Dhaka ০৮:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে উত্তাল ফ্রান্স, আটক হাজার

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ১১:১৮:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
  • ৬ বার দেখা হয়েছে

দেশজুড়ে মাত্রাতিরিক্ত জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের চড়া মূল্য এবং বিভিন্ন মৌলিক সরকারি সেবার অবনতির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ফের অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে ইউরোপের অন্যতম প্রধান দেশ ফ্রান্স। রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির ছোট-বড় বিভিন্ন শহরে রাজপথে নেমে এসেছেন লাখো ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সাথে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই উদ্ভূত বিস্ফোরক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুরো দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার সশস্ত্র পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছে ফরাসি সরকার। চলমান এই তীব্র বিক্ষোভের ভেতর থেকে দেশব্যাপী অভিযান চালিয়ে প্রায় এক হাজার আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) প্যারিস ছাড়াও লিওঁ, লিল, তুলুজ, নঁত, মার্সেই এবং বোর্দোসহ ফ্রান্সের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে এই ব্যাপক বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। এর মধ্যে লিওঁ, লিল, তুলুজ ও নঁত শহরে উত্তেজিত বিক্ষোভকারীদের সড়ক থেকে জোরপূর্বক ছত্রভঙ্গ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে পুলিশ; ব্যবহার করা হয় বিষাক্ত কাঁদানে গ্যাস, শক্তিশালী জলকামান এবং উচ্চ শব্দের স্টান গ্রেনেড। বিশেষ করে বোর্দো শহরে আন্দোলনকারীরা পুলিশের ওপর লক্ষ্য করে বিভিন্ন ভারী বস্তু নিক্ষেপ করে এবং রাস্তায় একের পর এক ব্যারিকেড তৈরি করে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

এর আগে গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভ তীব্র সহিংসতা ও লুটপাটের রূপ নেওয়ায় এবার শুরু থেকেই নজিরবিহীন ও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে ফরাসি প্রশাসন। পূর্ববর্তী সপ্তাহের তুলনামূলক পরিস্থিতির চেয়ে এবার অতিরিক্ত ১০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডার্ম সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। পাশাপাশি যেকোনো নাশকতা এড়াতে বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট, ভারী সশস্ত্র জলকামান ও সাঁজোয়া যান, হেলিকপ্টার এবং প্রশিক্ষিত পুলিশ কুকুর প্রস্তুত রাখা হয়। এমনকি রাজধানী প্যারিসের ঐতিহাসিক শঁজেলিজে এলাকায় স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে সেনাসদস্যদের কঠোর টহল দিতে দেখা গেছে।

দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ গণমাধ্যমকে জানান, বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের আগে ও চলাকালে দেশজুড়ে কঠোর তল্লাশি চালিয়ে বিপজ্জনক ধাতব বল, ক্ষতিকর সিসার ছররা, পটকা ও আতশবাজি, গুলতি, প্রাচীন ধারালো কাতানা এবং আধুনিক এয়ারসফট অস্ত্রসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ সামগ্রী ও অস্ত্রশস্ত্র জব্দ করা হয়েছে। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার বা সামান্যতম সহিংসতা সৃষ্টির কোনো অবৈধ প্রচেষ্টা সরকার বরদাশত করবে না।

সম্ভাব্য বড় ধরনের ভাঙচুর ও উন্মত্ত লুটপাটের আশঙ্কায় রাজধানী প্যারিসের একটি বিশাল অংশজুড়ে নিরাপত্তা জাল কঠোর করা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে শহরটির অন্তত ২০টিরও বেশি পাতাল রেল বা মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। এছাড়া বিশ্বখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়াম, মিউজে দ’অরসে এবং প্যারিস অপেরার মতো গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও সারাদিন বন্ধ রাখা হয়। বিগত সপ্তাহে দেশজুড়ে বহু দোকান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আকস্মিক হামলার শিকার হওয়ায় এবং লুটপাটের মুখে পড়ায় এবার অনেক ব্যবসায়ী স্বেচ্ছায় নিজেদের দোকানপাটের কাচ সুরক্ষায় কাঠের মজবুত প্যানেল বসিয়ে রাখেন।

প্যারিসে সরকার অনুমোদিত মূল শান্তিপূর্ণ মিছিলটি বড় কোনো বড় সংঘর্ষ ছাড়াই নির্ধারিত রুট ধরে ‘পোর্ত দ্য ভিনসেন’ এলাকায় গিয়ে শেষ হয়। তবে সুনির্দিষ্ট এই মিছিলের রুট ও পথ নির্ধারণ করা নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সরকার এবং আন্দোলনকারী আয়োজকদের মধ্যে তীব্র টানাপড়েন ও মতবিরোধ চলে। পুলিশ পূর্বে নির্ধারিত বাস্তিল থেকে নাসিওঁ পর্যন্ত প্রধান সড়ক রুট বাতিল করে শহরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের তুলনামূলক কম জনবহুল নতুন পথ নির্ধারণ করে দেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, পূর্বের সপ্তাহে যেসব বাণিজ্যিক এলাকায় ব্যাপক লুটপাট হয়েছিল, সেই স্পর্শকাতর এলাকাগুলো এড়িয়ে যাওয়ার জন্যই এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বিরোধী বামপন্থী রাজনৈতিক নেতারা সরকারের এই পদক্ষেপকে গণতান্ত্রিক বিক্ষোভে বাধা দেওয়ার এক ধরনের সুকৌশলী অপচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন।

রাজধানী প্যারিসের বাইরের আঞ্চলিক শহরগুলোতে অবশ্য পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত ও সংঘর্ষমুখর। যেমন—নঁত শহরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত এলাকায় জোর করে ঢোকার চেষ্টা চালালে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয় এবং তাদের হটাতে জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে। এছাড়া লিওঁ, লিল ও তুলুজ শহরেও বিক্ষুব্ধ জনতাকে লক্ষ্য করে দফায় দফায় কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষের সংখ্যা নিয়ে সরকারি হিসাব এবং আন্দোলনকারী ট্রেড ইউনিয়নের দাবির মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান ও মতপার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে দেশটির জাতীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে যে, গত শনিবারের দেশব্যাপী এই বিক্ষোভে সর্বসাকুল্যে প্রায় চার লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। অন্যদিকে, এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক ও শীর্ষস্থানীয় ট্রেড ইউনিয়ন ‘সিজিটি’ (CGT)-র দাবি অনুযায়ী, ওইদিনের বিক্ষোভে অন্তত আট লাখ মানুষ সরাসরি রাজপথে অংশ নেন—যা সরকারি হিসাবের প্রায় দ্বিগুণ।

রাজধানী প্যারিসের জমায়েতের সংখ্যার ক্ষেত্রেও দুই পক্ষের হিসাবে আকাশ-পাতাল তফাৎ রয়েছে। সিজিটির নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, শুধু রাজধানীতেই আধা মিলিয়নের কাছাকাছি অর্থাৎ প্রায় আড়াই লাখ মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। বিপরীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্যারিস পুলিশ সদর দপ্তরের যৌথ হিসাবে এই উপস্থিতি বড় জোর এক লাখ ১০ হাজার ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

চলমান এই সরকারবিরোধী ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ঐতিহাসিক আন্দোলনে সাধারণ শ্রমিক ও পেশাজীবীদের পাশাপাশি বহুল আলোচিত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা হলুদ জ্যাকেট আন্দোলনের কর্মীরা এবং স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে দলবেঁধে যোগ দিয়েছেন। গত শনিবার কেবল ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকেই দেশজুড়ে ৭০০-রও বেশি ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচি পালনের কড়া ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।

দেশের বর্তমান ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার চরম সংকট, শিক্ষকস্বল্পতা, বিভিন্ন মৌলিক সরকারি সেবার ক্রমাগত অবনতি এবং আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিই মূলত এই গণআন্দোলনের প্রধান ও কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে। বর্তমান সরকারের ওপর তীব্র রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখতে আগামী ৩১ অক্টোবর শনিবার আরও একবার দেশব্যাপী কঠোর বিক্ষোভ ও আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন আন্দোলনরত বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। এমনকি দেশের প্রভাবশালী বামপন্থী রাজনৈতিক নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ ইতিমধ্যে বর্তমান সরকারকে সরাসরি কঠোর হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, সরকার যদি অবিলম্বে জনগণের যৌক্তিক দাবিগুলো মেনে না নেয়, তবে আগামী ৫ নভেম্বর পুরো ফ্রান্সে সর্বাত্মক সাধারণ ধর্মঘট পালিত হতে পারে।

জনপ্রিয়

মোংলা বন্দরে দুটি আধুনিক কন্টেইনার জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে উত্তাল ফ্রান্স, আটক হাজার

সর্বশেষ হালনাগাদ : ১১:১৮:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

দেশজুড়ে মাত্রাতিরিক্ত জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের চড়া মূল্য এবং বিভিন্ন মৌলিক সরকারি সেবার অবনতির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ফের অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে ইউরোপের অন্যতম প্রধান দেশ ফ্রান্স। রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির ছোট-বড় বিভিন্ন শহরে রাজপথে নেমে এসেছেন লাখো ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সাথে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই উদ্ভূত বিস্ফোরক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুরো দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার সশস্ত্র পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছে ফরাসি সরকার। চলমান এই তীব্র বিক্ষোভের ভেতর থেকে দেশব্যাপী অভিযান চালিয়ে প্রায় এক হাজার আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) প্যারিস ছাড়াও লিওঁ, লিল, তুলুজ, নঁত, মার্সেই এবং বোর্দোসহ ফ্রান্সের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে এই ব্যাপক বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। এর মধ্যে লিওঁ, লিল, তুলুজ ও নঁত শহরে উত্তেজিত বিক্ষোভকারীদের সড়ক থেকে জোরপূর্বক ছত্রভঙ্গ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে পুলিশ; ব্যবহার করা হয় বিষাক্ত কাঁদানে গ্যাস, শক্তিশালী জলকামান এবং উচ্চ শব্দের স্টান গ্রেনেড। বিশেষ করে বোর্দো শহরে আন্দোলনকারীরা পুলিশের ওপর লক্ষ্য করে বিভিন্ন ভারী বস্তু নিক্ষেপ করে এবং রাস্তায় একের পর এক ব্যারিকেড তৈরি করে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

এর আগে গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভ তীব্র সহিংসতা ও লুটপাটের রূপ নেওয়ায় এবার শুরু থেকেই নজিরবিহীন ও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে ফরাসি প্রশাসন। পূর্ববর্তী সপ্তাহের তুলনামূলক পরিস্থিতির চেয়ে এবার অতিরিক্ত ১০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডার্ম সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। পাশাপাশি যেকোনো নাশকতা এড়াতে বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট, ভারী সশস্ত্র জলকামান ও সাঁজোয়া যান, হেলিকপ্টার এবং প্রশিক্ষিত পুলিশ কুকুর প্রস্তুত রাখা হয়। এমনকি রাজধানী প্যারিসের ঐতিহাসিক শঁজেলিজে এলাকায় স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে সেনাসদস্যদের কঠোর টহল দিতে দেখা গেছে।

দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ গণমাধ্যমকে জানান, বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের আগে ও চলাকালে দেশজুড়ে কঠোর তল্লাশি চালিয়ে বিপজ্জনক ধাতব বল, ক্ষতিকর সিসার ছররা, পটকা ও আতশবাজি, গুলতি, প্রাচীন ধারালো কাতানা এবং আধুনিক এয়ারসফট অস্ত্রসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ সামগ্রী ও অস্ত্রশস্ত্র জব্দ করা হয়েছে। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার বা সামান্যতম সহিংসতা সৃষ্টির কোনো অবৈধ প্রচেষ্টা সরকার বরদাশত করবে না।

সম্ভাব্য বড় ধরনের ভাঙচুর ও উন্মত্ত লুটপাটের আশঙ্কায় রাজধানী প্যারিসের একটি বিশাল অংশজুড়ে নিরাপত্তা জাল কঠোর করা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে শহরটির অন্তত ২০টিরও বেশি পাতাল রেল বা মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। এছাড়া বিশ্বখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়াম, মিউজে দ’অরসে এবং প্যারিস অপেরার মতো গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও সারাদিন বন্ধ রাখা হয়। বিগত সপ্তাহে দেশজুড়ে বহু দোকান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আকস্মিক হামলার শিকার হওয়ায় এবং লুটপাটের মুখে পড়ায় এবার অনেক ব্যবসায়ী স্বেচ্ছায় নিজেদের দোকানপাটের কাচ সুরক্ষায় কাঠের মজবুত প্যানেল বসিয়ে রাখেন।

প্যারিসে সরকার অনুমোদিত মূল শান্তিপূর্ণ মিছিলটি বড় কোনো বড় সংঘর্ষ ছাড়াই নির্ধারিত রুট ধরে ‘পোর্ত দ্য ভিনসেন’ এলাকায় গিয়ে শেষ হয়। তবে সুনির্দিষ্ট এই মিছিলের রুট ও পথ নির্ধারণ করা নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সরকার এবং আন্দোলনকারী আয়োজকদের মধ্যে তীব্র টানাপড়েন ও মতবিরোধ চলে। পুলিশ পূর্বে নির্ধারিত বাস্তিল থেকে নাসিওঁ পর্যন্ত প্রধান সড়ক রুট বাতিল করে শহরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের তুলনামূলক কম জনবহুল নতুন পথ নির্ধারণ করে দেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, পূর্বের সপ্তাহে যেসব বাণিজ্যিক এলাকায় ব্যাপক লুটপাট হয়েছিল, সেই স্পর্শকাতর এলাকাগুলো এড়িয়ে যাওয়ার জন্যই এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বিরোধী বামপন্থী রাজনৈতিক নেতারা সরকারের এই পদক্ষেপকে গণতান্ত্রিক বিক্ষোভে বাধা দেওয়ার এক ধরনের সুকৌশলী অপচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন।

রাজধানী প্যারিসের বাইরের আঞ্চলিক শহরগুলোতে অবশ্য পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত ও সংঘর্ষমুখর। যেমন—নঁত শহরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত এলাকায় জোর করে ঢোকার চেষ্টা চালালে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয় এবং তাদের হটাতে জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে। এছাড়া লিওঁ, লিল ও তুলুজ শহরেও বিক্ষুব্ধ জনতাকে লক্ষ্য করে দফায় দফায় কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষের সংখ্যা নিয়ে সরকারি হিসাব এবং আন্দোলনকারী ট্রেড ইউনিয়নের দাবির মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান ও মতপার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে দেশটির জাতীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে যে, গত শনিবারের দেশব্যাপী এই বিক্ষোভে সর্বসাকুল্যে প্রায় চার লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। অন্যদিকে, এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক ও শীর্ষস্থানীয় ট্রেড ইউনিয়ন ‘সিজিটি’ (CGT)-র দাবি অনুযায়ী, ওইদিনের বিক্ষোভে অন্তত আট লাখ মানুষ সরাসরি রাজপথে অংশ নেন—যা সরকারি হিসাবের প্রায় দ্বিগুণ।

রাজধানী প্যারিসের জমায়েতের সংখ্যার ক্ষেত্রেও দুই পক্ষের হিসাবে আকাশ-পাতাল তফাৎ রয়েছে। সিজিটির নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, শুধু রাজধানীতেই আধা মিলিয়নের কাছাকাছি অর্থাৎ প্রায় আড়াই লাখ মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। বিপরীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্যারিস পুলিশ সদর দপ্তরের যৌথ হিসাবে এই উপস্থিতি বড় জোর এক লাখ ১০ হাজার ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

চলমান এই সরকারবিরোধী ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ঐতিহাসিক আন্দোলনে সাধারণ শ্রমিক ও পেশাজীবীদের পাশাপাশি বহুল আলোচিত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা হলুদ জ্যাকেট আন্দোলনের কর্মীরা এবং স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে দলবেঁধে যোগ দিয়েছেন। গত শনিবার কেবল ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকেই দেশজুড়ে ৭০০-রও বেশি ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচি পালনের কড়া ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।

দেশের বর্তমান ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার চরম সংকট, শিক্ষকস্বল্পতা, বিভিন্ন মৌলিক সরকারি সেবার ক্রমাগত অবনতি এবং আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিই মূলত এই গণআন্দোলনের প্রধান ও কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে। বর্তমান সরকারের ওপর তীব্র রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখতে আগামী ৩১ অক্টোবর শনিবার আরও একবার দেশব্যাপী কঠোর বিক্ষোভ ও আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন আন্দোলনরত বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। এমনকি দেশের প্রভাবশালী বামপন্থী রাজনৈতিক নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ ইতিমধ্যে বর্তমান সরকারকে সরাসরি কঠোর হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, সরকার যদি অবিলম্বে জনগণের যৌক্তিক দাবিগুলো মেনে না নেয়, তবে আগামী ৫ নভেম্বর পুরো ফ্রান্সে সর্বাত্মক সাধারণ ধর্মঘট পালিত হতে পারে।