‘একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?’ শিল্পী ভূপেন হাজারিকার কালজয়ী গান ‘মানুষ মানুষের জন্য’-এর এই আবেগঘন লাইনটি যেন বর্তমান সমাজের এক কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরছে। এই গানের মূল থিম হলো মানবতার ডাক, যেখানে মানুষকে স্বার্থপরতা ভুলে একে অপরের বিপদে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। সমাজে কেউ একা বাঁচতে পারে না; একজন মানুষের বিপদে আরেকজনের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। বিপদে এগিয়ে আসা দয়া বা করুণা নয়, বরং এটি মানবতা—মানুষের প্রতি মানুষের সহজাত দায়িত্ব। কিন্তু এই মানবিকতা যেন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। মেট্রোরেলের একজন শিক্ষকের সাম্প্রতিক করুণ মৃত্যু সেই কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ নাজিবুর রহমান গত ২৪ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এসেছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে বিকাল ৩টার দিকে তিনি শাহবাগ স্টেশন থেকে উত্তরায় তার বাসায় যাওয়ার উদ্দেশে মেট্রোরেলে ওঠেন। ট্রেনটিতে প্রচণ্ড ভিড় ছিল।
শেওড়াপাড়া ও কাজিপাড়া স্টেশনের মাঝামাঝি ট্রেনটি যাওয়ার পর ড. নাজিবুর হঠাৎ প্রচণ্ড অসুস্থতাবোধ করেন। দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তিনি এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন যে, পাশে বসে থাকা যাত্রীদের কাছে বসার জন্য অনুরোধ জানান। তিনি কয়েকবারই বলতে থাকেন, ‘আমি প্রচণ্ড অসুস্থতাবোধ করছি, কেউ একজন আমাকে একটু বসতে দিন।’ কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কেউ তার আকুতি কিংবা অনুরোধে সাড়া দেয়নি, একটি আসন ছেড়ে দিয়ে তাকে বসতে দেয়নি।
বসার অনুরোধ করার মাত্র এক-দুই মিনিটের মধ্যেই তিনি মেট্রোরেলের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। তার ছেলে নাকিবুর রহমানের ধারণা, ট্রেনের ভেতরে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তেই তার বাবা স্ট্রোক করে জীবনাবসান হয়। ট্রেনটি উত্তরা উত্তর স্টেশনে পৌঁছলে আনসার সদস্য ও কর্তৃপক্ষের সহায়তায় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকরা শরীর পরীক্ষা করে জানান, তিনি আগেই মারা গেছেন।
এই মৃত্যু নিয়ে তার ছেলে নাকিবুর রহমান একটি মর্মস্পর্শী পোস্ট দেন। তিনি লেখেন, ‘ছেলে হিসেবে আজীবন একটাই আক্ষেপ থাকবে, কেউ যদি আব্বুকে ট্রেনের আসনে একটু বসতে দিতেন, তাহলে হয়তো তিনি এভাবে মেঝেতে লুটিয়ে না পড়ে কারো কোলে মাথা রেখে শান্তিতে বিদায় নিতে পারতেন।’ তবে নাকিবুর এ নিয়ে কারো দোষারোপ করতে চান না, বরং এই ঘটনার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সহানুভূতি ও মানবিকতার প্রশ্নটিই বড় হয়ে উঠেছে।


























