ঢাকার সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ঠিক সামনের দেওয়ালে অঙ্কিত বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি লেপে বিকৃত ও মুছে ফেলার এক অনভিপ্রেত ও ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর থেকেই দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা, সমালোচনা এবং প্রতিবাদের ঝড় বয়ে চলেছে। একই সুদৃশ্য দেওয়ালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বাউল সাধক ফকির লালন শাহসহ দেশের বহু বরেণ্য কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি ও গ্রাফিতি অত্যন্ত নান্দনিকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। সেই দেওয়ালচিত্রের মধ্যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি মাখানোর ন্যক্কারজনক ওই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে গভীর ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে।
গত শনিবার (১০ অক্টোবর ২০২৬) দিবসের কোনো এক সময়ে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি সংঘটিত হয়। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও চিত্রে স্পষ্ট দেখা যায় যে, মারজিয়া খন্দকার রিমি নামের এক নারী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে সচ্ছন্দে কালি লাগাচ্ছেন। এ সময় তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে কর্তব্যরত এক পুলিশ সদস্য সাহসিকতার সঙ্গে তাকে বাধা প্রদান করেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে অন্যান্য পুলিশ সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে এক নারীসহ মোট চারজনকে হাতেনাতে আটক করেন। আটককৃতদের মধ্যে রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব এ এন এম আয়াসও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। এ ছাড়া আটক অপর তিনজন হলেন মো. সাকিবুল হাসান (১৯), মো. সুজন মিয়া (১৮) এবং মারজিয়া খন্দকার রিমি (২৭)।
উক্ত ন্যাক্কারজনক ঘটনায় রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ এবং জনমনে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে শাহবাগ থানার পুলিশ বাদী হয়ে একটি বিশেষ মামলা দায়ের করে। পরবর্তীতে রোববার (১১ অক্টোবর) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান যে, আটককৃত চারজনকেই সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রবিরোধী মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, দায়েরকৃত ওই মামলায় রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ পরিচালনা, দেশের ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতিতে আঘাত হানার সুপরিকল্পিত চেষ্টা এবং জনমনে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার গুরুতর অভিযোগসমূহ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ১২০ (খ), ১৫৩ (ক) এবং ২৯৫ (ক) ধারার কঠোর বিধান প্রয়োগ করা হয়েছে।
ঘটনার দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিও ক্লিপটিতে দেখা যায় যে, অভিযুক্ত নারী মারজিয়া খন্দকার রিমি অত্যন্ত ঔদ্ধত্যের সঙ্গে দাবি করছেন যে তাঁরা মূলত তথাকথিত ‘ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ’ জানানোর অংশ হিসেবেই এই কাজ করতে এসেছেন। পুলিশের প্রকাশ্য বাধার মুখেও তাঁর সঙ্গে থাকা অন্যান্য সহযোগীরা চরম ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি লাগানোর সপক্ষে অদ্ভুত ও অগ্রহণযোগ্য যুক্তি দেখিয়ে রিমি দাবি করেন যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি একসময় বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিলেন এবং আমাদের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠারও নাকি বিরোধিতা করেছিলেন।
এদিকে এই ঘটনার দৃশ্য এবং ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। অনেকেই এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাকে দেশের দীর্ঘদিনের ইতিহাস, সমৃদ্ধ সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং সামগ্রিক ঐতিহ্যের প্রতি চরম অসম্মান ও অবমাননা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁদের দ্ব্যর্থহীন অভিমত হলো, রাজনৈতিক বা আদর্শিক ভিন্নতা থাকতেই পারে এবং যে কেউ নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিবাদ জানানোর গণতান্ত্রিক অধিকার রাখেন; কিন্তু সেই প্রতিবাদের ভাষা বা নামে দেশের বরেণ্য মনীষী, কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের স্মৃতিবিজড়িত স্মারক বা প্রতিকৃতিতে আঘাত হানা কোনোভাবেই সুস্থ মস্তিষ্কের পরিচায়ক হতে পারে না এবং তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
অনেকে আবার অত্যন্ত যৌক্তিক প্রশ্ন তুলেছেন যে, ভারত রাষ্ট্রের কোনো রাজনৈতিক অবস্থান বা বৈদেশিক নীতির প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানোর অন্তর্নিহিত যৌক্তিকতা বা উদ্দেশ্য কী হতে পারে? তাঁদের মতে, রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী সাহিত্য, গান ও সৃষ্টিশীলতা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এ দেশের মানুষের সাংস্কৃতিক ও মননশীল জীবনের সঙ্গে তা গভীরভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। কোনো রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক নীতির প্রতিবাদ করার নাম করে একজন বিশ্বমানের সাহিত্যিকের গ্রাফিতি এভাবে মুছে ফেলার বা কালি দেওয়ার হীন অপচেষ্টা সংস্কৃতির শান্ত অঙ্গনে সম্পূর্ণ নতুন ও অনভিপ্রেত বিতর্ক তৈরি করেছে।
প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশের ধরন নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক কাটাছেঁড়া ও আলোচনা চলছে। অধিকাংশ মানুষের বক্তব্য হলো, রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে নানা ধরনের ক্ষোভ বা ভিন্নমত থাকতেই পারে, কিন্তু সেই ক্ষোভ প্রকাশ কিংবা অসন্তোষ জাহির করার ক্ষেত্রে ন্যূনতম জাতীয় ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং দেশের গুণী মনীষীদের প্রতি যথাযথ সম্মান ও শালীনতা বজায় রাখা একান্ত অপরিহার্য।
রবীন্দ্রনাথের এই দেওয়ালচিত্র অবমাননার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. আব্দুন নূর তুষার। নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক তীব্র প্রতিক্রিয়ায় তিনি লিখেছেন, “দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের ছবি, সত্যজিতের ছবি, বিদ্যাসাগরের ছবি নিয়ে এই প্রলাপ ও বিলাপের কারণ এরা ভাষা সংস্কৃতিহীন রাজনীতি করে। এদের চাই বিরোধ আর বিবাদ। এদের আইকন নাই। কবি নাই। চিত্রকর নাই। চিত্র নির্মাতা নাই। এদের সবচেয়ে বড় আইকনদের উচ্চতা বেগুনবৃক্ষের চেয়েও কম। এদের জন্য সেগুনবাগিচা না, বেগুনবাগিচা দরকার।”
একইভাবে কড়া ভাষায় এই মানসিকতার সমালোচনা করে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বড় মেয়ের জামাতা এবং পরিচিত অ্যাক্টিভিস্ট ফাহাম আবদুস সালাম তাঁর ফেসবুক পেজে লিখেছেন, “কোন লেভেলের জাহিল আর জংলি হলে একজন ৮০ বছর আগে মরে যাওয়া কবির ছবিতে কালি দেওয়ার চিন্তাটা মাথায় আসতে পারে—ভাবতেছি।” এছাড়া নবীন লেখক ও গবেষক ইমতিয়াজ মাহমুদ সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ যে ভারতীয় কবি, সেই একই হিসেবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও তো ভারতীয় কবি। তিনি আরও যোগ করেন যে, নজরুলের চেয়েও অনেক বেশি সময় এই ভূখণ্ডে বসবাস করেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।
সব ছাপিয়ে এই পুরো ঘটনার মাঝে আশার আলো ও অনন্য এক মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন একজন সাধারণ রিকশাচালক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে দুর্বৃত্তদের দেওয়া সেই কুৎসিত কালি যখন চারদিকে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছিল, ঠিক তখনই এক অজ্ঞাতপরিচয় সাধারণ রিকশাচালক নিজ উদ্যোগ ও পরম শ্রদ্ধায় সেই কালি মুছে পরিষ্কার করে দিয়ে দেশবাসীর মন জয় করে নেন। খেটে খাওয়া এই সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা ও ভালোবাসা সাধারণ মানুষের মনে দারুণ দাগ কেটেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই রিকশাচালকের কাজের স্থিরচিত্র ছড়িয়ে পড়ার পর সর্বস্তরের মানুষ তাঁকে সশ্রদ্ধ সালাম ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)-এর উদ্যোগে সেগুনবাগিচা এলাকার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনের ব্যস্ত সড়কটির ফুটপাত হকারদের অবৈধ দখলমুক্ত করে পথচারীদের চলাচলের উপযোগী ও আধুনিক সৌন্দর্যমণ্ডিত করার বিশেষ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ফুটপাত দখলমুক্ত করার পর গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ডিএসসিসির পক্ষ থেকে ফুটপাত সংস্কার এবং পুরো এলাকার সৌন্দর্যবর্ধনের ব্যাপক কাজ শুরু হয়। পথচারীদের স্বস্তি দেওয়ার পাশাপাশি এলাকাটিকে নান্দনিক করে তুলতে দেয়ালের গায়ে ফুটিয়ে তোলা হয় দেশের বরেণ্য গুণীজনদের গ্রাফিতি। গত ৫ অক্টোবর ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই দৃষ্টিিনন্দন দেওয়ালচিত্রগুলোর শুভ উদ্বোধন করেন। নগরীর সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলা এবং চলচ্চিত্রের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বরেণ্য ব্যক্তিদের নতুন প্রজন্মের সামনে পরিচিত ও সম্মানিত করার একটি মহৎ উদ্যোগ হিসেবেই এই দেওয়ালচিত্রগুলোকে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন নগরবাসী।


























