Dhaka ০২:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

নিখুঁত প্রতিসাম্যের খোঁজে স্থপতি রিশাদের উন্মাদনা

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ১১:৩২:৫৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
  • ১৬ বার দেখা হয়েছে

স্থপতি রিশাদ বারান্দার গ্রিলের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার চোখে চার নম্বর ও পাঁচ নম্বর খাঁজের মধ্যবর্তী দূরত্ব অন্যগুলোর চেয়ে দেড় মিলিমিটার বেশি মনে হচ্ছে। মিস্ত্রি ইউনুস গ্রিল বসানোর সময় রিশাদ বারবার মেপে দিলেও ইউনুস নিজের আন্দাজেই কাজ করে গেছেন। রিশাদের কাছে এই দেড় মিলিমিটার যেন বুকের ভেতর একটা ধারালো পেরেকের মতো খচখচ করছে। আশ্বিনের রোদও তার কাছে অসম মনে হচ্ছে—ডানদিকের আলো বেশি হলুদ, বামদিকেরটা মলিন।

ঢাকায় রিশাদের নকশা করা চারটি বহুতল ভবন আছে, যা স্থাপত্যের নিখুঁত উদাহরণ। অথচ তার নিজের ফ্ল্যাটই এখন তার কাছে নরক হয়ে উঠেছে। ড্রয়িংরুমে বসে থাকা ফুফাতো ভাই মকবুলের চেহারার মধ্যেও রিশাদ অসমতা খুঁজে পান। মকবুলের একটি চোখ অন্যটির চেয়ে সামান্য নিচে, হাসলে বামদিকের গাল বেশি ঝুলে পড়ে। মকবুল যখন লেবুর খোসা ছাড়াচ্ছিল, তখন লেবুর তীব্র গন্ধও রিশাদের কাছে সুষম মনে হয়নি, ডান নাকে বেশি ঢুকছে।

মকবুল রিশাদের স্ত্রী জেসমিনের খবর জানতে চাইলে রিশাদ শান্ত গলায় জানান, জেসমিন আর ফিরবে না। জেসমিন রিশাদের এই নিখুঁততার সংসার সহ্য করতে পারেননি। একবার ডালের বাটি টেবিলের ঠিক মাঝখানে না থাকায় রিশাদ সেটি মেঝেতে আছাড় মেরেছিলেন। জেসমিন তখন কেঁদে বলেছিলেন, ‘তুমি মানুষ না, রিশাদ, তুমি একটা জ্যামিতি বক্স।’

মানুষ চলে যাওয়ায় রিশাদের ঘর আরও বেশি জ্যামিতিক হয়ে উঠেছে। রাত এগারোটায় নিঝুম পরিবেশে রিশাদ তার শোবার ঘরে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ালেন। একটি জিরো ওয়াটের নীল বাল্বের আলোয় তিনি তার থ্রি-ডি লেজার স্ক্যানার দিয়ে নিজের শরীর স্ক্যান করেন। ল্যাপটপের স্ক্রিনে তার শরীরের ডিজিটাল নকশা ফুটে ওঠে।

হঠাৎ তার হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন দ্রুত হয়ে যায়। ল্যাপটপের লাল ফ্ল্যাশিং লাইট দেখাচ্ছে—তার ডান কান বাম কানের চেয়ে ৩.৪ মিলিমিটার নিচে এবং আকারে সামান্য বড়। আরও ভয়ানক তথ্য হলো, তার বাম হাতের মধ্যমা আঙুল ডান হাতের মধ্যমার চেয়ে ২.১ মিলিমিটার ছোট। এই অসমতা রিশাদকে স্তব্ধ করে দেয়। তিনি মনে করেন, সৃষ্টিকর্তা তাকে বানানোর সময় পরিমাপে ভুল করেছিলেন।

রিশাদ বাথরুমে গিয়ে দেয়ালের টাইলসের চকচকে তলে নিজের ছায়া দেখেন। তিনি ফিসফিস করে বলেন, ‘ঠিক করতে হবে। সংশোধন প্রয়োজন।’ তিনি ড্রয়ার থেকে তার আর্কিটেকচারাল টুলবক্স বের করেন, যেখানে আছে ধারালো সার্জিক্যাল স্ক্যালপেল, নিখুঁত স্টিল রুলার এবং ক্লোরোফর্মের শিশি।

তিনি ক্লোরোফর্ম দিয়ে ডান কানের লতি অবশ করে নেন। স্টিল রুলার দিয়ে মেপে ঠিক ৩.৪ মিলিমিটার বাড়তি অংশ স্ক্যালপেল দিয়ে কেটে ফেলেন। রক্ত ঝরতে থাকলেও রিশাদের কোনো কষ্ট হয় না। তার মনে হয়, তিনি একটি ত্রুটিপূর্ণ দেয়াল সোজা করছেন। ডান কান বাম কানের সমান্তরালে আসার পর তার ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে।

কিন্তু বাম হাতের মধ্যমা আঙুলটি ছোট হওয়ায় সেটি টেনে বড় করা সম্ভব নয়। ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে রিশাদ সিদ্ধান্ত নেন, সমতা আনার একমাত্র উপায় হলো ডান হাতের মধ্যমা আঙুল থেকে ঠিক ২.১ মিলিমিটার কেটে ছোট করে ফেলা। স্ক্যালপেল দিয়ে ডান হাতের আঙুলের ডগায় আঘাত করার সময় তীব্র যন্ত্রণা হলেও তিনি চিৎকার করেন না, কারণ চিৎকার করলে ঘরের বাতাসের কম্পন অসমান হয়ে যাবে। রক্তে টেবিল ভেসে যায়, ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত মেঝেতে পড়ে।

পরদিন সকালে মকবুল দইয়ের হাঁড়ি নিয়ে রিশাদের বাড়িতে এসে খোলা দরজা দেখে ভেতরে প্রবেশ করেন। ঘরের মেঝেতে লাল রঙের একটি নিখুঁত বৃত্ত আঁকা, যার মাঝখানে রিশাদ রক্তে ভেজা শরীরে বসে আছেন। তার ডান কানের অর্ধেকটা নেই, সেখানে ব্যান্ডেজ করা। ডান হাত একটি প্লাস্টিকের স্কেলের ওপর সোজা করে রাখা, সেখান থেকে রক্ত ঝরছে।

রিশাদ মকবুলের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে ল্যাপটপ দেখতে বলেন। ল্যাপটপের স্ক্রিনে সবুজ অক্ষরে লেখা : ১০০% সিমেট্রিক্যাল (Symmetrical)। রিশাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, এতদিনে তার জীবন সম্পূর্ণ হলো। তিনি মকবুলকে বলেন, ‘মকবুল, তোমার বাম চোখটা একটু নিচে না? এসো, ওটা ঠিক করে দিই। আমার কাছে স্কেল আছে।’

মকবুল দইয়ের হাঁড়ি ফেলে চিৎকার দিয়ে ছুটে পালান। হাঁড়ি ভেঙে দই আর মাটির টুকরোগুলো অসমানভাবে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে। রিশাদ বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করেন। তিনি আবার স্ক্যালপেল হাতে নেন, মেঝে পরিষ্কার করতে হবে। তার মতে, দুনিয়া অগোছালো থাকতে পারে না।

জনপ্রিয়

বিভাজনের রাজনীতি নয়, ঐক্য ও বাস্তবসম্মত সমাধান চায় মার্কিন জনগণ: বারাক ওবামা

নিখুঁত প্রতিসাম্যের খোঁজে স্থপতি রিশাদের উন্মাদনা

সর্বশেষ হালনাগাদ : ১১:৩২:৫৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

স্থপতি রিশাদ বারান্দার গ্রিলের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার চোখে চার নম্বর ও পাঁচ নম্বর খাঁজের মধ্যবর্তী দূরত্ব অন্যগুলোর চেয়ে দেড় মিলিমিটার বেশি মনে হচ্ছে। মিস্ত্রি ইউনুস গ্রিল বসানোর সময় রিশাদ বারবার মেপে দিলেও ইউনুস নিজের আন্দাজেই কাজ করে গেছেন। রিশাদের কাছে এই দেড় মিলিমিটার যেন বুকের ভেতর একটা ধারালো পেরেকের মতো খচখচ করছে। আশ্বিনের রোদও তার কাছে অসম মনে হচ্ছে—ডানদিকের আলো বেশি হলুদ, বামদিকেরটা মলিন।

ঢাকায় রিশাদের নকশা করা চারটি বহুতল ভবন আছে, যা স্থাপত্যের নিখুঁত উদাহরণ। অথচ তার নিজের ফ্ল্যাটই এখন তার কাছে নরক হয়ে উঠেছে। ড্রয়িংরুমে বসে থাকা ফুফাতো ভাই মকবুলের চেহারার মধ্যেও রিশাদ অসমতা খুঁজে পান। মকবুলের একটি চোখ অন্যটির চেয়ে সামান্য নিচে, হাসলে বামদিকের গাল বেশি ঝুলে পড়ে। মকবুল যখন লেবুর খোসা ছাড়াচ্ছিল, তখন লেবুর তীব্র গন্ধও রিশাদের কাছে সুষম মনে হয়নি, ডান নাকে বেশি ঢুকছে।

মকবুল রিশাদের স্ত্রী জেসমিনের খবর জানতে চাইলে রিশাদ শান্ত গলায় জানান, জেসমিন আর ফিরবে না। জেসমিন রিশাদের এই নিখুঁততার সংসার সহ্য করতে পারেননি। একবার ডালের বাটি টেবিলের ঠিক মাঝখানে না থাকায় রিশাদ সেটি মেঝেতে আছাড় মেরেছিলেন। জেসমিন তখন কেঁদে বলেছিলেন, ‘তুমি মানুষ না, রিশাদ, তুমি একটা জ্যামিতি বক্স।’

মানুষ চলে যাওয়ায় রিশাদের ঘর আরও বেশি জ্যামিতিক হয়ে উঠেছে। রাত এগারোটায় নিঝুম পরিবেশে রিশাদ তার শোবার ঘরে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ালেন। একটি জিরো ওয়াটের নীল বাল্বের আলোয় তিনি তার থ্রি-ডি লেজার স্ক্যানার দিয়ে নিজের শরীর স্ক্যান করেন। ল্যাপটপের স্ক্রিনে তার শরীরের ডিজিটাল নকশা ফুটে ওঠে।

হঠাৎ তার হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন দ্রুত হয়ে যায়। ল্যাপটপের লাল ফ্ল্যাশিং লাইট দেখাচ্ছে—তার ডান কান বাম কানের চেয়ে ৩.৪ মিলিমিটার নিচে এবং আকারে সামান্য বড়। আরও ভয়ানক তথ্য হলো, তার বাম হাতের মধ্যমা আঙুল ডান হাতের মধ্যমার চেয়ে ২.১ মিলিমিটার ছোট। এই অসমতা রিশাদকে স্তব্ধ করে দেয়। তিনি মনে করেন, সৃষ্টিকর্তা তাকে বানানোর সময় পরিমাপে ভুল করেছিলেন।

রিশাদ বাথরুমে গিয়ে দেয়ালের টাইলসের চকচকে তলে নিজের ছায়া দেখেন। তিনি ফিসফিস করে বলেন, ‘ঠিক করতে হবে। সংশোধন প্রয়োজন।’ তিনি ড্রয়ার থেকে তার আর্কিটেকচারাল টুলবক্স বের করেন, যেখানে আছে ধারালো সার্জিক্যাল স্ক্যালপেল, নিখুঁত স্টিল রুলার এবং ক্লোরোফর্মের শিশি।

তিনি ক্লোরোফর্ম দিয়ে ডান কানের লতি অবশ করে নেন। স্টিল রুলার দিয়ে মেপে ঠিক ৩.৪ মিলিমিটার বাড়তি অংশ স্ক্যালপেল দিয়ে কেটে ফেলেন। রক্ত ঝরতে থাকলেও রিশাদের কোনো কষ্ট হয় না। তার মনে হয়, তিনি একটি ত্রুটিপূর্ণ দেয়াল সোজা করছেন। ডান কান বাম কানের সমান্তরালে আসার পর তার ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে।

কিন্তু বাম হাতের মধ্যমা আঙুলটি ছোট হওয়ায় সেটি টেনে বড় করা সম্ভব নয়। ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে রিশাদ সিদ্ধান্ত নেন, সমতা আনার একমাত্র উপায় হলো ডান হাতের মধ্যমা আঙুল থেকে ঠিক ২.১ মিলিমিটার কেটে ছোট করে ফেলা। স্ক্যালপেল দিয়ে ডান হাতের আঙুলের ডগায় আঘাত করার সময় তীব্র যন্ত্রণা হলেও তিনি চিৎকার করেন না, কারণ চিৎকার করলে ঘরের বাতাসের কম্পন অসমান হয়ে যাবে। রক্তে টেবিল ভেসে যায়, ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত মেঝেতে পড়ে।

পরদিন সকালে মকবুল দইয়ের হাঁড়ি নিয়ে রিশাদের বাড়িতে এসে খোলা দরজা দেখে ভেতরে প্রবেশ করেন। ঘরের মেঝেতে লাল রঙের একটি নিখুঁত বৃত্ত আঁকা, যার মাঝখানে রিশাদ রক্তে ভেজা শরীরে বসে আছেন। তার ডান কানের অর্ধেকটা নেই, সেখানে ব্যান্ডেজ করা। ডান হাত একটি প্লাস্টিকের স্কেলের ওপর সোজা করে রাখা, সেখান থেকে রক্ত ঝরছে।

রিশাদ মকবুলের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে ল্যাপটপ দেখতে বলেন। ল্যাপটপের স্ক্রিনে সবুজ অক্ষরে লেখা : ১০০% সিমেট্রিক্যাল (Symmetrical)। রিশাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, এতদিনে তার জীবন সম্পূর্ণ হলো। তিনি মকবুলকে বলেন, ‘মকবুল, তোমার বাম চোখটা একটু নিচে না? এসো, ওটা ঠিক করে দিই। আমার কাছে স্কেল আছে।’

মকবুল দইয়ের হাঁড়ি ফেলে চিৎকার দিয়ে ছুটে পালান। হাঁড়ি ভেঙে দই আর মাটির টুকরোগুলো অসমানভাবে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে। রিশাদ বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করেন। তিনি আবার স্ক্যালপেল হাতে নেন, মেঝে পরিষ্কার করতে হবে। তার মতে, দুনিয়া অগোছালো থাকতে পারে না।