Dhaka ০৪:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

কিশোর গ্যাং ও অপরাধ চক্রের জালে জড়িয়ে পড়ছে দেশের এক শ্রেণির কিশোর

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ১০:০১:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৩৮ বার দেখা হয়েছে

বয়ঃসন্ধিকালে পড়াশোনা বা খেলাধুলায় মনোযোগী হওয়ার কথা থাকলেও একটা অংশের কিশোরদের হাতে উঠছে অস্ত্র বা তারা জড়িয়ে পড়ছে ছিনতাইয়ের মতো গুরুতর অপরাধে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিউ বা জনপ্রিয়তা পাওয়ার প্রতিযোগিতা, স্থানীয় বড় ভাইদের অন্ধ অনুকরণ, মাদকের নেশা, আড্ডাবাজি এবং এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে কিশোর সমাজ অপরাধের অন্ধকার জালে পা বাড়াচ্ছে। এর খেসারত হিসেবে কেউ হারাচ্ছে নিজের জীবন, আবার কেউ জড়িয়ে পড়ছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে। এই ভয়ংকর পরিস্থিতির একটি বেদনাদায়ক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে কুমিল্লার ১৩ বছরের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে মায়ের হাতে থাকা আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়ে সে আর ফিরে আসেনি। দীর্ঘ ২১ ঘণ্টা পর লালমাই পাহাড়ের এক নির্জন বনভূমি থেকে তার নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ইতিমধ্যে তিনজনকে আটক করা হয়েছে, যার মধ্যে একজনের বয়স মোটে ১৫ বছর। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার সময় অপ্রতিম প্রতিবাদ করায় তার ওপর চড়াও হয় দুর্বৃত্তরা এবং পরবর্তীতে তাকে খুন করে মরদেহ গুম করে। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা এবং তাদের অরক্ষিত জীবনযাত্রার ঝুঁকিকে প্রকটভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে ঘটে চলা আরও কিছু বিচ্ছিন্ন নয় বরং উদ্বেগজনক ঘটনা এই চিত্রকে আরও বেশি স্পষ্ট করে তোলে। সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জের ধরে এক সংবাদকর্মীর বাড়িতে গুলিবর্ষণ ও হামলার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে একজনকে পাকড়াও করা হয়েছে। এছাড়া কেরানীগঞ্জে মো. ফরহাদ হোসেন নামের এক যুবককে নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার ঘটনায় পুলিশ জানায়, নিহত ব্যক্তি মোহাম্মদপুর ও রায়েরবাজার এলাকার ‘পাটালী গ্যাং’ নামের একটি কিশোর চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গত ১৮ সেপ্টেম্বর যশোরে নারীদের উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় এক কিশোরীর মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করার গুরুতর অভিযোগ ওঠে বখাটেদের বিরুদ্ধে। এর আগে জুলাই মাসে রাজশাহীতে এক রিকশাচালককে বেধড়ক পিটিয়ে অর্থ ছিনতাইয়ের দায়ে ছয়জন কিশোর অপরাধীকে আটক করে পুলিশ। শুধু তাই নয়, নওগাঁয় কিশোর চক্রে নাম লেখাতে অস্বীকৃতি জানানোয় এক যুবককে বন্দুকের মুখে ভয় দেখানোর অভিযোগে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। এ ধরনের একের পর এক অপরাধমূলক ঘটনা সচেতন অভিভাবকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে এবং সন্তানদের চলাফেরা ও বন্ধু নির্বাচন নিয়ে তাদের চরম উৎকণ্ঠায় রাখছে।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী এ প্রসঙ্গে মনে করেন যে, সমবয়সীদের সঙ্গে খোশগল্প বা খেলাধুলা স্বাভাবিক শৈশব-কৈশোরের অঙ্গ হলেও যখন সেই সম্পর্ক এলাকার একক নিয়ন্ত্রণ, প্রভাব বিস্তার, অস্ত্র বহন বা কোনো গ্যাং কালচারের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তখনই তা কিশোরদের অপরাধের পথে চালিত করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযান থেকেও ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও সহিংসতার সঙ্গে কিশোর চক্রের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাব এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ভিডিও ধারণ করে টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়া আজকাল একশ্রেণির কিশোরের কাছে ক্ষমতার প্রদর্শন বা হিরোইজম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, স্মার্টফোনের ব্যবহার নিজে থেকে ক্ষতিকর না হলেও অভিভাবকরা যখন জানেন না তাদের সন্তান অনলাইনে কার সঙ্গে মিশছে বা কী দেখছে, তখনই বিপত্তি ঘটে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতারণা চক্রে জড়িয়ে পড়া, হেনস্তা করা কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মতো জঘন্য অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে আধুনিক প্রজন্মের কমবয়সিরা।

কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিশুদের শুধু কাঠগড়ায় দাঁড় না করিয়ে বরং তাদের অভিভাবকদের মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার ওপর জোর দিয়েছেন শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি গণমাধ্যমকে জানান যে, অপরাধে জড়িয়ে পড়া এই কিশোরদের প্রায় সবাই মূলত উঠতি মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান, খেটে খাওয়া দিনমজুর বা কৃষকদের সন্তান তারা নয়। সমাজের এই নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মা-বাবাদের কেবল সচেতন করলে চলবে না, তাদের নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনা জরুরি। এ বিষয়ে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডিজিটাল যুগে সন্তান যেন প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করতে শেখে এবং প্রযুক্তি নিজেই যেন সন্তানকে গ্রাস না করে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের সজাগ থাকতে হবে। এছাড়া শিশুরা অনেক সময় অপরাধের শিকার বা ভিকটিম হওয়ার পরেও একপেশেভাবে কেবল তাদেরই দোষারোপ করা হয়। মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়ানো বা অন্য কোনো অজুহাত দেখিয়ে অপরাধের ন্যায্যতা দেওয়া যায় না; বরং এই পরিস্থিতির জন্য অভিভাবকদের দায়িত্বশীল করে তুলতে হবে এবং তাদের নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে হবে।

অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বলেন, পড়লেখার খতিয়ান বা পরীক্ষার ফলাফলের বাইরেও শিক্ষার্থীর আচার-আচরণে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসছে কি না, সে অতিরিক্ত সময় কার সঙ্গে কাটাচ্ছে কিংবা স্কুল আঙিনায় কোনো সংঘাতমূলক আচরণে জড়িয়ে পড়ছে কি না, সেদিকে শিক্ষকদেরও সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। অপ্রতিমের মতো মেধাবী বা সাধারণ শিক্ষার্থীরা সহপাঠীদের মাঝে বেঁচে থাকে তাদের স্মৃতি হয়ে, যারা আর কখনো ক্লাসরুমে ফিরবে না। স্কুলগুলোতে সাংস্কৃতিক চর্চা, খেলাধুলা ও নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সময় চলে যাচ্ছে ভার্চুয়াল জগত ও বিপদগামী আড্ডায়। তাই কেবল আইনি ব্যবস্থা বা শাস্তি নয়, বিপথগামী বা ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের চিহ্নিত করে তাদের সঠিক ধারায় ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অভিভাবকদের দায়দায়িত্বের বিষয়ে তিনি বলেন, সন্তানের হাতে আধুনিক স্মার্টফোন বা পর্যাপ্ত হাতখরচ তুলে দিলেই মা-বাবার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে কিংবা তার মতিগতি বদলে যাচ্ছে কি না, সে ব্যাপারে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা অত্যন্ত জরুরি। তবে এই নজরদারির মানে এই নয় যে কেবল কড়াকড়ি করতে হবে বা জোর করে ফোন কেড়ে নিতে হবে; বরং ঘরের ভেতর এমন একটি বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে সন্তান কোনো সমস্যায় পড়লে বিনা দ্বিধায় তা মা-বাবার কাছে খুলে বলতে পারে, কারণ অপরাধে জড়ানোর আগেই সাধারণত তাদের আচরণে নানা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

তিনি আরও যোগ করেন যে, মা-বাবার পাশাপাশি শিক্ষকদের সঙ্গেও শিক্ষার্থীদের একটি সুসম্পর্ক বজায় থাকা প্রয়োজন। শিশুর নৈতিক বিকাশ, চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উভয়েরই সমান অংশীদারিত্ব রয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সাময়িক পুলিশি অভিযান চালিয়ে এই দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা অসম্ভব বলে মনে করেন শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, কোনো কিশোর কেন বিপথগামী হচ্ছে, নেপথ্যে কারা তাদের ব্যবহার করছে কিংবা অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের উৎস কোথায়—সেগুলো উৎঘাটন করা আবশ্যক। এ প্রসঙ্গে শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক মনে করেন, কেবল কিশোরদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে তাদের নেপথ্যের মদদদাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের কঠোর আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি সুস্থ বিনোদন, খেলাধুলার সুযোগ বৃদ্ধি এবং পারিবারিক ও সামাজিক অনুশাসন নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। কিশোর বয়স হলো মানবজীবনের ভিত্তি নির্মাণের মোক্ষম সময়, আর এই বয়সে তাদের হাতে বই ও খেলাধুলার উপকরণের বদলে অপরাধের হাতছানি যেন না পৌঁছায়, সে বিষয়ে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

জনপ্রিয়

মোংলা বন্দরে দুটি আধুনিক কন্টেইনার জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী

কিশোর গ্যাং ও অপরাধ চক্রের জালে জড়িয়ে পড়ছে দেশের এক শ্রেণির কিশোর

সর্বশেষ হালনাগাদ : ১০:০১:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বয়ঃসন্ধিকালে পড়াশোনা বা খেলাধুলায় মনোযোগী হওয়ার কথা থাকলেও একটা অংশের কিশোরদের হাতে উঠছে অস্ত্র বা তারা জড়িয়ে পড়ছে ছিনতাইয়ের মতো গুরুতর অপরাধে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিউ বা জনপ্রিয়তা পাওয়ার প্রতিযোগিতা, স্থানীয় বড় ভাইদের অন্ধ অনুকরণ, মাদকের নেশা, আড্ডাবাজি এবং এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে কিশোর সমাজ অপরাধের অন্ধকার জালে পা বাড়াচ্ছে। এর খেসারত হিসেবে কেউ হারাচ্ছে নিজের জীবন, আবার কেউ জড়িয়ে পড়ছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে। এই ভয়ংকর পরিস্থিতির একটি বেদনাদায়ক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে কুমিল্লার ১৩ বছরের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে মায়ের হাতে থাকা আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়ে সে আর ফিরে আসেনি। দীর্ঘ ২১ ঘণ্টা পর লালমাই পাহাড়ের এক নির্জন বনভূমি থেকে তার নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ইতিমধ্যে তিনজনকে আটক করা হয়েছে, যার মধ্যে একজনের বয়স মোটে ১৫ বছর। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার সময় অপ্রতিম প্রতিবাদ করায় তার ওপর চড়াও হয় দুর্বৃত্তরা এবং পরবর্তীতে তাকে খুন করে মরদেহ গুম করে। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা এবং তাদের অরক্ষিত জীবনযাত্রার ঝুঁকিকে প্রকটভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে ঘটে চলা আরও কিছু বিচ্ছিন্ন নয় বরং উদ্বেগজনক ঘটনা এই চিত্রকে আরও বেশি স্পষ্ট করে তোলে। সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জের ধরে এক সংবাদকর্মীর বাড়িতে গুলিবর্ষণ ও হামলার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে একজনকে পাকড়াও করা হয়েছে। এছাড়া কেরানীগঞ্জে মো. ফরহাদ হোসেন নামের এক যুবককে নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার ঘটনায় পুলিশ জানায়, নিহত ব্যক্তি মোহাম্মদপুর ও রায়েরবাজার এলাকার ‘পাটালী গ্যাং’ নামের একটি কিশোর চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গত ১৮ সেপ্টেম্বর যশোরে নারীদের উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় এক কিশোরীর মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করার গুরুতর অভিযোগ ওঠে বখাটেদের বিরুদ্ধে। এর আগে জুলাই মাসে রাজশাহীতে এক রিকশাচালককে বেধড়ক পিটিয়ে অর্থ ছিনতাইয়ের দায়ে ছয়জন কিশোর অপরাধীকে আটক করে পুলিশ। শুধু তাই নয়, নওগাঁয় কিশোর চক্রে নাম লেখাতে অস্বীকৃতি জানানোয় এক যুবককে বন্দুকের মুখে ভয় দেখানোর অভিযোগে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। এ ধরনের একের পর এক অপরাধমূলক ঘটনা সচেতন অভিভাবকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে এবং সন্তানদের চলাফেরা ও বন্ধু নির্বাচন নিয়ে তাদের চরম উৎকণ্ঠায় রাখছে।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী এ প্রসঙ্গে মনে করেন যে, সমবয়সীদের সঙ্গে খোশগল্প বা খেলাধুলা স্বাভাবিক শৈশব-কৈশোরের অঙ্গ হলেও যখন সেই সম্পর্ক এলাকার একক নিয়ন্ত্রণ, প্রভাব বিস্তার, অস্ত্র বহন বা কোনো গ্যাং কালচারের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তখনই তা কিশোরদের অপরাধের পথে চালিত করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযান থেকেও ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও সহিংসতার সঙ্গে কিশোর চক্রের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাব এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ভিডিও ধারণ করে টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়া আজকাল একশ্রেণির কিশোরের কাছে ক্ষমতার প্রদর্শন বা হিরোইজম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, স্মার্টফোনের ব্যবহার নিজে থেকে ক্ষতিকর না হলেও অভিভাবকরা যখন জানেন না তাদের সন্তান অনলাইনে কার সঙ্গে মিশছে বা কী দেখছে, তখনই বিপত্তি ঘটে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতারণা চক্রে জড়িয়ে পড়া, হেনস্তা করা কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মতো জঘন্য অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে আধুনিক প্রজন্মের কমবয়সিরা।

কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিশুদের শুধু কাঠগড়ায় দাঁড় না করিয়ে বরং তাদের অভিভাবকদের মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার ওপর জোর দিয়েছেন শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি গণমাধ্যমকে জানান যে, অপরাধে জড়িয়ে পড়া এই কিশোরদের প্রায় সবাই মূলত উঠতি মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান, খেটে খাওয়া দিনমজুর বা কৃষকদের সন্তান তারা নয়। সমাজের এই নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মা-বাবাদের কেবল সচেতন করলে চলবে না, তাদের নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনা জরুরি। এ বিষয়ে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডিজিটাল যুগে সন্তান যেন প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করতে শেখে এবং প্রযুক্তি নিজেই যেন সন্তানকে গ্রাস না করে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের সজাগ থাকতে হবে। এছাড়া শিশুরা অনেক সময় অপরাধের শিকার বা ভিকটিম হওয়ার পরেও একপেশেভাবে কেবল তাদেরই দোষারোপ করা হয়। মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়ানো বা অন্য কোনো অজুহাত দেখিয়ে অপরাধের ন্যায্যতা দেওয়া যায় না; বরং এই পরিস্থিতির জন্য অভিভাবকদের দায়িত্বশীল করে তুলতে হবে এবং তাদের নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে হবে।

অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বলেন, পড়লেখার খতিয়ান বা পরীক্ষার ফলাফলের বাইরেও শিক্ষার্থীর আচার-আচরণে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসছে কি না, সে অতিরিক্ত সময় কার সঙ্গে কাটাচ্ছে কিংবা স্কুল আঙিনায় কোনো সংঘাতমূলক আচরণে জড়িয়ে পড়ছে কি না, সেদিকে শিক্ষকদেরও সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। অপ্রতিমের মতো মেধাবী বা সাধারণ শিক্ষার্থীরা সহপাঠীদের মাঝে বেঁচে থাকে তাদের স্মৃতি হয়ে, যারা আর কখনো ক্লাসরুমে ফিরবে না। স্কুলগুলোতে সাংস্কৃতিক চর্চা, খেলাধুলা ও নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সময় চলে যাচ্ছে ভার্চুয়াল জগত ও বিপদগামী আড্ডায়। তাই কেবল আইনি ব্যবস্থা বা শাস্তি নয়, বিপথগামী বা ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের চিহ্নিত করে তাদের সঠিক ধারায় ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অভিভাবকদের দায়দায়িত্বের বিষয়ে তিনি বলেন, সন্তানের হাতে আধুনিক স্মার্টফোন বা পর্যাপ্ত হাতখরচ তুলে দিলেই মা-বাবার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে কিংবা তার মতিগতি বদলে যাচ্ছে কি না, সে ব্যাপারে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা অত্যন্ত জরুরি। তবে এই নজরদারির মানে এই নয় যে কেবল কড়াকড়ি করতে হবে বা জোর করে ফোন কেড়ে নিতে হবে; বরং ঘরের ভেতর এমন একটি বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে সন্তান কোনো সমস্যায় পড়লে বিনা দ্বিধায় তা মা-বাবার কাছে খুলে বলতে পারে, কারণ অপরাধে জড়ানোর আগেই সাধারণত তাদের আচরণে নানা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

তিনি আরও যোগ করেন যে, মা-বাবার পাশাপাশি শিক্ষকদের সঙ্গেও শিক্ষার্থীদের একটি সুসম্পর্ক বজায় থাকা প্রয়োজন। শিশুর নৈতিক বিকাশ, চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উভয়েরই সমান অংশীদারিত্ব রয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সাময়িক পুলিশি অভিযান চালিয়ে এই দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা অসম্ভব বলে মনে করেন শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, কোনো কিশোর কেন বিপথগামী হচ্ছে, নেপথ্যে কারা তাদের ব্যবহার করছে কিংবা অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের উৎস কোথায়—সেগুলো উৎঘাটন করা আবশ্যক। এ প্রসঙ্গে শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক মনে করেন, কেবল কিশোরদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে তাদের নেপথ্যের মদদদাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের কঠোর আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি সুস্থ বিনোদন, খেলাধুলার সুযোগ বৃদ্ধি এবং পারিবারিক ও সামাজিক অনুশাসন নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। কিশোর বয়স হলো মানবজীবনের ভিত্তি নির্মাণের মোক্ষম সময়, আর এই বয়সে তাদের হাতে বই ও খেলাধুলার উপকরণের বদলে অপরাধের হাতছানি যেন না পৌঁছায়, সে বিষয়ে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।