যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পক্ষে মাঠে নেমেছেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক। দলটির প্রার্থীদের সহায়তায় গত জুলাই থেকে ২৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বেশি অনুদান দিয়েছেন তিনি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩ হাজার ৪০৩ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার টাকার সমান। এর বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা এবং ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে। বিপুল এই অর্থের জোরে নির্বাচনি প্রচারে আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে দলটি।
মাস্কের রাজনৈতিক অনুদানের এই হিসাব আগে প্রকাশ করা হয়নি। বৃহস্পতিবারের কেন্দ্রীয় আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমার আগে তার প্রতিনিধিরা এ তথ্য একটি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন। প্রকাশ্যে জানা অনুদানের হিসাবে, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় দাতা মাস্ক।
রিপাবলিকানদের সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে এই গ্রীষ্মে তিনি সিনেট লিডারশিপ ফান্ডকে দিয়েছেন ১৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এই সুপার প্যাক সিনেটে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থনে কাজ করে। এক প্রান্তিকে একক কোনো দাতার কাছ থেকে পাওয়া অনুদানের হিসাবে এটি সংগঠনটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। একই সময়ে সংগঠনটির ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বী সব দাতার কাছ থেকে মিলিয়েও এর চেয়ে কম অর্থ সংগ্রহ করেছে।
ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে মাস্কের প্রতিষ্ঠিত আমেরিকা প্যাকও বড় কর্মসূচি নিয়েছে। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সুপার প্যাককে তিনি এ গ্রীষ্মে ৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বেশি দিয়েছেন। সংগঠনটি প্রায় পুরো অর্থ ব্যয় করেছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর কাজে। যেসব রিপাবলিকান ভোটার সাধারণত কম ভোট দেন, তাদের কেন্দ্রে আনাই এর লক্ষ্য। সিনেটের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্য এবং প্রতিনিধি পরিষদের প্রায় তিন ডজন আসনে সক্রিয় রয়েছে সংগঠনটি।
২০২৫-২৬ সালের নির্বাচনী চক্রে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বিভিন্ন কমিটিকে মাস্ক ইতোমধ্যে প্রায় ৩৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার দিয়েছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি ব্যয় করেছিলেন প্রায় ২৯ কোটি ডলার। ওই সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের আবার ক্ষমতায় আনতে সহায়তা করেছিলেন তিনি। তবে উভয় নির্বাচনেই এমন কিছু অনুদান দিয়েছেন, যেগুলোর তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
মাস্কের এই বিপুল অর্থ ব্যয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের আর্থিক সুবিধা দিচ্ছে। নির্বাচনের শেষ কয়েক সপ্তাহে ট্রাম্পের শক্তিশালী সুপার প্যাকসহ অর্থবিত্তশালী বিভিন্ন সংগঠন বিজ্ঞাপন প্রচারে বিপুল অর্থ ঢালছে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে মাস্কের কাছাকাছি পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছেন—এমন কোনো ধনকুবের নেই। রাজনৈতিক পরিবেশে কিছু সুবিধাজনক অবস্থান থাকলেও অর্থের সংকট দলটির জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে।
২০২৫ সালের মে মাসে মাস্ক বলেছিলেন, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ অনেক কমিয়ে দেবেন। কিন্তু এবার ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের সহায়তায় তিনি আবারও বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন। এতে ডানপন্থি রাজনীতিতে তার সমর্থন অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত মিলছে। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও তার সুপার প্যাক সক্রিয় থাকবে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
সিনেট লিডারশিপ ফান্ড ও আমেরিকা প্যাকের বাইরে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে মাস্ক আরও কয়েকটি রক্ষণশীল সংগঠনকে অর্থ দিয়েছেন। প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের প্রধান সুপার প্যাক কংগ্রেশনাল লিডারশিপ ফান্ডকে দিয়েছেন ২ কোটি ডলার। টেক্সাসে সিনেটের রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে সমর্থনকারী লোন স্টার লিবার্টি প্যাক পেয়েছে ১ কোটি ডলার। রিপাবলিকান গভর্নরস অ্যাসোসিয়েশন পেয়েছে ১ কোটি ডলার এবং রিপাবলিকান অ্যাটর্নি জেনারেলস অ্যাসোসিয়েশন পেয়েছে ২০ লাখ ডলার।
আমেরিকা প্যাকের মুখপাত্র অ্যান্ড্রু রোমিও বলেন, নভেম্বরে ডেমোক্র্যাটরা ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণ এবং গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ও অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ জিতে নিলে যুক্তরাষ্ট্র ‘সমাজতান্ত্রিক, ওক ও সীমান্তহীন’ দেশে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। তার দাবি, এই বিনিয়োগ রিপাবলিকানদের নির্বাচনি সংগঠনকে নিজেদের বক্তব্য ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করছে।
টেক্সাসের সিনেট নির্বাচনেও মাস্কের অর্থের বড় অংশ যাচ্ছে। ভোটারদের বাড়ির দরজায় ঝোলানো প্রচারপত্রে বলা হচ্ছে, ‘উগ্র ডেমোক্র্যাট সমাজতন্ত্রীরা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নির্বাচনে জিতছে। টেক্সাসও কি পরবর্তী লক্ষ্য?’ আমেরিকা প্যাকের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে দেশজুড়ে প্রায় ৩ হাজার বেতনভুক্ত কর্মী ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গেছেন। এ পর্যন্ত তারা প্রায় ৬৫ লাখ বাড়ির দরজায় পৌঁছেছেন বলে সংগঠনটির দাবি।
একজন প্রচারকর্মী একটি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, টেক্সাসে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে প্রতিটি দরজায় কড়া নাড়ার জন্য তাকে দেড় থেকে ৩ ডলার দেওয়া হতো। মধ্যবর্তী নির্বাচনে আমেরিকা প্যাকের ৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বেশি ব্যয়ের অধিকাংশই এই কর্মসূচিতে খরচ হয়েছে। বিজ্ঞাপন, ডাকযোগে প্রচারপত্র, ফোনকল ও খুদে বার্তায় ব্যয় তুলনামূলক কম। প্রচারের বড় অংশে ডেমোক্র্যাটদের লক্ষ্য করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে বক্তব্য বিভ্রান্তিকর বা অতিরঞ্জিত।
টেক্সাসের সিনেট প্রার্থী প্যাক্সটনের পক্ষে মাস্কের ১ কোটি ডলারের অনুদান আসে এমন সময়ে, যখন রিপাবলিকান এই প্রার্থী তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় প্রচারে অনেক কম অর্থ ব্যয় করছিলেন। মাস্কের ১৫ কোটি ৮০ লাখ ডলারের অনুদানের পর সিনেট লিডারশিপ ফান্ডও প্যাক্সটনের পক্ষে বড় অঙ্কের বিজ্ঞাপন প্রচারে নামে। আগস্টের শেষ দিকে সংগঠনটি তার পক্ষে ১৪ কোটি ৯০ লাখ ডলারের বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু করে। সংগঠনটির নেতৃত্বে রয়েছেন দক্ষিণ ডাকোটার সিনেটর ও সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা জন থুনের মিত্ররা।
মাস্কের প্রচারের আরেকটি বড় লক্ষ্য ট্রান্সজেন্ডার ইস্যু। ২০২৪ সালের মতো এবারও তার সংগঠন দোদুল্যমান ভোটারদের মন জয়ের চেয়ে রক্ষণশীল ভোটারদের নিবন্ধন ও ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে যারা সাধারণত কম ভোট দেন, তাদের লক্ষ্য করা হচ্ছে। ট্রাম্পের নাম ব্যালটে না থাকায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে এসব ভোটারকে কেন্দ্রে আনা রিপাবলিকানদের জন্য আরও কঠিন।
একটি সংবাদমাধ্যমের পর্যালোচনা অনুযায়ী, এ বছর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রার্থীদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাস্ক সরাসরি মাত্র সাতটি পোস্ট দিয়েছেন। ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে নির্বাচিত করতে তার ধারাবাহিক প্রচারের তুলনায় এটি অনেক কম। সাতটি পোস্টের মধ্যে পাঁচটিই ছিল টালারিকোকে নিয়ে। আরেকটি পোস্টে মেইনের ঝুঁকিতে থাকা রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের সমালোচনা করা হয়েছিল বলে মনে হয়েছে।
এবার মাস্কের নির্বাচনী প্রচারের সফরও নেই। ২০২৪ সালের অক্টোবরে পেনসিলভানিয়ায় এবং ২০২৫ সালের বসন্তে উইসকনসিনের একটি বিচার বিভাগীয় নির্বাচনে তিনি প্রচারে অংশ নিয়েছিলেন। নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে আবেদনপত্রে স্বাক্ষরকারীদের কাউকে কাউকে ১০ লাখ ডলারের বড় চেক দেওয়ার প্রতিযোগিতাও চালিয়েছিলেন তিনি। উদ্যোগটি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল।
এবার কোনো প্রার্থীর প্রতি মাস্কের আগের মতো ব্যক্তিগত অনুরাগও প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। এর কাছাকাছি উদাহরণ হলো, কেনটাকিতে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের এক রিপাবলিকান প্রার্থীকে তার ১ কোটি ডলারের অনুদান। তবে ওই বিনিয়োগ ভালো ফল দেয়নি।
মাস্কের ২৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারের হিসাবটি কেবল প্রকাশ্যে জানা অনুদানের পরিমাণ। এ বিষয়ে অবহিত এক ব্যক্তির তথ্য অনুযায়ী, মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রার্থীদের সহায়তায় এমন কিছু সংগঠনের মাধ্যমেও মাস্ক কয়েক দফায় ১০ লাখ ডলার বা তার বেশি অর্থ দিয়েছেন, যেসব সংগঠনকে দাতাদের নাম প্রকাশ করতে হয় না। ফলে নির্বাচনে তার মোট ব্যয়ের প্রকৃত পরিমাণ প্রকাশিত হিসাবের চেয়ে বেশি হতে পারে।


























