“যে জাতির বাচ্চাদের বিড়ালের ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ায়, তারা সিংহের সাথে লড়াই শিখবে কীভাবে?”—অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত এক কিশোরের ফেসবুক পোস্টের এই ক্যাপশনটি বর্তমান সমাজের এক গভীর মানসিক সংকটের চিত্র অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশাল সব মহড়া, কার প্রতিপত্তি কত বেশি এবং কার কাছে দামি আইফোন বা মোটরসাইকেল আছে তা জাহির করার এই অসুস্থ ট্রেন্ড এখন কিশোরদের জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে গ্রাস করছে। অপ্রতিমের মৃত্যুর পর তার বাবা-মার ওপর ‘ব্যাড প্যারেন্টিং’ বা উদাসীনতার অভিযোগের ঝড় উঠলেও প্রশ্ন থেকে যায় যে, আজকের এই সর্বগ্রাসী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে সব বাবা-মার পক্ষে কি স্রোতের বিপরীতে গিয়ে সন্তানকে রক্ষা করা সত্যিই সম্ভব?
যদি কোনো সচেতন অভিভাবক স্রোতের বিপরীতে হেঁটে সন্তানকে স্মার্টফোন না দিয়ে কেবল বই ও খেলাধুলায় যুক্ত রাখেন, তবে সেই সন্তান তার সহপাঠীদের মাঝে তীব্র হীনম্মন্যতায় ভুগে থাকতে পারে। কারণ চারপাশে যখন সমবয়সী সবাই আইফোন ও ভাইরাল সংস্কৃতি নিয়ে উন্মাদনায় মেতে থাকে, তখন একজন কিশোর নিজেকে ‘ওল্ড স্কুল’ মনে করে চরম বিচ্ছিন্নতাবোধে ভোগে। বন্ধুদের সঙ্গে মেশা বা তাদের লাইফস্টাইলের সঙ্গে তাল মেলানোর সামাজিক চাপের মুখে অভিভাবকরা এক জটিল এবং নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হন।
কিশোর গ্যাং আজ আমাদের সমাজে মহামারির রূপ ধারণ করেছে, যা প্রযুক্তির আশীর্বাদ বা অভিশাপের হাত ধরে আরও বেশি ভয়ংকর ও বিস্তৃত হয়ে উঠেছে। কার কাছে কোন অত্যাধুনিক অস্ত্র আছে বা কে কতটা প্রতিপত্তিশালী, তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে সর্বত্র। এর ওপর শর্ট-ফর্ম কনটেন্ট বা ‘রিলস’-কে কার্বন মনোক্সাইডের চেয়েও ধীর গতির বিষ হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়, যা মানুষের মস্তিষ্কের ধৈর্য, মনোযোগ এবং মানসিক স্থিরতার ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করে দিচ্ছে।
ভার্চুয়াল জগতের কালচারের পাশাপাশি আমাদের বাস্তব জীবনের অবকাঠামোগত সংকটও শিশুদের পথভ্রষ্ট করার জন্য সমানভাবে দায়ী। শিশুদের খেলাধুলার জন্য ঢাকা শহরসহ দেশের অধিকাংশ জেলা শহরে পর্যাপ্ত উন্মুক্ত খেলার মাঠ আর অবশিষ্ট নেই। মাঠগুলো আজ জবরদখল হয়ে বাণিজ্যিক ‘টার্ফ’-এর রূপ নিয়েছে, যেখানে যাতায়াতসহ একবার খেলতে গেলে ৫০০ টাকার কম খরচ হয় না। অধিকাংশ সাধারণ পরিবারের পক্ষেই এই ব্যয় বহন করা অসম্ভব হওয়ায় শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সুযোগ হারিয়ে কিশোররা অলস সময় গ্যাং কালচার ও ভার্চুয়াল আসক্তিতে ব্যয় করছে।
বিশ্বজুড়ে আজ এই একই সংকট দৃশ্যমান এবং উন্নত দেশগুলোও এর মোকাবিলায় নানামুখী জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ১৫-১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার আইন করা হলেও কিশোররা ভিপিএন ব্যবহার করে সহজেই সেই বয়স লুকানোর আইন এড়িয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জটিলতায় অনেক দেশের নীতিগুলোও আটকে রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে শুধু আইন বা বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে এই সমস্যার সমাধান করা কতখানি দুরূহ।
এই সর্বগ্রাসী পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কেবল একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্র নয়, বরং প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ, খেলার মাঠ পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক শিক্ষার সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। নগর পরিকল্পনায় সিটি কর্পোরেশনগুলোকে প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত একটি করে উন্মুক্ত খেলার মাঠ নিশ্চিত করতে হবে এবং বাণিজ্যিক টার্ফগুলোতে নির্দিষ্ট সময়ে শিশুদের বিনামূল্যে খেলার সুযোগ রাখতে হবে। পাশাপাশি স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মাঠ বিকেলে সাধারণ শিশুদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে নামমাত্র বয়স যাচাইয়ের পরিবর্তে জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধনের সঙ্গে ডিজিটাল আইডি যুক্ত করে অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করতে হবে। ফেসবুক, টিকটক বা অন্যান্য বহুজাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে কঠোরভাবে বাধ্য করতে হবে, যাতে তারা অ্যালগরিদম সংশোধন করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে কোনোভাবেই ক্ষতিকর বা সহিংস কনটেন্ট পৌঁছাতে না পারে।
পরিবার হলো মানুষের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শেখার প্রথম পাঠশালা। ডিজিটাল যুগের এই জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে অভিভাবকদেরও যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তিবান্ধব হতে হবে। সন্তানের ডিভাইসে ‘প্যারেন্টাল কন্ট্রোল’ অ্যাপের ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং নির্দিষ্ট স্ক্রিনটাইম বেঁধে দেওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড় ও অপরিহার্য দাবি।
একই সঙ্গে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন এনে পড়ালেখার পাশাপাশি নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং বিশেষ করে পরমতসহিষ্ণুতার চর্চা বাধ্যতামূলক করতে হবে। কিশোর গ্যাংয়ের মতো সামাজিক ব্যাধি নির্মূল করতে হলে এর পেছনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণগুলোর গভীরে গিয়ে অনুসন্ধান চালাতে হবে এবং এর নেপথ্য পৃষ্ঠপোষক বা ‘বড় ভাই’দের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। শৈশব-কৈশোরে সঠিক বিকাশ ও সুশিক্ষার সুযোগ তৈরি না করা গেলে এই শিশু-কিশোরদের হাত ধরেই সামনে এক অপূরণীয় সর্বনাশ অপেক্ষা করছে।


























