ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী মুকাল্লায় সৌদি আরবের বিমান হামলার পর দেশটির আরব জোটের দুই প্রধান মিত্র সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে প্রকাশ্য টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। এই উত্তেজনার প্রভাব ইয়েমেনের রাজনীতি, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ শাসন কাঠামোর ওপর গভীর ছাপ ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানান, মুকাল্লা বন্দরে দুটি জাহাজ ভিড়েছিল, যেগুলোতে ৮০টির বেশি যানবাহন ও বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ ছিল। তাঁর দাবি অনুযায়ী, এসব অস্ত্র দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল এবং এ বিষয়ে সৌদি আরব বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে অবহিত করা হয়নি। এই ঘটনাই হামলার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ইয়েমেন ইস্যুতে সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যে মতবিরোধ নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই বিরোধকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে। বিশেষ করে ডিসেম্বর মাসে হাদরামাউত প্রদেশে সামরিক উত্তেজনার পর পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। এই প্রদেশেই অবস্থিত মুকাল্লা বন্দর।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক উত্তেজনার ফলে ইয়েমেন সরকার কার্যত পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। দেশটির প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল এখন দুই ভাগে বিভক্ত, যেখানে এক পক্ষ সৌদি আরবের প্রতি অনুগত এবং অন্য পক্ষ আমিরাতপন্থী। এতদিন এই বিভাজন আড়ালে থাকলেও সাম্প্রতিক ঘটনায় তা প্রকাশ্যে এসেছে।
২০১৫ সালে হুতি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করার পর তাদের মোকাবিলায় সৌদি আরব ও আমিরাতের নেতৃত্বে আরব সামরিক জোট গঠিত হয়। তবে ২০১৭ সালে আমিরাত-সমর্থিত সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল গঠনের পর থেকেই দুই মিত্রের স্বার্থগত দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে। এসটিসি দক্ষিণ ইয়েমেনকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
চলতি মাসের শুরুতে এসটিসি বাহিনী হাদরামাউত ও আল-মাহরাহসহ ইয়েমেনের প্রায় সব দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এই অগ্রগতি সৌদি আরবের কাছে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়, বিশেষ করে হাদরামাউতের কৌশলগত গুরুত্ব ও সৌদি সীমান্তের নিকটবর্তী অবস্থানের কারণে।
এই প্রকাশ্য বিরোধ ইয়েমেনের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর বিভাজন সৃষ্টি করেছে। প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের আট সদস্যের মধ্যে একটি শিবিরের নেতৃত্বে রয়েছেন রাশাদ আল-আলিমি, যাদের সঙ্গে আছেন সুলতান আল-আরাদা, আবদুল্লাহ আল-আলিমি বাওয়াজির ও ওসমান হুসেইন মুজাল্লি। অপর শিবিরটি নেতৃত্ব দিচ্ছেন এসটিসি প্রধান আইদারুস আল-জুবাইদি, যেখানে রয়েছেন আবদুর রহমান আল-মাহরামি, তারিক মোহাম্মদ সালেহ ও ফারাজ সালমিন আল-বাহসানি।
মুকাল্লায় সৌদি হামলার পর আল-আলিমি আমিরাতকে ইয়েমেন থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানালে কাউন্সিলের দুই পক্ষ বিপরীতমুখী বিবৃতি দেয়। এতে স্পষ্ট হয়, দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করছে এবং ইয়েমেন কার্যত একটি প্রক্সি সংঘাতের মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই বিভাজন ইয়েমেনকে নতুন করে অভ্যন্তরীণ সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যেখানে স্বীকৃত সরকারের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যেই সংঘর্ষ শুরু হতে পারে। এর ফলে উত্তর ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের মোকাবিলার মূল লক্ষ্যও আড়ালে চলে যাচ্ছে।
দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের পর ইয়েমেন এমনিতেই ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। সাম্প্রতিক সৌদি-আমিরাত উত্তেজনা দেশটিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে এবং এর সুযোগে হুতিরা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার বাইরে প্রভাব বিস্তার করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের ঐক্য ও কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, জোটের ভেতরের এই ফাটল ইয়েমেন সংকট সমাধানের পথকে আরও জটিল করে তুলবে এবং দেশটির জন্য নতুন এক অনিশ্চিত অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
















