বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের চারপাশের সংবেদনশীল প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ (ECA) জোনের ভেতর কোনো প্রকার বৈধ সরকারি অনুমোদন কিংবা পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক ঘরানার অন্তত ২৪টি রিসোর্ট ও কটেজ। আইনবহির্ভূতভাবে পরিচালিত এসব স্থাপনার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা জেলা কার্যালয়ের পক্ষ থেকে সম্প্রতি রিসোর্টগুলোর কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ ঘোষণা করার পাশাপাশি নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ সরিয়ে নেওয়ার লিখিত নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার সুন্দরবন-সংলগ্ন জনবসতিপূর্ণ এলাকায় দীর্ঘ দেড় দশক ধরে এই রিসোর্ট নির্মাণের ধারা চলে আসছে। ২০০৯ সালে সাতক্ষীরার মুন্সীগঞ্জে ‘টাইগার পয়েন্ট’ নামক একটি কটেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই বাণিজ্যিক ধারার সূচনা ঘটেছিল। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে বেসরকারি দাতা সংস্থার সহায়তায় খুলনার দাকোপে ১০টি রিসোর্ট নির্মিত হলেও পরবর্তী সময়ে তার বেশিরভাগই বন্ধ হয়ে যায়। তবে গত তিন-চার বছরের ব্যবধানে নতুন উদ্যোক্তারা আরও বেশ কিছু নতুন রিসোর্ট নির্মাণ করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেন।
শনাক্তকৃত ২৪টি রিসোর্টের মধ্যে বৃহত্তম খুলনার দাকোপ উপজেলাধীন (ঢাংমারী, কৈলাশগঞ্জ ও বাণীশান্তা এলাকা) সর্বাধিক ১৮টি, সাতক্ষীরায় ৪টি এবং বাগেরহাটের মোংলা এলাকায় ২টি রিসোর্ট রয়েছে। মালিকপক্ষ ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে এবং ইউনিয়ন পরিষদের কেবল সাধারণ ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করেই এসব স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মানুযায়ী সুন্দরবনের সীমানা থেকে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকাকে ‘ইসিএ জোন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, ফলে ওই অঞ্চলের ভেতরে কোনো বাণিজ্যিক পর্যটন রিসোর্টের জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র বা ক্লিয়ারেন্স প্রদান করার কোনো আইনি বিধান নেই। সম্প্রতি রিসোর্ট মালিকদের জমা দেওয়া সকল আবেদনপত্রও পরিবেশ অধিদপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করে দিয়েছে।
পরিবেশ ও বন সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের কোলঘেঁষে অনিয়ন্ত্রিতভাবে রিসোর্টগুলোর প্রসার ঘটার কারণে বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক প্রতিবেশব্যবস্থা মারাত্মক চাপের মুখে পড়ছে। পর্যটকদের অতিরিক্ত ভিড়, বিকট শব্দে সাউন্ড সিস্টেম বাজিয়ে শব্দদূষণ, রাতভর কৃত্রিম আলোর জোরালো ব্যবহার এবং যত্রতত্র প্লাস্টিকসহ ক্ষতিকর বর্জ্য ফেলার ফলে বনের স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে, বিপাকে পড়া রিসোর্ট মালিক ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তারা ২০১০ সালের জাতীয় পর্যটন নীতিমালার ৩.২.২ অনুচ্ছেদ অনুসরণ করেই নিজ মালিকানাধীন জমিতে ইকো-ট্যুরিজম ও পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তুলেছেন। রিসোর্ট অ্যান্ড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ইরাবতী ও বনমালী রিসোর্টের মালিক যুবাইর হিরা জানান, তারা ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স ও জেলা প্রশাসনের অনুমতির জন্য যথাযথ ফি প্রদান করে নিয়ম মেনে ব্যবসা করছেন। প্রতিটি রিসোর্টে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখাসহ তারা স্থানীয় বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন, যার ফলে এলাকার অপরাধপ্রবণতা ও বননির্ভরতা কমেছে। একই ধরনের যুক্তিতর্ক তুলে ধরেছেন বনলতা ও নিকুঞ্জ রিসোর্টের মালিক সুদীপ্ত গাইনও।
তবে পরিবেশ অধিদপ্তর সাতক্ষীরা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সোমেন মৈত্র এবং খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক খোন্দকার মো. ফজলুল হক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, আইন অমান্য করে স্পর্শকাতর ইসিএ জোনে কোনো অবৈধ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা রিসোর্ট পরিচালনার সুযোগ নেই। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্বেচ্ছায় কার্যক্রম বন্ধ না করলে অতি দ্রুত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সরাসরি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। অপরদিকে বন বিভাগ জানিয়েছে, রিসোর্টগুলো বনের সীমানার বাইরে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে হওয়ায় সরাসরি তাদের উচ্ছেদ করার এখতিয়ার সীমিত হলেও, সামগ্রিক পরিবেশ রক্ষায় এসবের কার্যক্রম বন্ধ হওয়া জরুরি।


























