বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির স্বকীয়তা চিহ্নিত করা কেন কঠিন, সেই প্রশ্ন তুলে একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে দেশের ক্ষমতা-কাঠামো এখনও উপনিবেশিক নন্দনতত্ত্বের একটি সম্প্রসারিত রূপ। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, যেকোনো তর্কের ভিত্তি নির্ধারণ সবসময়ই ক্ষমতা-কাঠামোর একটি ঘটনা।
ভাষা আন্দোলন কেবল ১৯৫২ সালের ঘটনা নয়, বরং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আলোচনা শুরুর পর থেকেই ভাষার প্রশ্নটি সামনে আসে। ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ যখন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার পক্ষে বক্তৃতা দেন, তখন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর বিরুদ্ধে পত্রিকায় কলাম লিখেছিলেন। অর্থাৎ, পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগেই এই বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়েছিল।
আরও আগে ১৯৪২ সালে আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৯-১৯৭৬) ও বুদ্ধদেব বসুর (১৯০৮-১৯৭৪) মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য বিতর্ক হয়। বুদ্ধদেব বসু তখন ‘সাহিত্যিক মুরুব্বি’ হিসেবে ‘মুসলমান লেখকদের’ প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন যেন তারা ‘মুসলমানি সাহিত্য’ না করে ‘বাংলা সাহিত্য’ করেন।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এখনও বাংলাদেশের প্রভাবশালী মহল থেকে একই ধরনের ‘আহ্বান’ জানানো হয়। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশি সাহিত্যিকদের সাংস্কৃতিক সংগ্রাম কেবল উর্দুর বিরুদ্ধে ছিল না, বরং তথাকথিত ‘বাংলা সাহিত্য’ সম্পর্কে উপনিবেশিক ধারণার বিরুদ্ধেও ছিল। এই ‘বাংলা সাহিত্যের’ ইতিহাস উপনিবেশিক আমলের বঙ্কিম-বিদ্যাসাগর থেকে শুরু হয়, এবং এর পূর্ববর্তী সবকিছু ‘মধ্যযুগ’ ও বাইরের বিষয়গুলোকে ‘ফোকলোর’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই বিষয়টি কখনোই সামনে আসতে পারে না, কারণ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আধিপত্য এখনও সেই উপনিবেশিক মানসিকতার লোকজনের হাতে রয়েছে। তারা মনে করেন যে, ‘বাংলাদেশি’ সংস্কৃতি বলে উল্লেখযোগ্য ভিন্ন কোনো সংস্কৃতি নেই, বা যা আছে তা ‘বাঙালি’ সংস্কৃতিরই একটি উপসেট। এই ধারণা বাংলাদেশের গণমাধ্যম, সাহিত্য প্রতিষ্ঠান, এমনকি রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোতেও ‘সুপ্রতিষ্ঠিত’ হয়ে আছে। এই সাংস্কৃতিক বয়ানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্তিত্বকে একভাবে দুর্বল করার ক্ষেত্র তৈরি করা হয়। অথচ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্তিত্ব সম্ভব হওয়ার পেছনে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ভিন্নতার জায়গা রয়েছে।


























