Dhaka ০১:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

ইরাক থেকে বাংলাদেশে: নির্জন প্রান্তরে সুড়ঙ্গ কক্ষে আধ্যাত্মিক ধ্যানে লাভলী শাহ

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ১০:২০:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
  • ৮ বার দেখা হয়েছে

চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার ঘোলদাড়ী গ্রাম পার হয়ে কিছুটা দূরত্বে লোকচক্ষুর অন্তরালে অবস্থিত এক নীরব জনবসতিহীন প্রান্তর। স্থানীয় সাধারণ মানুষের কাছে এই নির্জন প্রান্তরটি ‘বেইলের মাঠ’ নামে সুপরিচিত। আজ থেকে প্রায় আড়াই দশক আগেও এই নির্জন ও ঝোপঝাড়পূর্ণ জঙ্গলাকীর্ণ মাঠে মানুষের যাতায়াত ছিল না বললেই চলে। অথচ সেই ধূ ধূ মাঠের বুকেই পরবর্তীতে গড়ে উঠেছে ‘বিশ্ব ধ্যান মঞ্জিল’ নামের এক অনন্য আধ্যাত্মিক আশ্রম। প্রায় সাড়ে সাত শতক জমির ওপর সুসংগঠিতভাবে গড়ে ওঠা সেই আশ্রমের একটি টিনের চালার নিচে রয়েছে মাটির গভীরে নেমে যাওয়া সিঁড়ির পথ। সেই সিঁড়ি দিয়ে ধাপে ধাপে নিচে নামলেই চোখে পড়ে সুড়ঙ্গের মতো ঘুটঘুটি অন্ধকার একটি বিশেষ কক্ষ। সেখানে মাটির তলদেশে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে পরম মনোযোগে ধ্যান ও আধ্যাত্মিক সাধনা করে আসছেন লাভলী শাহ ফকির রানী নামের এক ব্যতিক্রমী প্রবীণ নারী।

আশ্রমে মাটির নিচের সুড়ঙ্গ ছাড়াও রয়েছে আরও একটি সাধারণ টিনের ঘর। যেখানে নিজের একটি ছবির সামনে বসে নিয়মিত সাধনায় মগ্ন হন লাভলী শাহ। উক্ত ঘরটিতে ঐতিহ্যবাহী হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি ও বাঁধানো ছবি পরম শ্রদ্ধায় রাখা রয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে আসা দুজন অনুগত খাদেম এই নির্জন আশ্রমে লাভলী শাহর সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে অবস্থান করছেন এবং তাঁর সেবাযত্নে নিজেদের নিবেদিত রেখেছেন। তাঁদের মধ্যে একজনের নাম মাহবুব আলম বাচ্চু, যার আদি বাড়ি রাজবাড়ী জেলায়। আর অপর খাদেম আলভী বেগমের বাড়ি দূরবর্তী রংপুর জেলায়।

এলাকার স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দাদের মতে, লাভলী শাহ এই মাঠে প্রথম আসার আগে এই জমিতে কোনো ধরনের ফসলের আবাদ হতো না। কিন্তু তাঁর আগমনের পর থেকে সেখানে বর্তমানে প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি ও শস্য উৎপাদিত হয়। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা আখড়া বা সাধু আশ্রম নিয়ে মাঝেমধ্যেই নানা ধরনের নেতিবাচক কথাবার্তা শোনা গেলেও ‘বিশ্ব ধ্যান মঞ্জিল’ আশ্রমে তেমন কোনো অনিয়ম বা অনৈতিক কর্মকাণ্ড নেই। সেখানে সার্বক্ষণিক নীরব ধ্যান এবং আর্তমানবসেবায় নিজেদের সময় অতিবাহিত করেন লাভলী শাহ ও তাঁর দুই সহচর খাদেম।

দীর্ঘ আড়াই দশকের বেশি সময় ধরে এই আশ্রমে অবস্থানরত খাদেম মাহবুব আলম বাচ্চু নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “এটি মূলত দমের মাদারের পরম পবিত্র দরবার। দমের মাদার বলতে আমরা আত্মিক মা-কে বুঝি। মা এবং আমি এখানে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে সাধনা করে আসছি। এখানে নিয়মিত বিরতিতে সাধুসঙ্গের আয়োজন করা হয় এবং ভক্তদের ফলসেবা প্রদান করা হয়।”

নিজের গর্ভে কোনো সন্তান না থাকা সত্ত্বেও লাভলী শাহ তাঁর দীর্ঘ জীবনযাত্রায় পথ থেকে কুড়িয়ে পাওয়া ২০ জনেরও বেশি এতিম ও অসহায় পথশিশুকে মাতৃত্বের পরম মমতা দিয়ে লালন-পালন করে প্রাপ্তবয়স্ক করেছেন। বর্তমানে বার্ধক্যজনিত নানাবিধ জটিল অসুস্থতায় ভুগছেন এই সাধক নারী। চিকিৎসাধীন থাকার পরও সাধারণ মানুষের সার্বিক কল্যাণ কামনায় নিজের ধ্যান ও আধ্যাত্মিক সাধনা অবিরাম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

তবে তাঁর আড়াই দশকের এই দীর্ঘ ও কঠিন সাধনার পথটি মোটেও মসৃণ বা সমতল ছিল না। সাধক লাভলী শাহর নিজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নির্জন মাঠের বুকে একাকী আশ্রমে অবস্থানকালে অতীতে একাধিকবার স্থানীয় ডাকাত ও দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। এমনকি সরাসরি মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে প্রাণনাশের ভয় দেখানোর ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া পরম সাধক ফকির লালন শাহকে কেন্দ্র করে লেখা তাঁর দীর্ঘদিনের সংগ্রহের অত্যন্ত মূল্যবান ও দুর্লভ একটি ডায়েরিও রহস্যজনকভাবে হারিয়ে গেছে।

নিজের শৈশব ও ফেলে আসা অতীত জীবন সম্পর্কে খুব বেশি স্পষ্ট স্মৃতিকথা এখন আর মনে করতে পারেন না লাভলী শাহ। তাঁর বর্তমান বয়স ঠিক কত, কেই-বা তাঁর জন্মদাতা বাবা-মা কিংবা ঠিক কোন নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে তাঁর জন্ম—এসব মৌলিক বিষয়েও এখন আর সুনির্দিষ্ট কোনো পরিষ্কার ধারণা নেই বলে সরল স্বীকারোক্তি দেন তিনি। তবে তাঁর সুদৃঢ় দাবি, দূরতম দেশ ইরাক থেকে শৈশবে তিনি প্রথমে পাকিস্তান, পরবর্তীতে ভারত সীমান্ত অতিক্রম করে অবশেষে বাংলাদেশে এসে পৌঁছান।

অনভিপ্রেত শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করে লাভলী শাহ জানান, মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি সুদূর ইরাকে অবস্থান করছিলেন। সেখানে অত্যন্ত প্রভাবশালী এক ব্যারিস্টারের বাসভবনের বাইরে তাঁর শৈশবের দিনগুলো কাটত। পরবর্তীতে ১১ বছর বয়সে পৌঁছালে এক মহাত্মা সাধু তাঁর নাম রাখেন ‘লাভলী’। মূলত সেই গুরুর সান্নিধ্যেই তিনি প্রথম আধ্যাত্মিক জ্ঞানের দীক্ষা লাভ করেন এবং পরবর্তীতে কালজয়ী মহাত্মা লালন শাহর অমীয় দর্শনে গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ হন।

লাভলী শাহর দেওয়া তথ্যমতে, ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বেই তিনি বাংলাদেশে আগমন করেছিলেন। এরপর পরবর্তীতে ২০০০ সালে আলমডাঙ্গার ঘোলদাড়ী গ্রামের এই নির্জন প্রান্তরে স্থায়ীভাবে আশ্রম গড়ে বসবাস শুরু করার আগে তিনি অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশ ঘুরেছেন বলেও দাবি করেন।

মাটির তলদেশের অন্ধকার সুড়ঙ্গ কক্ষে দীর্ঘ সাধনা প্রসঙ্গে লাভলী শাহ বলেন, “এই বিশেষ মাটির স্থানটি আমি ১৯৭৯ সাল থেকেই বিভিন্ন প্রান্তে খুঁজে বেড়াতাম, কিন্তু মনমতো পাচ্ছিলাম না। অনেক অনুসন্ধান ও তদন্ত চালিয়ে অবশেষে ২০০০ সালে আমি এই নির্দিষ্ট স্থানে এসে স্থায়ী হই। সারাক্ষণ সেই মাটির নিচের গভীর ধ্যানের মধ্যেই ডুবে থাকতাম। দিনের বেলা আশ্রমে আসা ছেলেপেলে ও ভক্তদের সঙ্গ দিতাম, আর রাত নামলেই সুড়ঙ্গে নেমে আমার আসল কাজগুলো সম্পাদন করতাম। অর্থাৎ আমার অধ্যাত্ম সাধনা চালাতাম।”

আশ্রমে সর্বধর্মের মানুষের অবাধ সমাগম ও বৈচিত্র্যময় দেবদেবীর প্রতিমা রাখার কারণ ব্যাখ্যা করে লাভলী শাহ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বিশ্বজগতে একমাত্র ‘মানবধর্মই’ হলো সর্বশ্রেষ্ঠ ও পরম ধর্ম। সেই আদর্শে বিশ্বাসী বলেই আশ্রমে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের নানা দেবদেবীর মূর্তি ও ছবি রাখা হয়েছে। তাঁর এই ‘বিশ্ব ধ্যান মঞ্জিল’ আশ্রমে জাতপাতের কোনো ভেদাভেদ বা ধর্মীয় সংকীর্ণতা নেই। মূলত নিভে যাওয়া মানবধর্মের পুনর্জাগরণ এবং পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের প্রতি ভালোবাসাই এই আশ্রমের প্রধান শিক্ষা।

দীর্ঘ জীবনসংগ্রামে এখন পর্যন্ত সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো আর্থিক সাহায্য-অনুদান পাননি বলে জানান লাভলী শাহ। তবে এই প্রাপ্তিযোগ না থাকা নিয়ে সরকারি প্রশাসন বা কারও প্রতি তাঁর বিন্দুমাত্র ক্ষোভ, আক্ষেপ বা অভিযোগ নেই। সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও স্নেহ সম্বল করেই জীবনের শেষ দিনগুলো শান্তিতে কাটিয়ে দিতে চান তিনি।

জীবনের একেবারে শেষপ্রান্তে এসে নিজের শেষ ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করে সাধক লাভলী শাহ আবেগপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “কোনো সরকার আমাকে অনুদান দেয় নাই, তাতে আমার কিছু যায়-আসে না। তবে আমার একটাই মিনতি—আমার মৃত্যুর পর আমাকে যেন এই আশ্রমে মাটির নিচে শায়িত রাখা হয়। এখান থেকেই হয়তো ভবিষ্যতে বড় একটা কিছু হয়ে যাবে, ঠিক যেভাবে হযরত শাহ আলী হলেন, মাখদুম শাহ হলেন কিংবা সাইঁজি লালন শাহ হলেন।”

জনপ্রিয়

পোশাক খাতের শ্রমিক আন্দোলনে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নাশকতার প্রমাণ মিলল

ইরাক থেকে বাংলাদেশে: নির্জন প্রান্তরে সুড়ঙ্গ কক্ষে আধ্যাত্মিক ধ্যানে লাভলী শাহ

সর্বশেষ হালনাগাদ : ১০:২০:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার ঘোলদাড়ী গ্রাম পার হয়ে কিছুটা দূরত্বে লোকচক্ষুর অন্তরালে অবস্থিত এক নীরব জনবসতিহীন প্রান্তর। স্থানীয় সাধারণ মানুষের কাছে এই নির্জন প্রান্তরটি ‘বেইলের মাঠ’ নামে সুপরিচিত। আজ থেকে প্রায় আড়াই দশক আগেও এই নির্জন ও ঝোপঝাড়পূর্ণ জঙ্গলাকীর্ণ মাঠে মানুষের যাতায়াত ছিল না বললেই চলে। অথচ সেই ধূ ধূ মাঠের বুকেই পরবর্তীতে গড়ে উঠেছে ‘বিশ্ব ধ্যান মঞ্জিল’ নামের এক অনন্য আধ্যাত্মিক আশ্রম। প্রায় সাড়ে সাত শতক জমির ওপর সুসংগঠিতভাবে গড়ে ওঠা সেই আশ্রমের একটি টিনের চালার নিচে রয়েছে মাটির গভীরে নেমে যাওয়া সিঁড়ির পথ। সেই সিঁড়ি দিয়ে ধাপে ধাপে নিচে নামলেই চোখে পড়ে সুড়ঙ্গের মতো ঘুটঘুটি অন্ধকার একটি বিশেষ কক্ষ। সেখানে মাটির তলদেশে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে পরম মনোযোগে ধ্যান ও আধ্যাত্মিক সাধনা করে আসছেন লাভলী শাহ ফকির রানী নামের এক ব্যতিক্রমী প্রবীণ নারী।

আশ্রমে মাটির নিচের সুড়ঙ্গ ছাড়াও রয়েছে আরও একটি সাধারণ টিনের ঘর। যেখানে নিজের একটি ছবির সামনে বসে নিয়মিত সাধনায় মগ্ন হন লাভলী শাহ। উক্ত ঘরটিতে ঐতিহ্যবাহী হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি ও বাঁধানো ছবি পরম শ্রদ্ধায় রাখা রয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে আসা দুজন অনুগত খাদেম এই নির্জন আশ্রমে লাভলী শাহর সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে অবস্থান করছেন এবং তাঁর সেবাযত্নে নিজেদের নিবেদিত রেখেছেন। তাঁদের মধ্যে একজনের নাম মাহবুব আলম বাচ্চু, যার আদি বাড়ি রাজবাড়ী জেলায়। আর অপর খাদেম আলভী বেগমের বাড়ি দূরবর্তী রংপুর জেলায়।

এলাকার স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দাদের মতে, লাভলী শাহ এই মাঠে প্রথম আসার আগে এই জমিতে কোনো ধরনের ফসলের আবাদ হতো না। কিন্তু তাঁর আগমনের পর থেকে সেখানে বর্তমানে প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি ও শস্য উৎপাদিত হয়। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা আখড়া বা সাধু আশ্রম নিয়ে মাঝেমধ্যেই নানা ধরনের নেতিবাচক কথাবার্তা শোনা গেলেও ‘বিশ্ব ধ্যান মঞ্জিল’ আশ্রমে তেমন কোনো অনিয়ম বা অনৈতিক কর্মকাণ্ড নেই। সেখানে সার্বক্ষণিক নীরব ধ্যান এবং আর্তমানবসেবায় নিজেদের সময় অতিবাহিত করেন লাভলী শাহ ও তাঁর দুই সহচর খাদেম।

দীর্ঘ আড়াই দশকের বেশি সময় ধরে এই আশ্রমে অবস্থানরত খাদেম মাহবুব আলম বাচ্চু নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “এটি মূলত দমের মাদারের পরম পবিত্র দরবার। দমের মাদার বলতে আমরা আত্মিক মা-কে বুঝি। মা এবং আমি এখানে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে সাধনা করে আসছি। এখানে নিয়মিত বিরতিতে সাধুসঙ্গের আয়োজন করা হয় এবং ভক্তদের ফলসেবা প্রদান করা হয়।”

নিজের গর্ভে কোনো সন্তান না থাকা সত্ত্বেও লাভলী শাহ তাঁর দীর্ঘ জীবনযাত্রায় পথ থেকে কুড়িয়ে পাওয়া ২০ জনেরও বেশি এতিম ও অসহায় পথশিশুকে মাতৃত্বের পরম মমতা দিয়ে লালন-পালন করে প্রাপ্তবয়স্ক করেছেন। বর্তমানে বার্ধক্যজনিত নানাবিধ জটিল অসুস্থতায় ভুগছেন এই সাধক নারী। চিকিৎসাধীন থাকার পরও সাধারণ মানুষের সার্বিক কল্যাণ কামনায় নিজের ধ্যান ও আধ্যাত্মিক সাধনা অবিরাম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

তবে তাঁর আড়াই দশকের এই দীর্ঘ ও কঠিন সাধনার পথটি মোটেও মসৃণ বা সমতল ছিল না। সাধক লাভলী শাহর নিজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নির্জন মাঠের বুকে একাকী আশ্রমে অবস্থানকালে অতীতে একাধিকবার স্থানীয় ডাকাত ও দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। এমনকি সরাসরি মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে প্রাণনাশের ভয় দেখানোর ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া পরম সাধক ফকির লালন শাহকে কেন্দ্র করে লেখা তাঁর দীর্ঘদিনের সংগ্রহের অত্যন্ত মূল্যবান ও দুর্লভ একটি ডায়েরিও রহস্যজনকভাবে হারিয়ে গেছে।

নিজের শৈশব ও ফেলে আসা অতীত জীবন সম্পর্কে খুব বেশি স্পষ্ট স্মৃতিকথা এখন আর মনে করতে পারেন না লাভলী শাহ। তাঁর বর্তমান বয়স ঠিক কত, কেই-বা তাঁর জন্মদাতা বাবা-মা কিংবা ঠিক কোন নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে তাঁর জন্ম—এসব মৌলিক বিষয়েও এখন আর সুনির্দিষ্ট কোনো পরিষ্কার ধারণা নেই বলে সরল স্বীকারোক্তি দেন তিনি। তবে তাঁর সুদৃঢ় দাবি, দূরতম দেশ ইরাক থেকে শৈশবে তিনি প্রথমে পাকিস্তান, পরবর্তীতে ভারত সীমান্ত অতিক্রম করে অবশেষে বাংলাদেশে এসে পৌঁছান।

অনভিপ্রেত শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করে লাভলী শাহ জানান, মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি সুদূর ইরাকে অবস্থান করছিলেন। সেখানে অত্যন্ত প্রভাবশালী এক ব্যারিস্টারের বাসভবনের বাইরে তাঁর শৈশবের দিনগুলো কাটত। পরবর্তীতে ১১ বছর বয়সে পৌঁছালে এক মহাত্মা সাধু তাঁর নাম রাখেন ‘লাভলী’। মূলত সেই গুরুর সান্নিধ্যেই তিনি প্রথম আধ্যাত্মিক জ্ঞানের দীক্ষা লাভ করেন এবং পরবর্তীতে কালজয়ী মহাত্মা লালন শাহর অমীয় দর্শনে গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ হন।

লাভলী শাহর দেওয়া তথ্যমতে, ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বেই তিনি বাংলাদেশে আগমন করেছিলেন। এরপর পরবর্তীতে ২০০০ সালে আলমডাঙ্গার ঘোলদাড়ী গ্রামের এই নির্জন প্রান্তরে স্থায়ীভাবে আশ্রম গড়ে বসবাস শুরু করার আগে তিনি অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশ ঘুরেছেন বলেও দাবি করেন।

মাটির তলদেশের অন্ধকার সুড়ঙ্গ কক্ষে দীর্ঘ সাধনা প্রসঙ্গে লাভলী শাহ বলেন, “এই বিশেষ মাটির স্থানটি আমি ১৯৭৯ সাল থেকেই বিভিন্ন প্রান্তে খুঁজে বেড়াতাম, কিন্তু মনমতো পাচ্ছিলাম না। অনেক অনুসন্ধান ও তদন্ত চালিয়ে অবশেষে ২০০০ সালে আমি এই নির্দিষ্ট স্থানে এসে স্থায়ী হই। সারাক্ষণ সেই মাটির নিচের গভীর ধ্যানের মধ্যেই ডুবে থাকতাম। দিনের বেলা আশ্রমে আসা ছেলেপেলে ও ভক্তদের সঙ্গ দিতাম, আর রাত নামলেই সুড়ঙ্গে নেমে আমার আসল কাজগুলো সম্পাদন করতাম। অর্থাৎ আমার অধ্যাত্ম সাধনা চালাতাম।”

আশ্রমে সর্বধর্মের মানুষের অবাধ সমাগম ও বৈচিত্র্যময় দেবদেবীর প্রতিমা রাখার কারণ ব্যাখ্যা করে লাভলী শাহ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বিশ্বজগতে একমাত্র ‘মানবধর্মই’ হলো সর্বশ্রেষ্ঠ ও পরম ধর্ম। সেই আদর্শে বিশ্বাসী বলেই আশ্রমে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের নানা দেবদেবীর মূর্তি ও ছবি রাখা হয়েছে। তাঁর এই ‘বিশ্ব ধ্যান মঞ্জিল’ আশ্রমে জাতপাতের কোনো ভেদাভেদ বা ধর্মীয় সংকীর্ণতা নেই। মূলত নিভে যাওয়া মানবধর্মের পুনর্জাগরণ এবং পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের প্রতি ভালোবাসাই এই আশ্রমের প্রধান শিক্ষা।

দীর্ঘ জীবনসংগ্রামে এখন পর্যন্ত সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো আর্থিক সাহায্য-অনুদান পাননি বলে জানান লাভলী শাহ। তবে এই প্রাপ্তিযোগ না থাকা নিয়ে সরকারি প্রশাসন বা কারও প্রতি তাঁর বিন্দুমাত্র ক্ষোভ, আক্ষেপ বা অভিযোগ নেই। সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও স্নেহ সম্বল করেই জীবনের শেষ দিনগুলো শান্তিতে কাটিয়ে দিতে চান তিনি।

জীবনের একেবারে শেষপ্রান্তে এসে নিজের শেষ ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করে সাধক লাভলী শাহ আবেগপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “কোনো সরকার আমাকে অনুদান দেয় নাই, তাতে আমার কিছু যায়-আসে না। তবে আমার একটাই মিনতি—আমার মৃত্যুর পর আমাকে যেন এই আশ্রমে মাটির নিচে শায়িত রাখা হয়। এখান থেকেই হয়তো ভবিষ্যতে বড় একটা কিছু হয়ে যাবে, ঠিক যেভাবে হযরত শাহ আলী হলেন, মাখদুম শাহ হলেন কিংবা সাইঁজি লালন শাহ হলেন।”