Dhaka ০৮:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

চার দিনের সরকারি সফরে আজ জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ১১:২০:১১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
  • ৬ বার দেখা হয়েছে

জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে চার দিনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের সরকারি সফরে আজ পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক পরাশক্তি জাপানের উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঐতিহাসিক এই দ্বিপক্ষীয় সফরে দুই বন্ধুপ্রতীম দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বহুলাংশে সম্প্রসারণ, মেগা অবকাঠামোগত উন্নয়ন, উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং জাপানের উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে যৌথ সহযোগিতা সুদৃঢ় করার বিষয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করা হবে।

আজ রবিবার (২৫ অক্টোবর) দিনগত রাত ১২টা ১০ মিনিটে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ ফ্লাইটে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জাপানের রাজধানী টোকিওর উদ্দেশে তাঁর ঢাকা ত্যাগ করার কথা রয়েছে।

সফরের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, আগামী মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে শীর্ষপর্যায়ের এক দ্বিপক্ষীয় সংলাপে মিলিত হবেন তারেক রহমান। ওই বৈঠকে দুই দেশের বিদ্যমান বহুমুখী কৌশলগত সহযোগিতা বিশদ পর্যালোচনার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত করার কৌশলগত বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।

এ ছাড়া সফরকালে আয়োজিত ‘জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে’ প্রধান বক্তা হিসেবে মূল ভাষণ উপস্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী। সে সময় জাপানের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বিশেষ গোলটেবিল বৈঠকে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং জাতীয় শিল্প খাতের আধুনিকায়নে যৌথ সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করবেন।

বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব:

উচ্চপর্যায়ের এই সফরে বাংলাদেশে নতুন জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্প খাতে প্রচুর নতুন কর্মসংস্থান তৈরি এবং জাপানের অর্থায়নে চলমান মেগা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে বিগত ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত বহুল আলোচিত ‘বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি’ (ইপিএ) পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং উন্নত জাপানি বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণের বিষয়েও ফলপ্রসূ আলোচনার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফরসূচিতে ‘জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ’ এবং ‘জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের’ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক পৃথক কৌশলগত বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা), আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো), আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) এবং বিখ্যাত গবেষণা সংস্থা সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কর্মসূচিও নির্ধারিত রয়েছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এই ঐতিহাসিক সফরে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা উন্নয়ন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ, বেসামরিক বিমান চলাচল এবং স্থানীয় সরকারব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক চুক্তি, সমঝোতা স্মারক (MoU) সই কিংবা যৌথ সহযোগিতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।

অন্যদিকে ঢাকায় অবস্থিত জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগের মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ পরিবেশের কাঙ্ক্ষিত মানোন্নয়ন, অবকাঠামো খাতে বৈশ্বিক সহযোগিতা প্রসার এবং মানবসম্পদ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সুদৃঢ় অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও মজবুত ও বিস্তৃত করার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।

শিল্প ও অবকাঠামো খাতে সরাসরি সহযোগিতা:

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য এই সফরসূচিতে জাপানের চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরে অবস্থিত একটি বৃহদাকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও অত্যাধুনিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সরাসরি সরেজমিনে পরিদর্শনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পোশাক ব্র্যান্ড ‘ইউনিক্লো’ (Uniqlo)-র করপোরেট সদর দপ্তর এবং শিল্পনগরী নাগোয়ায় অবস্থিত বিশ্বখ্যাত মোটরযান প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘টয়োটা’ (Toyota)-র প্রকাণ্ড কারখানা পরিদর্শনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

বিশেষায়িত এসব মাঠপর্যায়ের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাপানের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও বিশ্বমানের শিল্প খাতের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা সরাসরি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ মিলবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের জাতীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দ্রুত শিল্পায়ন এবং ক্রমবর্ধমান জ্বালানি খাতের নিরাপত্তায় জাপানি সহযোগিতার বাস্তব সম্ভাবনা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে। একই সাথে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগে নতুন কারখানা স্থাপন, তরুণদের বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি এবং আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রটি বিশেষ নজর পাবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।

রোহিঙ্গা সংকট ও জ্বালানি নিরাপত্তাও আলোচনায়:

দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক ভৌগোলিক রাজনীতি, আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, মিয়ানমার থেকে আসা বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধান এবং বাংলাদেশের উদীয়মান জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়েও দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে গভীর আলোচনার পূর্বাভাস পাওয়া গেছে।

জাপানি দূতাবাসের অর্থনৈতিক শাখা স্পষ্ট করেছে যে, এই সফর দুই দেশের মধ্যকার বিনিয়োগের বিদ্যমান নীতিগত বাধা ও প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে, বিনিয়োগকারী ব্যবসায়ীদের আস্থা সুদৃঢ় করতে এবং ভবিষ্যতের যৌথ অর্থনৈতিক উদ্যোগগুলোর একটি শক্ত প্ল্যাটফর্ম তৈরির পথ উন্মুক্ত করবে। পাশাপাশি শীর্ষ বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত ও অঙ্গিকারগুলোর দ্রুত ও দৃশ্যমান বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে।

বাংলাদেশের সর্বাঙ্গীণ উন্নয়নে জাপানের অনন্য অবদান:

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূচনালগ্ন থেকেই জাপান দেশের অন্যতম প্রধান ও বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে রয়েছে। উদীয়মান বাংলাদেশের মেগা অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং সার্বিক দাপ্তরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সুদীর্ঘকাল ধরে জাপানি অর্থায়নে অগণিত প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার স্বপ্নের মেট্রোরেল প্রকল্প, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দৃষ্টিনন্দন থার্ড বা তৃতীয় টার্মিনাল এবং মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও সমন্বিত হাব এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সর্বশেষ ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার ঐতিহাসিক ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ (Strategic Partnership)-কে আরও সুদূরপ্রসারী ও জোরদার করার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ সফর এক অনন্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সফরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, নতুন বিনিয়োগ, অবকাঠামো নির্মাণ, কারিগরি প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে নতুন রূপরেখা তৈরি হলে তা দুই বন্ধুপ্রতীম দেশের ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

জনপ্রিয়

মোংলা বন্দরে দুটি আধুনিক কন্টেইনার জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী

চার দিনের সরকারি সফরে আজ জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

সর্বশেষ হালনাগাদ : ১১:২০:১১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে চার দিনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের সরকারি সফরে আজ পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক পরাশক্তি জাপানের উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঐতিহাসিক এই দ্বিপক্ষীয় সফরে দুই বন্ধুপ্রতীম দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বহুলাংশে সম্প্রসারণ, মেগা অবকাঠামোগত উন্নয়ন, উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং জাপানের উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে যৌথ সহযোগিতা সুদৃঢ় করার বিষয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করা হবে।

আজ রবিবার (২৫ অক্টোবর) দিনগত রাত ১২টা ১০ মিনিটে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ ফ্লাইটে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জাপানের রাজধানী টোকিওর উদ্দেশে তাঁর ঢাকা ত্যাগ করার কথা রয়েছে।

সফরের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, আগামী মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে শীর্ষপর্যায়ের এক দ্বিপক্ষীয় সংলাপে মিলিত হবেন তারেক রহমান। ওই বৈঠকে দুই দেশের বিদ্যমান বহুমুখী কৌশলগত সহযোগিতা বিশদ পর্যালোচনার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত করার কৌশলগত বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।

এ ছাড়া সফরকালে আয়োজিত ‘জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে’ প্রধান বক্তা হিসেবে মূল ভাষণ উপস্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী। সে সময় জাপানের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বিশেষ গোলটেবিল বৈঠকে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং জাতীয় শিল্প খাতের আধুনিকায়নে যৌথ সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করবেন।

বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব:

উচ্চপর্যায়ের এই সফরে বাংলাদেশে নতুন জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্প খাতে প্রচুর নতুন কর্মসংস্থান তৈরি এবং জাপানের অর্থায়নে চলমান মেগা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে বিগত ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত বহুল আলোচিত ‘বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি’ (ইপিএ) পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং উন্নত জাপানি বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণের বিষয়েও ফলপ্রসূ আলোচনার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফরসূচিতে ‘জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ’ এবং ‘জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের’ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক পৃথক কৌশলগত বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা), আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো), আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) এবং বিখ্যাত গবেষণা সংস্থা সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কর্মসূচিও নির্ধারিত রয়েছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এই ঐতিহাসিক সফরে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা উন্নয়ন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ, বেসামরিক বিমান চলাচল এবং স্থানীয় সরকারব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক চুক্তি, সমঝোতা স্মারক (MoU) সই কিংবা যৌথ সহযোগিতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।

অন্যদিকে ঢাকায় অবস্থিত জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগের মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ পরিবেশের কাঙ্ক্ষিত মানোন্নয়ন, অবকাঠামো খাতে বৈশ্বিক সহযোগিতা প্রসার এবং মানবসম্পদ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সুদৃঢ় অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও মজবুত ও বিস্তৃত করার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।

শিল্প ও অবকাঠামো খাতে সরাসরি সহযোগিতা:

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য এই সফরসূচিতে জাপানের চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরে অবস্থিত একটি বৃহদাকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও অত্যাধুনিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সরাসরি সরেজমিনে পরিদর্শনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পোশাক ব্র্যান্ড ‘ইউনিক্লো’ (Uniqlo)-র করপোরেট সদর দপ্তর এবং শিল্পনগরী নাগোয়ায় অবস্থিত বিশ্বখ্যাত মোটরযান প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘টয়োটা’ (Toyota)-র প্রকাণ্ড কারখানা পরিদর্শনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

বিশেষায়িত এসব মাঠপর্যায়ের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাপানের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও বিশ্বমানের শিল্প খাতের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা সরাসরি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ মিলবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের জাতীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দ্রুত শিল্পায়ন এবং ক্রমবর্ধমান জ্বালানি খাতের নিরাপত্তায় জাপানি সহযোগিতার বাস্তব সম্ভাবনা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে। একই সাথে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগে নতুন কারখানা স্থাপন, তরুণদের বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি এবং আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রটি বিশেষ নজর পাবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।

রোহিঙ্গা সংকট ও জ্বালানি নিরাপত্তাও আলোচনায়:

দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক ভৌগোলিক রাজনীতি, আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, মিয়ানমার থেকে আসা বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধান এবং বাংলাদেশের উদীয়মান জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়েও দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে গভীর আলোচনার পূর্বাভাস পাওয়া গেছে।

জাপানি দূতাবাসের অর্থনৈতিক শাখা স্পষ্ট করেছে যে, এই সফর দুই দেশের মধ্যকার বিনিয়োগের বিদ্যমান নীতিগত বাধা ও প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে, বিনিয়োগকারী ব্যবসায়ীদের আস্থা সুদৃঢ় করতে এবং ভবিষ্যতের যৌথ অর্থনৈতিক উদ্যোগগুলোর একটি শক্ত প্ল্যাটফর্ম তৈরির পথ উন্মুক্ত করবে। পাশাপাশি শীর্ষ বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত ও অঙ্গিকারগুলোর দ্রুত ও দৃশ্যমান বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে।

বাংলাদেশের সর্বাঙ্গীণ উন্নয়নে জাপানের অনন্য অবদান:

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূচনালগ্ন থেকেই জাপান দেশের অন্যতম প্রধান ও বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে রয়েছে। উদীয়মান বাংলাদেশের মেগা অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং সার্বিক দাপ্তরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সুদীর্ঘকাল ধরে জাপানি অর্থায়নে অগণিত প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার স্বপ্নের মেট্রোরেল প্রকল্প, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দৃষ্টিনন্দন থার্ড বা তৃতীয় টার্মিনাল এবং মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও সমন্বিত হাব এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সর্বশেষ ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার ঐতিহাসিক ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ (Strategic Partnership)-কে আরও সুদূরপ্রসারী ও জোরদার করার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ সফর এক অনন্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সফরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, নতুন বিনিয়োগ, অবকাঠামো নির্মাণ, কারিগরি প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে নতুন রূপরেখা তৈরি হলে তা দুই বন্ধুপ্রতীম দেশের ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।