গত টানা দুই ম্যাচে জালের দেখা না পাওয়ার হতাশা এবং পুরো ম্যাচ জুড়ে হারের শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে খাদের কিনারা থেকে ঠিকই দলকে টেনে তুললেন ফুটবলের জাদুকর লিওনেল মেসি। ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গোলের দেখা না পেয়ে ইন্টার মায়ামি যখন চরম উৎকণ্ঠায় ধুঁকছিল, ঠিক তখনই দুর্দান্ত এক ফিনিশিং ও অনবদ্য অ্যাসিস্টে ম্যাচের ভাগ্য পুরোপুরি বদলে দিলেন আর্জেন্টাইন সুপারস্টার। এই অবিস্মরণীয় জয়ের সুবাদে ২০২৭ সালের মর্যাদাপূর্ণ কনক্যাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপে নিজেদের অংশগ্রহণ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে ফেলল ডেভিড বেকহ্যামের ইন্টার মায়ামি।
মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) ইস্টার্ন কনফারেন্সের পয়েন্ট টেবিলে দ্বিতীয় স্থান অর্জনের অত্যন্ত মহাগুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদার লড়াইয়ে নিউ ইংল্যান্ড রেভোলুশনকে ২-১ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করেছে ইন্টার মায়ামি।
মায়ামির করা দুটি গোলের দুটির সঙ্গেই সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন দলীয় অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ম্যাচের প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়ার পর অধিনায়কের নিপুণ হেডের পাস থেকেই বল পেয়ে হেড করে দলকে সমতায় ফেরান সতীর্থ ফরোয়ার্ড হার্মান বের্তেরামে।
চলতি মেজর লিগ সকারে গোলের তালিকায় আগে থেকেই সবার শীর্ষে অবস্থান করা মেসির নামের পাশে এখন মোট ২৬টি গোল জমা হয়েছে। পাশাপাশি অ্যাসিস্টের তালিকায় ১৬টি পাস নিয়ে তিনি যৌথভাবে বা কাছাকাছি অবস্থানে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। চলতি লিগে টানা তৃতীয়বারের মতো ‘মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার’ (এমভিপি) বা সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জয় করাটা এখন এই বিশ্বজয়ী তারকার জন্য কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
উল্লেখ্য, মেসি গোল না পাওয়া আগের দুটি ম্যাচে জয়বঞ্চিত ছিল ইন্টার মায়ামি। তবে এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে নাটকীয় জয়ের ফলে ৩৩ ম্যাচে মোট ৫৯ পয়েন্ট অর্জন করে তারা টেবিলের দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। অন্যদিকে, ৫৮ পয়েন্ট নিয়ে তিনে নেমে গেছে নিউ ইংল্যান্ড রেভোলুশন। মেজর লিগের নিয়মিত মৌসুমের আর মাত্র একটি ম্যাচ বাকি রয়েছে। প্লে-অফের লড়াইয়ে পয়েন্ট টেবিলের এই শীর্ষ অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করায় এই জয়টি মায়ামির জন্য ছিল অত্যন্ত জরুরি।
প্রতিপক্ষ নিউ ইংল্যান্ডের মাঠে ম্যাচের শুরু থেকেই প্রথমার্ধে দারুণ দাপট দেখিয়েছিল স্বাগতিক দল। প্রথমার্ধে তারা গোলমুখে মোট ছয়টি শট নেওয়ার পাশাপাশি পাঁচটি কর্নার আদায় করে নেয়। তবে মায়ামির রক্ষণভাগের দৃঢ়তায় প্রথমার্ধে কোনো দলই জালের দেখা পায়নি।
খেলার দ্বিতীয়ার্ধের ৫৩তম মিনিটে ড্যানিয়েল গাজডাগের চমৎকার এক গোলে এগিয়ে যায় নিউ ইংল্যান্ড। এরপর ৬৪তম মিনিটে সমতা ফেরানোর দারুণ সুযোগ হাতছাড়া করে মায়ামি। বক্সের ভেতর প্রতিপক্ষের দুই ডিফেন্ডারকে ড্রিবলিংয়ে কাটিয়ে বাঁ পায়ের জোরালো শট নেন মেসি। যদিও নিউ ইংল্যান্ডের গোলকিপার ম্যাট টার্নার অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেই শট ফিরিয়ে দেন, তবুও বলের কাছাকাছিই ছিলেন হার্মান বের্তেরামে। তবে তার শট গোললাইন থেকে ক্লিয়ার করে দেন নিউ ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার ব্রুকলিন রেইন্স।
অবশেষে কাঙ্ক্ষিত সেই গোলের দেখা মেলে চার মিনিট বাদেই। বক্সের বেশ বাইরে থেকে চমৎকার চিপ শট নেন তেলাস্কো সেগোভিয়া। গোলমুখের জটলার মধ্যে লাফিয়ে হেড করে বল ঠিক পেছনেই থাকা বের্তেরামের দিকে বাড়িয়ে দেন মেসি। আর্জেন্টাইন বংশোদ্ভূত মেক্সিকান ফরোয়ার্ড বের্তেরামে দারুণ এক হেডে বল জালে জড়িয়ে দেন।
ম্যাচের ৮০তম মিনিটে বের্তেরামের নেওয়া আরেকটি চমৎকার হেড অল্পের জন্য গোলবারের ওপর দিয়ে বাইরে চলে যায়। এর ঠিক তিন মিনিট পরেই সেই বহুল প্রতীক্ষিত ও ম্যাচ নির্ধারণী গোলটি করেন খোদ লিওনেল মেসি নিজেই।
প্রতিপক্ষের প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে যখন তিনি বল পায়ে পান, তখন তাকে ঘিরে ধরেছিলেন প্রতিপক্ষের তিনজন অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার। কিন্তু তাদের ভিড় থেকেই নিজের চেনা জাদুকরী ড্রিবলিংয়ের নৈপুণ্যে বল পায়ে নিয়ে দুর্দান্ত গতিতে বেরিয়ে আসেন তিনি। বক্সের ঠিক মাথায় এ সময় অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন সেগোভিয়া। প্রতিপক্ষের একজন ডিফেন্ডারকে নিখুঁতভাবে আড়াল করে আলতো এক ছোঁয়ায় মেসিকে গোল করার পথ তৈরি করে দেন তিনি। মায়ামি দলপতি একটুও সময় নষ্ট না করে চকিতে বক্সের ভেতর ঢুকে ডিফেন্ডারদের মাঝ দিয়ে গড়ানো শটে পরাস্ত করেন গোলকিপারকে।
ম্যাচের শেষ মুহূর্তে অবশ্য নিউ ইংল্যান্ড ম্যাচে সমতা প্রায় ফিরিয়েই ফেলেছিল। ৮৭তম মিনিটে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজেদের বিপদমুক্ত করতে গিয়ে ভুলের বশবর্তী হয়ে হেডে নিজেদের জালেই বল জড়িয়ে দেন মায়ামির ডিফেন্ডার ইয়ান ফ্রে। তবে শেষ মুহূর্তে মাঠের পাশের ভিডিও মনিটর দেখে ঘটনাটি অফসাইড ঘোষণা করেন রেফারি। ফলে বড় ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা পায় মায়ামি।
যদি এই ম্যাচে জয় না আসত, তবে কনক্যাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপে সরাসরি জায়গা করে নেওয়ার জন্য মেসিদের তাকিয়ে থাকতে হতো একদম নিয়মিত মৌসুমের শেষ ম্যাচের কঠিন সমীকরণের দিকে।


























