ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) থেকে অস্তিত্বহীন কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ২৫ কোটি টাকা ঋণ উত্তোলন ও বিদেশে পাচারের চাঞ্চল্যকর মামলায় সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তাঁর স্ত্রী রুখমিলা জামানসহ ৩৬ আসামির বিরুদ্ধে আরও দুইজন আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ মিজানুর রহমানের এজলাসে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) তাঁদের সাক্ষ্য গ্রহণ ও আসামিপক্ষের জেরা পর্ব শেষ হয়।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মোকাররম হোসাইন নিশ্চিত করেছেন যে, আলোচিত এই মামলায় এ পর্যন্ত সর্বমোট ৪৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। চলতি বছরের ৪ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই বিচারিক প্রক্রিয়ায় পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আগামী ২১ সেপ্টেম্বর দিন নির্ধারণ করেছেন আদালত।
দুদকের দাখিলকৃত অভিযোগপত্রের বিস্তারিত বিবরণ অনুযায়ী, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘আরামইট গ্রুপ’-এর প্রটোকল কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফরমান উল্লাহ চৌধুরীকে কাগজে-কলমে স্বত্বাধিকারী সাজিয়ে ‘ভিশন ট্রেডিং’ নামের একটি ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো হয়। পরবর্তীকালে ভুয়া ও জাল কাগজপত্র তৈরি করে ইউসিবির পোর্ট শাখা থেকে ২৫ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করানো হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই ঋণটি চূড়ান্ত অনুমোদনের পূর্বে ব্যাংকের ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বা ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে ১৭টি তীব্র নেতিবাচক পর্যবেক্ষণ ও আপত্তি উত্থাপন করা হয়েছিল। তবে তৎকালীন ব্যাংক চেয়ারম্যান রুখমিলা জামানের প্রভাব এবং তাঁর স্বামী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে সেই প্রশাসনিক আপত্তি উপেক্ষা করেই ঋণটি পাস করা হয়। তদন্তে সাইফুজ্জামান চৌধুরীকে ব্যাংকের ‘ডি-ফ্যাক্টো’ বা প্রকৃত নিয়ন্ত্রক চেয়ারম্যান হিসেবে অভিহিত করেছে দুদক; অর্থাৎ স্ত্রী নামকাওয়াস্তে পদে থাকলেও ব্যাংক পরিচালনায় মূল কর্তৃত্ব ছিল জাবেদের হাতেই।
অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, ভিশন ট্রেডিংয়ের নামে নেওয়া ২৫ কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ১৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা সাইফুজ্জামান চৌধুরীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্য দুটি প্রতিষ্ঠান—’আরামইট সিমেন্ট’ ও ‘আরামইট থাই অ্যালুমিনিয়াম’-এর পুরোনো দেনা মেটাতে সরিয়ে নেওয়া হয়। অবশিষ্ট প্রায় ৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা নগদ আকারে উত্তোলন করে হুন্ডি ও হাওলা ব্যবস্থার মাধ্যমে দুবাইসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেআইনিভাবে পাচার করা হয় বলে দুদকের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।
এ মামলার তদন্ত চলাকালীন রুখমিলা জামানের গাড়িচালকের এক প্রতিবেশীর বসতবাড়ি থেকে ২৩ বস্তা ভর্তি অত্যন্ত স্পর্শকাতর নথি ও বিভিন্ন আলামত বাজেয়াপ্ত করে দুদক। উদ্ধারকৃত এসব কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে বিদেশে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিপুল পরিমাণের অবৈধ সম্পদের সন্ধান পাওয়া যায়। ওই নথিপত্রে বিদেশে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা মূল্যের ১ হাজার ১০০টিরও বেশি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও আবাসন খাতের সম্পদ ক্রয়ের তথ্য মেলে।
ঋণ জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী রুখমিলা জামানসহ মোট ৩৬ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছে দুদক। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর আদালত এই দম্পতির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন, তবে দুদকের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার পূর্বেই তাঁরা গোপনে দেশ ছেড়ে বিদেশে পালিয়ে যান।


























