Dhaka ০১:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী ঠাকুরগাঁও-১ ও সংরক্ষিত আসনের নবনির্বাচিত ২ সংসদ সদস্যের শপথগ্রহণ আজ

খুলনার ১৮টি পুকুর রক্ষায় ২৭ কোটি টাকার প্রকল্প

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ১০:৩৪:২৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
  • ৫ বার দেখা হয়েছে

খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক মালিকানাধীন ১৮টি ঐতিহ্যবাহী পুকুর সংরক্ষণ এবং সার্বিক সৌন্দর্যবর্ধনের লক্ষ্যে ২৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকার একটি বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করেছে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)। গৃহীত এই পরিকল্পনার প্রথম পর্যায়ে নগরীর ৯টি পুকুরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়নকাজ শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব পুকুরে মূল খননকাজ, ঘোলা পানি পরিবর্তন, চারপাশে দৃষ্টিনন্দন হাঁটার পথ (ওয়াকওয়ে), আধুনিক ঘাট, ধারণকারী দেয়াল (রিটেইনিং ওয়াল), বসার স্থান এবং সর্বসাধারণের জন্য শৌচাগার নির্মাণের বিশদ পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রকল্পটিতে পুকুরের মূল গভীরতা ও পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির চেয়ে কেবল সৌন্দর্যবর্ধনমূলক অবকাঠামো নির্মাণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সচেতন নগরবাসীর মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

প্রথম পর্যায়ে যেসব পুকুরে উন্নয়নকাজ শুরুর প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে, সেগুলো হলো—সরকারি বিএল কলেজ পুকুর, হরাইজন কলোনি পুকুর, লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ পুকুর, মিউনিসিপ্যাল ট্যাংক রোড পুকুর, তালিমুল মিল্লাত রহমতিয়া ফাজিল মাদ্রাসা পুকুর, তালতলা হাসপাতাল পুকুর, ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্ক পুকুর, ১৬ নম্বর ওয়ার্ড অফিস পুকুর এবং মহাশ ট্যাংক পুকুর।

কেসিসির দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা ও টেকসই পরিবেশ গড়তে ‘খুলনা শহর এলাকার উন্নয়ন (ফেজ-২)’ শীর্ষক বিশেষ প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিক পর্যায়ে ২৩টি পুকুর উন্নয়নের কথা ভাবা হয়েছিল। তবে প্রস্তাবিত প্রকল্পের প্রাক্কলিত মোট ব্যয় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় প্রথম ধাপে ২৩টির পরিবর্তে ৯টি পুকুরের উন্নয়নকাজ শুরুর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ডিপিপি সংশোধন সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে বাকি পুকুরগুলোর উন্নয়নকাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এর আগে কেসিসির পক্ষ থেকে নগরীর ১৮টি সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক জলাধার সংরক্ষণ ও রূপায়ণের তথ্য জানানো হয়েছিল। চলতি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত এক দাপ্তরিক প্রতিবেদনে কেসিসির প্রকল্প পরিচালক ও প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আবির উল জব্বার নিশ্চিত করেছিলেন যে, পুকুরগুলোর সংরক্ষণ ও আধুনিক সৌন্দর্যবর্ধনের যাবতীয় নকশা প্রণয়নের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

পানি ধারণক্ষমতা নাকি রূপচর্চা:

পরিকল্পিত প্রকল্প বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তালিমুল মিল্লাত রহমতিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা নাজমুস সউদ জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের পুকুরটির বর্তমান অবস্থা বেশ ভালো এবং পানিও ব্যবহার উপযোগী। মাদ্রাসার নিজস্ব মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী পুকুরটি বর্তমান প্রাকৃতিক অবস্থাতেই রাখা হবে। দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পুকুর ও সংলগ্ন খেলার মাঠের পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে কেসিসিকে তাদের শর্ত সাপেক্ষে উন্নয়নকাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় অনাপত্তিপত্র (এনওসি) প্রদান করা হয়েছে।

অন্যদিকে সরকারি বিএল কলেজের শিক্ষার্থী হযরত আলী জানান, তাঁদের ক্যাম্পাসের পুকুরটি মূলত শিক্ষার্থীদের গোসল এবং স্থানীয় মসজিদের মুসল্লিদের অজুর কাজে প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত হয়। সংস্কারের পর পুকুরটির পরিবেশ পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক হবে বলে তারা আশাবাদী। তাঁর মতে, উন্নত ঘাটলা, অজু ও গোসলের জন্য নিষ্কন্টক পানির সংস্থান এবং পাড় মজবুত করা হলে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন। তবে বাহ্যিক সৌন্দর্যবর্ধনের চেয়ে পুকুরের মূল পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানোকে তিনি বেশি জরুরি মনে করেন, যাতে বর্ষাকালে বেশি পরিমাণ পানি ধরে রাখা সম্ভব হয়।

একইভাবে ট্যাংক রোড পুকুরপাড়ের বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, পুকুরের বিদ্যমান পানি স্বচ্ছ নয়। এটি দ্রুত পরিবর্তন করা প্রয়োজন, যাতে শিশুরা নিরাপদ পরিবেশে সাঁতার শিখতে পারে। খুলনায় সাঁতার প্রশিক্ষণের জন্য আলাদা সুইমিং পুল না থাকায় পুকুরগুলোকে সাঁতার শেখার উপযোগী করা গেলে স্থানীয় শিশুরা ভবিষ্যতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবদান রাখতে পারবে।

প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট আওতায় পুকুর পুনঃখনন ও পানি পরিবর্তনের পাশাপাশি আধুনিক শৌচাগার ও সৌন্দর্যবর্ধনমূলক স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও পুকুরগুলোর বর্তমান গভীরতা কত এবং সংস্কারের পর পানি ধারণক্ষমতা ঠিক কতটা বাড়বে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশের জোর দাবি উঠেছে।

সার্বিক বিষয়ে কেসিসির প্রকল্প পরিচালক আবির উল জব্বার গণমাধ্যমকে বলেন, ১৮টি নির্দিষ্ট পুকুরের জন্য সর্বমোট প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এর অধীনে খনন, পানি পরিবর্তন ও প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি করা হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে রক্ষণাবেক্ষণ কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

বিলীন ৮০ জলাশয়, ঝুঁকিতে পরিবেশ:

খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, নগরের ৩১টি ওয়ার্ডে ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানের (ডাপ) মানচিত্রে চিহ্নিত ২৯৮টি প্রাকৃতিক জলাশয়ের মধ্যে ইতোমধ্যে ৮০টির অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে এবং আরও ২৭টি জলাশয় আংশিক ভরাট হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. সালাউদ্দীন জানান, এই ১৮টি পুকুর সঠিকভাবে সংস্কার করা গেলে নগরের জলাবদ্ধতা হ্রাস ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে তা বড় ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে এটি ক্রমবর্ধমান নগরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক হবে।

তবে সৌন্দর্যবর্ধনের নামে পুকুরপাড়ে অতিরিক্ত কংক্রিট ব্যবহারের বিরুদ্ধে তীব্র সতর্কবার্তা দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ। তাঁর মতে, পাড়ে অতিরিক্ত কংক্রিট ঢাললে ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণ ও তাপমাত্রা কমানোর সুফল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। কংক্রিটের পরিবর্তে পানি চুইয়ে মাটিতে প্রবেশ করতে পারে এমন ছিদ্রযুক্ত পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা রাখা জরুরি।

প্রকল্পের প্রকৃত অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন:

কেসিসির দাবি অনুযায়ী, প্রকল্পটির লক্ষ্য কেবল রূপচর্চা নয়; বরং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার পরিকল্পনাও এতে অন্তর্ভুক্ত। ইতিপূর্বে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত কর্মশালা ও সেপ্টেম্বরের অবহিতকরণ সভাতেও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

তবে পরিবেশবিদ ও নগরবাসীর মনে মূল প্রশ্নটি রয়েই গেছে—২৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বাজেটের মধ্যে মূল পুকুর খনন ও পানি ধারণক্ষমতা বাড়াতে কত টাকা বরাদ্দ এবং কৃত্রিম অবকাঠামো বা সৌন্দর্যবর্ধনে কত টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে? ব্যয়ের খণ্ডভিত্তিক স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করা হলেই কেবল বোঝা যাবে এই প্রকল্পে জলাধার সংরক্ষণ কতটা অগ্রাধিকার পেয়েছে।

জনপ্রিয়

প্রিপেইড মিটারে রিচার্জ বন্ধ থাকবে ২৪ ঘণ্টা, ডেসকোর জরুরি নির্দেশনা

খুলনার ১৮টি পুকুর রক্ষায় ২৭ কোটি টাকার প্রকল্প

সর্বশেষ হালনাগাদ : ১০:৩৪:২৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক মালিকানাধীন ১৮টি ঐতিহ্যবাহী পুকুর সংরক্ষণ এবং সার্বিক সৌন্দর্যবর্ধনের লক্ষ্যে ২৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকার একটি বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করেছে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)। গৃহীত এই পরিকল্পনার প্রথম পর্যায়ে নগরীর ৯টি পুকুরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়নকাজ শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব পুকুরে মূল খননকাজ, ঘোলা পানি পরিবর্তন, চারপাশে দৃষ্টিনন্দন হাঁটার পথ (ওয়াকওয়ে), আধুনিক ঘাট, ধারণকারী দেয়াল (রিটেইনিং ওয়াল), বসার স্থান এবং সর্বসাধারণের জন্য শৌচাগার নির্মাণের বিশদ পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রকল্পটিতে পুকুরের মূল গভীরতা ও পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির চেয়ে কেবল সৌন্দর্যবর্ধনমূলক অবকাঠামো নির্মাণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সচেতন নগরবাসীর মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

প্রথম পর্যায়ে যেসব পুকুরে উন্নয়নকাজ শুরুর প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে, সেগুলো হলো—সরকারি বিএল কলেজ পুকুর, হরাইজন কলোনি পুকুর, লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ পুকুর, মিউনিসিপ্যাল ট্যাংক রোড পুকুর, তালিমুল মিল্লাত রহমতিয়া ফাজিল মাদ্রাসা পুকুর, তালতলা হাসপাতাল পুকুর, ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্ক পুকুর, ১৬ নম্বর ওয়ার্ড অফিস পুকুর এবং মহাশ ট্যাংক পুকুর।

কেসিসির দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা ও টেকসই পরিবেশ গড়তে ‘খুলনা শহর এলাকার উন্নয়ন (ফেজ-২)’ শীর্ষক বিশেষ প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিক পর্যায়ে ২৩টি পুকুর উন্নয়নের কথা ভাবা হয়েছিল। তবে প্রস্তাবিত প্রকল্পের প্রাক্কলিত মোট ব্যয় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় প্রথম ধাপে ২৩টির পরিবর্তে ৯টি পুকুরের উন্নয়নকাজ শুরুর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ডিপিপি সংশোধন সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে বাকি পুকুরগুলোর উন্নয়নকাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এর আগে কেসিসির পক্ষ থেকে নগরীর ১৮টি সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক জলাধার সংরক্ষণ ও রূপায়ণের তথ্য জানানো হয়েছিল। চলতি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত এক দাপ্তরিক প্রতিবেদনে কেসিসির প্রকল্প পরিচালক ও প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আবির উল জব্বার নিশ্চিত করেছিলেন যে, পুকুরগুলোর সংরক্ষণ ও আধুনিক সৌন্দর্যবর্ধনের যাবতীয় নকশা প্রণয়নের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

পানি ধারণক্ষমতা নাকি রূপচর্চা:

পরিকল্পিত প্রকল্প বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তালিমুল মিল্লাত রহমতিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা নাজমুস সউদ জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের পুকুরটির বর্তমান অবস্থা বেশ ভালো এবং পানিও ব্যবহার উপযোগী। মাদ্রাসার নিজস্ব মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী পুকুরটি বর্তমান প্রাকৃতিক অবস্থাতেই রাখা হবে। দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পুকুর ও সংলগ্ন খেলার মাঠের পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে কেসিসিকে তাদের শর্ত সাপেক্ষে উন্নয়নকাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় অনাপত্তিপত্র (এনওসি) প্রদান করা হয়েছে।

অন্যদিকে সরকারি বিএল কলেজের শিক্ষার্থী হযরত আলী জানান, তাঁদের ক্যাম্পাসের পুকুরটি মূলত শিক্ষার্থীদের গোসল এবং স্থানীয় মসজিদের মুসল্লিদের অজুর কাজে প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত হয়। সংস্কারের পর পুকুরটির পরিবেশ পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক হবে বলে তারা আশাবাদী। তাঁর মতে, উন্নত ঘাটলা, অজু ও গোসলের জন্য নিষ্কন্টক পানির সংস্থান এবং পাড় মজবুত করা হলে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন। তবে বাহ্যিক সৌন্দর্যবর্ধনের চেয়ে পুকুরের মূল পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানোকে তিনি বেশি জরুরি মনে করেন, যাতে বর্ষাকালে বেশি পরিমাণ পানি ধরে রাখা সম্ভব হয়।

একইভাবে ট্যাংক রোড পুকুরপাড়ের বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, পুকুরের বিদ্যমান পানি স্বচ্ছ নয়। এটি দ্রুত পরিবর্তন করা প্রয়োজন, যাতে শিশুরা নিরাপদ পরিবেশে সাঁতার শিখতে পারে। খুলনায় সাঁতার প্রশিক্ষণের জন্য আলাদা সুইমিং পুল না থাকায় পুকুরগুলোকে সাঁতার শেখার উপযোগী করা গেলে স্থানীয় শিশুরা ভবিষ্যতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবদান রাখতে পারবে।

প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট আওতায় পুকুর পুনঃখনন ও পানি পরিবর্তনের পাশাপাশি আধুনিক শৌচাগার ও সৌন্দর্যবর্ধনমূলক স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও পুকুরগুলোর বর্তমান গভীরতা কত এবং সংস্কারের পর পানি ধারণক্ষমতা ঠিক কতটা বাড়বে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশের জোর দাবি উঠেছে।

সার্বিক বিষয়ে কেসিসির প্রকল্প পরিচালক আবির উল জব্বার গণমাধ্যমকে বলেন, ১৮টি নির্দিষ্ট পুকুরের জন্য সর্বমোট প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এর অধীনে খনন, পানি পরিবর্তন ও প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি করা হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে রক্ষণাবেক্ষণ কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

বিলীন ৮০ জলাশয়, ঝুঁকিতে পরিবেশ:

খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, নগরের ৩১টি ওয়ার্ডে ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানের (ডাপ) মানচিত্রে চিহ্নিত ২৯৮টি প্রাকৃতিক জলাশয়ের মধ্যে ইতোমধ্যে ৮০টির অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে এবং আরও ২৭টি জলাশয় আংশিক ভরাট হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. সালাউদ্দীন জানান, এই ১৮টি পুকুর সঠিকভাবে সংস্কার করা গেলে নগরের জলাবদ্ধতা হ্রাস ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে তা বড় ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে এটি ক্রমবর্ধমান নগরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক হবে।

তবে সৌন্দর্যবর্ধনের নামে পুকুরপাড়ে অতিরিক্ত কংক্রিট ব্যবহারের বিরুদ্ধে তীব্র সতর্কবার্তা দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ। তাঁর মতে, পাড়ে অতিরিক্ত কংক্রিট ঢাললে ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণ ও তাপমাত্রা কমানোর সুফল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। কংক্রিটের পরিবর্তে পানি চুইয়ে মাটিতে প্রবেশ করতে পারে এমন ছিদ্রযুক্ত পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা রাখা জরুরি।

প্রকল্পের প্রকৃত অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন:

কেসিসির দাবি অনুযায়ী, প্রকল্পটির লক্ষ্য কেবল রূপচর্চা নয়; বরং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার পরিকল্পনাও এতে অন্তর্ভুক্ত। ইতিপূর্বে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত কর্মশালা ও সেপ্টেম্বরের অবহিতকরণ সভাতেও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

তবে পরিবেশবিদ ও নগরবাসীর মনে মূল প্রশ্নটি রয়েই গেছে—২৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বাজেটের মধ্যে মূল পুকুর খনন ও পানি ধারণক্ষমতা বাড়াতে কত টাকা বরাদ্দ এবং কৃত্রিম অবকাঠামো বা সৌন্দর্যবর্ধনে কত টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে? ব্যয়ের খণ্ডভিত্তিক স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করা হলেই কেবল বোঝা যাবে এই প্রকল্পে জলাধার সংরক্ষণ কতটা অগ্রাধিকার পেয়েছে।