঁচে, স্বপ্ন দেখে, ভালোবাসে, অভিমান করে এবং প্রতিদিন নতুন করে ঘরে ফেরার চেষ্টা করে।
এই ব্যস্ততার মধ্যেই চায়ের দোকানগুলো বিকেলের এক আলাদা আশ্রয় হয়ে ওঠে। এক কাপ চা হাতে নিয়ে মানুষ কিছুক্ষণের জন্য নিজের ব্যস্ত জীবন থেকে একটু দূরে সরে দাঁড়ায়। চায়ের কাপ শেষ হয়ে যায়, কিন্তু আড্ডা শেষ হয় না। পার্ক বা মাঠের ধারে আবার অন্য এক শহর দেখা যায়। শিশুরা দিনের পড়াশোনা ভুলে খেলায় মেতে ওঠে। বয়স্করা বেঞ্চিতে বসে গল্প করে। প্রেমিক-প্রেমিকারা হয়তো শহরের কোলাহল থেকে নিজেদের জন্য সামান্য একটি নিরিবিলি জায়গা খুঁজে নেয়।
মসজিদ থেকে ভেসে আসে আজানের সুর। মনে হয়, এত ব্যস্ততার মধ্যেও মানুষকে থামার কথা মনে করিয়ে দেওয়ার মতো কিছু এখনো এই শহরে রয়ে গেছে। শহরের বিকেল তাই একই সঙ্গে সুন্দর এবং বিষণ্ণ। এখানে আনন্দ আছে, কিন্তু তার পাশে ক্লান্তি আছে। মানুষের ভিড় আছে, কিন্তু তার ভেতরেই একাকিত্ব আছে। তবু প্রতিদিন বিকেল আসে। আবার রোদ নরম হয়, ছায়া দীর্ঘ হয়, চায়ের দোকানে কেটলি ফুটতে থাকে, রাস্তায় মানুষের চলাচল চলতে থাকে, আর শহর তার নিজস্ব ছন্দে এগিয়ে যায়।


























