রাজধানী ঢাকার যত্রতত্র প্রধান সড়ক ও ফুটপাত বেআইনিভাবে দখল করে ব্যবসা পরিচালনা করা ভাসমান হকারদের বিরুদ্ধে এবার কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সম্মানিত প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।
তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, সরকারি নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি অমান্য করে যদি কোনো হকার পুনরায় সড়ক বা ফুটপাতে অবৈধভাবে দোকান বসান, তবে তাঁদের সমস্ত মালামাল বাজোপ্ত করা হবে। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনে তাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা দিয়ে সরাসরি গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হবে।
আজ শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম সায়েন্সল্যাব মোড় এলাকায় ডিএসসিসির উদ্যোগে পালিত ‘ক্লিন ডে’ উপলক্ষ্যে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশেষ মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে সশরীরে অংশ নিয়ে গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে তিনি এই কঠোর অবস্থানের কথা জানান।
ডিএসসিসি প্রশাসক তাঁর বক্তব্যে বলেন, রাজধানী ঢাকার সাধারণ নাগরিকদের নির্বিঘ্ন, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় চলাচল নিশ্চিত করতে পুরো ডিএসসিসি এলাকাধীন সড়ক ও ফুটপাতগুলো অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত রাখার জন্য জোরালো প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সিটি করপোরেশন। তবে অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, কিছু অমান্যকারী ভাসমান হকার কোনো ধরনের নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করছেন না। এই সমস্যা সমাধানে এর আগে হকারদের বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সাথে দফায় দফায় ফলপ্রসূ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ওইসব বৈঠকে উপস্থিত হকার নেতারা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে সুশৃঙ্খলভাবে ব্যবসা পরিচালনায় একমত পোষণ করলেও মাঠপর্যায়ে ফুটপাতে বসে থাকা অনেক হকার সেই নির্দেশনার কোনো তোয়াক্কাই করছেন না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
হকারদের পুনর্বাসন ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে প্রশাসক জানান, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বৈধ হকারদের সুনির্দিষ্ট নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। তাদের প্রত্যেকের জন্য দাপ্তরিক পরিচয়পত্র প্রদান করা হবে এবং ব্যবসার সুবিধার্থে প্রত্যেককে আলাদা সুনির্দিষ্ট নম্বর বরাদ্দ করে দেওয়া হবে। এই প্রাতিষ্ঠানিক নিবন্ধনের বাইরে যত্রতত্র অন্য কাউকে ঢাকা মহানগরীর ভেতরে হকারি ব্যবসা পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না।
তিনি আরও পরিষ্কার করে জানান, রাজধানীর নির্দিষ্ট কিছু নির্ধারিত এলাকায় বর্তমানে সীমিত পরিসরে হকারদের বসার প্রশাসনিক অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যেসব এলাকার ফুটপাত প্রশস্ত এবং সাধারণ পথচারীদের চলাচলে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হবে না, কেবল সেই সমস্ত নির্দিষ্ট স্থানেই হকাররা বসতে পারবেন। এর সুনির্দিষ্ট উদাহরণ হিসেবে গুলিস্তান ও নিউমার্কেট এলাকার কিছু নির্ধারিত স্থানের কথা উল্লেখ করেন তিনি। তবে এই নির্দিষ্ট زোন বা স্থান ছাড়া অন্য কোনো ফুটপাতে হকারদের বসার কোনো ধরনের বৈধ অনুমতি নেই এবং মূল সড়কে তো কোনোভাবেই কোনো হকার বসতে পারবেন না।
ডিএসসিসি প্রশাসক আবদুস সালাম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যেসকল এলাকায় প্রধান সড়কে হকারদের বসার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, ঠিক সেই সমস্ত এলাকার ফুটপাতেও হকারদের বসতে দেওয়া হবে না। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে কোনো শপিংমল বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনের জায়গায় যেন অবৈধভাবে কোনো হকার বসতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মূল সড়ক দখল হওয়া এবং যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়া রোধ করতে স্ব স্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের নিজ উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ করার আহ্বান জানান তিনি।
শহরের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দোকানপাট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সমস্ত বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে পলিথিন বা বড় বড় পাত্রের ভেতরে জমা রাখতে হবে। পরবর্তীতে সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সেখান থেকে সেই বর্জ্য সংগ্রহ করে নিয়ে যাবেন। কখনোই ঝাড়ু দিয়ে ময়লা-আবর্জনা সরাসরি ফুটপাত কিংবা পিচঢালা সড়কে ফেলা যাবে না।
তিনি সাধারণ নাগরিকদের সচেতন করার উদ্দেশ্যে বলেন, প্রতিদিন সকাল ছয়টা থেকে আটটার মধ্যে রাজধানী ঢাকার প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করলে সেখানে কোনো ময়লা-আবর্জনা প্রায় দেখাই যায় না। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, সকাল আটটার পর থেকে বেলা বাড়ার সাথে সাথে নগরীর ব্যস্ত সড়কগুলো আবার যত্রতত্র ফেলা ময়লায় ভরে যায়। নগরীর এই দৃশ্যপট পুরোপুরি পরিবর্তনের লক্ষ্যে পলিথিন, টিস্যু এবং অন্যান্য সমস্ত বর্জ্য যেখানে-সেখানে না ফেলে নির্ধারিত ডাস্টবিনে ফেলার জন্য নগরবাসীর প্রতি আন্তরিক অনুরোধ জানান তিনি।
ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন মশার উপদ্রব ও প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি কমাতে পরিচ্ছন্নতার কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, আমাদের প্রিয় শহরটি যত বেশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে, নগরবাসীর বিভিন্ন রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ততটাই কমে আসবে। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত আদর্শ ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য— একটি তকতকে ‘ক্লিন সিটি ও গ্রিন সিটি’ গড়ে তোলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে দেশের প্রতিটি নাগরিককে সম্মিলিতভাবে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও জানান, আজ শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন আঞ্চলিক ওয়ার্ডে একযোগে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। চলমান এই জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম আকস্মিকভাবে পরিদর্শনের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেকোনো সময় নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখতে পারেন। পাশাপাশি ডিএসসিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত শীর্ষ কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন গিয়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারক করা হবে।
নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, এই বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযানের বক্তব্য প্রদান শেষে ডিএসসিসি প্রশাসক সায়েন্সল্যাব মোড় থেকে পদব্রজে নীলক্ষেত মোড় হয়ে পুনরায় সায়েন্সল্যাবে ফিরে আসেন। এই পুরো পথ পরিক্রমার সময় তিনি রাস্তার দুই পাশের ফুটপাতে কোথাও কোনো ময়লা-আবর্জনা বা বর্জ্য পড়ে আছে কি না, তা অত্যন্ত গভীরভাবে ঘুরে দেখেন। পরিদর্শনের সময় যেসব স্থানে ময়লা বা স্তূপীকৃত জঞ্জাল দেখতে পান, সেগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরিষ্কার করার জন্য উপস্থিত পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন।
উক্ত বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক অভিযানের পাশাপাশি প্রধান সড়ক ও ফুটপাত অবৈধভাবে জবরদখল করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ভাসমান দোকান ও স্থাপনা তাৎক্ষণিকভাবে উচ্ছেদ করেন ডিএসসিসি প্রশাসক।






















