মালয়েশিয়ার স্থানীয় শ্রমিকদের পাশাপাশি বাংলাদেশি সহ সকল বিদেশি শ্রমিকের মাসিক সর্বনিম্ন মূল মজুরি বর্তমান ১,৭০০ রিঙ্গিত থেকে বাড়িয়ে ২,০০০ রিঙ্গিত করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে দেশটির সরকার।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জাতীয় সংসদে দেশটির ২০২৭ সালের জাতীয় বাজেট পেশ করার সময় আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন সর্বনিম্ন মজুরি কাঠামোর ঘোষণা দেন। ঘোষিত নতুন এই বেতন কাঠামো ২০২৭ সালের জুন মাস থেকে সারাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে। মালয়েশিয়ার সরকারপ্রধান আশাবাদ ব্যক্ত করে জানান, নতুন এই নির্ধারিত মজুরি কার্যকর হলে দেশটিতে কর্মরত ৪০ লাখেরও বেশি স্থানীয় ও অভিবাসী শ্রমিক প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবেন।
মালয়েশিয়ার শ্রম আইন অনুযায়ী, দেশের সর্বজনীন ন্যূনতম মজুরির এই নিয়ম স্থানীয় নাগরিকদের পাশাপাশি দেশটিতে কর্মরত বিদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। ফলে বাংলাদেশ, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া সহ অন্যান্য বিভিন্ন দেশের অভিবাসী কর্মীরা মালয়েশিয়ার স্থানীয় শ্রমিকদের মতোই আইনগতভাবে সমান ন্যূনতম মূল মজুরি পাওয়ার পূর্ণ অধিকারী হবেন।
উল্লেখ্য, মালয়েশিয়া সরকার প্রথম ২০১৩ সালে দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নীতি চালু করে, যেখানে তৎকালীন সময়ে সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯০০ রিঙ্গিত। পরবর্তীতে সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০১৬ সালে তা বাড়িয়ে ১,০০০ রিঙ্গিত, ২০১৯ সালে ১,১০০ রিঙ্গিত, ২০২০ সালে ১,২০০ রিঙ্গিত, ২০২২ সালে ১,৫০০ রিঙ্গিত এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালে ১,৭০০ রিঙ্গিত করা হয়। ২০২৭ সালের জুনে কার্যকর হতে যাওয়া ২,০০০ রিঙ্গিতের এই সর্বশেষ বৃদ্ধির ফলে দেশটির ন্যূনতম মজুরি সূচনা হারের দ্বিগুণেরও বেশিতে উন্নীত হতে যাচ্ছে।
বাজেট বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম আরও ঘোষণা করেন যে, যেসব ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি আকারের শিল্পোদ্যোগের (এমএসএমই) বার্ষিক লেনদেন বা টার্নওভার ৫০ মিলিয়ন রিঙ্গিতের কম, সেসব প্রতিষ্ঠানকে সাময়িকভাবে নতুন এই বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। মূলত ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের বিদ্যমান ব্যবসায়িক মডেল নতুন মজুরি কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই বিশেষ সুযোগ রাখা হয়েছে।
শ্রমিকদের সার্বিক জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন প্রসঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন, “উৎপাদনশীলতা ও মজুরির মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য আমাদের যেকোনো মূল্যে কমিয়ে আনতে হবে। বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির সঙ্গে আয়ের প্রবৃদ্ধি তাল মেলাতে না পারায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ভার বহুগুণ বেড়েছে।” দেশের সার্বিক মজুরি কাঠামো আধুনিক ও উন্নত করার বৈপ্লবিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে সরকার পরবর্তীতে আধা-দক্ষ কর্মী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ স্নাতকদের জন্য ন্যূনতম মাসিক বেতন ২,৫০০ রিঙ্গিত নির্ধারণ করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করছে বলেও জানান তিনি।
আনোয়ার ইব্রাহিম স্পষ্ট করেন যে, সরকারের নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি মূলত শ্রমিকদের আয়ের একেবারে নিম্নসীমা বা ভিত্তি নির্ধারণ করে দেয়। তবে দক্ষ শ্রমিকদের তাদের নিজস্ব যোগ্যতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অনুযায়ী উচ্চতর পারিশ্রমিক দিতে হবে। একই সঙ্গে দেশে অনিবন্ধিত ও অবৈধ বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে কর বিধিমালা আরও কঠোর করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
প্রস্তাবিত নতুন প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী, ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যান্য সব সংস্থাকে তাদের মজুরি ব্যয়ের ওপর কর ছাড়ের (Tax Exemption) আইনি সুবিধা পেতে হলে অবশ্যই কর্মসংস্থান আইনে অনুমোদিত বাণিজ্যিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে কর্মীদের বেতন পরিশোধ করতে হবে।
মালয়েশিয়ায় বর্তমানে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি ও নেপালি প্রবাসী শ্রমিক বিভিন্ন খাতে কর্মরত রয়েছেন। মালয়েশিয়া সরকারের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশিসহ সব বিদেশি প্রবাসীর আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে ২০২৭ সালের জুন থেকে কার্যকর হওয়ার সময়সীমা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার ক্ষেত্রে দেওয়া সাময়িক অব্যাহতির কারণে সব শ্রমিক প্রথম দিন থেকেই তাৎক্ষণিকভাবে এই সুবিধার আওতায় আসবেন না।


























