পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষিত বিশ্বসেরা ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের চারপাশ ঘিরে গড়ে ওঠা অননুমোদিত রিসোর্ট ও কটেজগুলো সরকারের কোনো ধরনের নির্দেশনার তোয়াক্কা করছে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এসব অবৈধ স্থাপনা বন্ধের আনুষ্ঠানিক নির্দেশ ও চিঠি দেওয়া হলেও তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এখনো দেদারছে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লোভনীয় বিজ্ঞাপন প্রচার এবং বিভিন্ন প্রণোদনা দিয়ে পর্যটকদের আকর্ষণ করার অভিযোগ উঠেছে রিসোর্ট মালিকদের বিরুদ্ধে।
খুলনা প্রতিনিধি হেদায়েৎ হোসেনের পাঠানো তথ্যানুযায়ী, গত এক দশকে সুন্দরবনের ঠিক বিপরীত পাশে পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে ২৪টিরও বেশি রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে উঠেছে। নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা ও তদারকি না থাকায় যত্রতত্র গাছপালা কেটে এবং জলাভূমি ভরাট করে এসব স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। ডলফিন অভয়ারণ্য হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত সুন্দরবনের ঢাংমারী খাল ঘিরে প্রায় ১০টি রিসোর্ট তৈরি করা হয়েছে, যেখান দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য ট্রলার ও পর্যটকবাহী নৌযান চলাচল করছে। বনের ভেতরে ও খালের পানিতে পর্যটকদের উচ্চস্বরে হৈ-হুল্লোড়, রাতের বেলা সাউন্ড বক্স বাজিয়ে গান ও বারবিকিউ পার্টির আয়োজন এবং উৎপাদিত প্লাস্টিক ও তরল বর্জ্য সরাসরি বনের খালে ফেলার কারণে সুন্দরবনের সংবেদনশীল বাস্তুসংস্থান মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় ও জেলা কার্যালय থেকে গত ৪ আগস্ট সুন্দরবনের পাশে গড়ে ওঠা অবৈধ ২৩টি রিসোর্ট অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে অধিদপ্তরের এই চিঠির কোনো তোয়াক্কা না করে রিসোর্ট মালিকরা আগের মতোই সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রচারের অংশ হিসেবে বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের বিনামূল্যে রিসোর্টে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য নানামুখী চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক পারভেজ আহমেদ জানান, নিয়ম না মেনে পরিবেশের ক্ষতি করার অপরাধে বারবার সতর্ক করার পর তাদের বন্ধের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে অননুমোদিত স্থাপনা অপসারণ না করা হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সরাসরি আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, রিসোর্টগুলোর কারণে বনের জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচলে চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তবে রিসোর্টগুলো বন সীমার বাইরে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে হওয়ায় বন বিভাগের সরাসরি উচ্ছেদ এখতিয়ার সীমিত; এ ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরকে কার্যকর নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক খোন্দকার মো. ফজলুল হক স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় কোনোভাবেই কোনো বাণিজ্যিক রিসোর্ট পরিচালনা করা আইনত দণ্ডনীয়। খুলনা বিভাগে ১৮টি, বাগেরহাটে ২টি এবং সাতক্ষীরায় ৪টিসহ মোট ২৩টি রিসোর্টকে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের সাধারণ সম্পাদক এবং জঙ্গলবাড়ি ও অরণ্যবাড়ি রিসোর্টের মালিক জাকারিয়া হোসাইন শাওন দাবি করেন, রিসোর্টগুলো বনের ভেতরে নয়, বরং সংলগ্ন জনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্থানীয় মানুষের বসতবাড়ি ও জীবনযাত্রাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। পর্যটকরা বনের ভেতরে প্রবেশ না করে দূর থেকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেন এবং এর মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিকল্প কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতির প্রসার ঘটছে। তিনি আরও বলেন, তাদের রিসোর্টগুলো আধুনিক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে পরিচালিত হচ্ছে এবং তারা এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বন্ধের নোটিশ পাননি।
সাতক্ষীরা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সোমেন মৈত্র জানান, সাতক্ষীরা উপকূলীয় এলাকার বর্ষা, ওসান প্যারাডাইজ, সুশীলন ও প্রসাদ প্যারাডাইজ নামের চারটি বিতর্কিত রিসোর্ট দীর্ঘদিন ধরে কোনো প্রকার পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করায় এবার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সরাসরি উচ্ছেদ ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষায় কেবল সতর্কীকরণ নোটিশ যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন পরিবেশবিদ ও গবেষকরা। বনের বাস্তুসংস্থান চিরতরে ধ্বংস হওয়ার আগেই অননুমোদিত রিসোর্টগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং টেকসই পরিবেশবান্ধব পর্যটন নীতি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।


























