ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার হিসেবে স্বীকৃত ‘ব্যালন ডি’অর’-এর ২০২৬ সালের আসরে বিশ্বকে চমকে দিয়ে প্রথমবারের মতো এই মর্যাদাক্রমের শীর্ষস্থান অর্জন করে ইতিহাস গড়েছেন ইংল্যান্ডের জাতীয় দলের অধিনায়ক ও বায়ার্ন মিউনিখের গোলমেশিন স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ২৫ বছর পর প্রথম কোনো ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে এই অনন্য গৌরব অর্জন করার কৃতিত্ব দেখালেন তিনি। মর্যাদাপূর্ণ এই আসরে সেরা পাঁচে জায়গা করে নিয়েছেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম মহাতারকা ও রেকর্ড আটবারের বিজয়ী লিওনেল মেসি। তবে তাকে এবার সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে পঞ্চম স্থান নিয়ে। অন্যদিকে, ভোটের লড়াইয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন ফ্রান্সের সুপারস্টার কিলিয়ান এমবাপে এবং তৃতীয় স্থানটি দখল করেছেন স্পেনের উদীয়মান তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল।
গতকাল সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে যুক্তরাজ্যের লন্ডনের ঐতিহাসিক প্যালাডিয়াম থিয়েটারে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ এক বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর বিজয়ী ও শীর্ষ তারকাদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। এ বছর পুরুষদের বিভাগে হ্যারি কেইন, কিলিয়ান এমবাপে এবং লামিনে ইয়ামালকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে ব্যাপক আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনা ছিল। শেষ পর্যন্ত ক্লাব ও জাতীয় দলের জার্সিতে গোটা মৌসুমজুড়ে নিজের দুর্দান্ত ও অসামান্য পারফরম্যান্সের সুবাদে মর্যাদাপূর্ণ এই সোনালী ট্রফিটি নিজের করে নেন হ্যারি কেইন।
বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ২০২৫-২৬ মৌসুমে অবিশ্বাস্য রকমের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স উপহার দেন কেইন। জার্মান ক্লাব বায়ার্ন ও নিজের জাতীয় দলের হয়ে সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে পুরো মৌসুমে তিনি গোল করেন মোট ৭৩টি। বায়ার্ন মিউনিখকে ঘরোয়া ফুটবলের আসরে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এনে দেওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গোল করার পরিসংখ্যানেও তিনি পুরো মৌসুমজুড়ে অসাধারণ ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। তাঁর এই বর্ণিল পারফরম্যান্সই ব্যালন ডি’অরের চূড়ান্ত ভোটাভুটিতে অন্য সকল প্রতিদ্বন্দ্বীকে পেছনে ফেলে তাঁকে প্রথমবারের মতো তালিকার শীর্ষে পৌঁছাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
এবারের ভোটের প্রকাশিত তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন রিয়াল মাদ্রিদ ও ফ্রান্সের গতিপ্রকৃতির তারকা কিলিয়ান এমবাপে। আর দারুণ নৈপুণ্য দেখিয়ে তৃতীয় হয়েছেন বার্সেলোনা ও স্পেনের তরুণ ফরোয়ার্ড লামিনে ইয়ামাল। এ ছাড়া চতুর্থ স্থানে নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছেন স্পেনের অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার রদ্রি। পঞ্চম স্থানে জায়গা করে নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টার মায়ামি ও আর্জেন্টিনার চিরসবুজ মহাতারকা লিওনেল মেসি। এর মাধ্যমে দীর্ঘ দুই বছর পর ব্যালন ডি’অরের সেরা পাঁচে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন ঘটলেও আটবারের রেকর্ড বিজয়ীর পক্ষে শীর্ষস্থান অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
সেরা দশের বাকিদের মধ্যে ষষ্ঠ স্থানে অবস্থান করছেন জর্জিয়ার তারকা ফরোয়ার্ড খিচা কাভারৎস্খেলিয়া। সপ্তম স্থান অর্জন করেছেন গতবারের ব্যালন ডি’অর বিজয়ী ও ফ্রান্সের ফরোয়ার্ড উসমান দেম্বেলে। অষ্টম স্থানে জায়গা করে নিয়েছেন ম্যানচেস্টার সিটি ও নরওয়ের দুর্দান্ত স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড। নবম স্থানে রয়েছেন বায়ার্ন মিউনিখের ফরাসি ফরোয়ার্ড মাইকেল ওলিসে। আর সেরা দশের একদম শেষ প্রান্তে দশম স্থানে অবস্থান করছেন পিএসজি ও স্পেনের প্রতিভাবান মিডফিল্ডার ফাবিয়ান রুইজ।
সেরা দশের ঠিক বাইরে একাদশ স্থানে রয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের ইংলিশ মিডফিল্ডার জুড বেলিংহ্যাম। দ্বাদশ স্থান অর্জন করেছেন বার্সেলোনার স্প্যানিশ ডিফেন্ডার পাউ কুবারসি। ত্রয়োদশ স্থানে রয়েছেন পিএসজি ও মরক্কোর রক্ষণভাগের প্রধান ভরসা আশরাফ হাকিমি। চতুর্দশ স্থানে রয়েছেন পর্তুগিজ মিডফিল্ডার ভিতিনিয়া। এ ছাড়া আর্সেনাল ও ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার ডেকলান রাইস ১৫তম এবং স্পেনের তারকা ফরোয়ার্ড ফেররান তোরেস ১৬তম স্থান অর্জন করেছেন।
তালিকার ১৭তম স্থানে জায়গা পেয়েছেন ব্রাজিলের তারকা ফরোয়ার্ড ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। ১৮তম হয়েছেন স্পেনের মার্ক কুকুরেয়া। ১৯তম স্থানে রয়েছেন পিএসজি ও পর্তুগালের উদীয়মান মিডফিল্ডার জোয়াও নেভেস। আর এবারের মর্যাদাপূর্ণ সেরা ২০ জনের তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন করেছেন ইকুয়েডরের বিশ্বস্ত ডিফেন্ডার উইলিয়াম পাচো।
অন্যদিকে কেবল পুরুষ বিভাগেই নয়, নারী ফুটবলেও এবারের ব্যালন ডি’অরের ফলাফল ছিল সমানভাবে আলোচনায় ও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে। স্পেনের বিশ্বখ্যাত তারকা ফুটবলার অ্যালেক্সিয়া পুতেয়াস তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো নারী ব্যালন ডি’অর জয়ের অবিস্মরণীয় কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। এর আগে ২০২১ ও ২০২২ সালেও টানা এই प्रतिष्ठित পুরস্কার জিতেছিলেন বার্সেলোনার এই সাবেক তারকা। নতুন এই অভাবনীয় সাফল্যের মাধ্যমে নারী ফুটবল বিশ্বে নিজের অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানকে আরও অনেক বেশি শক্তিশালী করে তুললেন তিনি।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অরের আসরে হ্যারি কেইনের নতুন বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হওয়া ফুটবল বিশ্বে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। একই সাথে এমবাপে ও ইয়ামালের শীর্ষ তিনে শক্ত অবস্থান, লিওনেল মেসির মর্যাদাপূর্ণ পঞ্চম স্থান অর্জন এবং গতবারের ডিফেন্ডিং বিজয়ী দেম্বেলের সপ্তম স্থানে অবস্থান এবারের ভোটের সবচেয়ে বড় ও আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। ফুটবল বিশ্বের উজ্জ্বল তারকাদের সারা বছরের কঠোর পরিশ্রম ও জাদুকরী পারফরম্যান্সের সর্বোচ্চ স্বীকৃতিস্বরূপ এবারের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানটি বিশ্বজুড়ে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে।

























