বাংলাদেশের সোনালি আঁশ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত পাটের ঐতিহ্য সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিগত ভুলের কারণে একসময় অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। বর্তমানে দেশের পাট উৎপাদনের মূল চাবিকাঠি যে বীজ, তার প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। মোট চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশ বীজই আমদানি করতে হয় প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে, যার ফলে দেশের পাট বীজের বাজারে প্রায়শই একধরনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা লেগেই থাকে। এই ধরনের পরনির্ভরশীলতা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে এখন উন্নতমানের দেশীয় পাট বীজ উৎপাদন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিজস্ব প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন বৃদ্ধি, ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশবান্ধব আধুনিক কৃষি সম্প্রসারণেও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
কৃষি খাত সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর পাট বীজের মোট চাহিদা প্রায় ৬ হাজার ৪০০ টন। এর মধ্যে ৫ হাজার ২০০ টন বীজই আনা হয় ভারত থেকে। বাকি মাত্র ১ হাজার ৩০০ টন বীজ সরবরাহ করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) এবং স্থানীয় কৃষকরা। এই বিপুল পরিমাণ চাহিদার সিংহভাগ মেটাতে প্রতিবেশী দেশের বীজের ওপর নির্ভর করতে হওয়ায় বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সার্কের আওতায় আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জলবায়ুর সঙ্গে উপযোগী উন্নতমানের হাইব্রিড বীজ উৎপাদনের প্রযুক্তি ও সক্ষমতা একে অপরের সঙ্গে বিনিময় করা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এর মাধ্যমে পাট ও পেঁয়াজ বীজের মতো গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে একটি টেকসই ও আত্মনির্ভরশীল কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলাই মূল লক্ষ্য। ভারত থেকে বীজ আমদানিতে কোনো ধরনের সরবরাহজনিত জটিলতা দেখা দিলে দেশীয় বাজারে যাতে কোনো কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয়, সে বিষয়ে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন কর্মসূচির পাশাপাশি দেশেই উন্নতমানের পাট বীজ উৎপাদনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ আবদুর রহিম জানান, কৃষিপণ্যের যেকোনো ধরনের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশকে সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলাটাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। তার দাবি, বর্তমানে দেশের ভেতরেই ভারতের চেয়েও উন্নতমানের পাট ও গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ বীজ উৎপাদিত হচ্ছে এবং অদূর ভবিষ্যতে এসব বীজের ক্ষেত্রে বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভরতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। এছাড়া কৃত্রিম সংকট রোধ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমানো এবং মাটির হারানো উর্বরতা ফিরিয়ে আনার বিষয়েও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।


























