একজন শিশু চিকিৎসকের চেম্বারে প্রতিদিন অসংখ্য শিশু আসে তাদের নানা শারীরিক ও আচরণগত সমস্যা নিয়ে। তবে একজন চিকিৎসক হিসেবে ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরী শুধু রোগের নিরাময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, তিনি রোগীর পেছনের মানুষ, পরিবার ও সমাজকে গভীর মনোযোগে দেখেছেন। তার ‘চেম্বারে ক্ষণিক দেখা, জীবনের চিত্রলেখা’ বইটি মূলত সেই গল্পগুলোরই একটি মানবিক দলিল।
বইটি পড়লে বোঝা যায়, লেখক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গণ্ডি ছাড়িয়ে অভিভাবকত্ব ও শৈশবের বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন পাঠককে। ‘রাগের মাথায় বাবা হয়ে যান ঘাতক’, ‘মায়ের রিমান্ডে শিশু মেয়ে’, ‘কিশোর মনের ঠিকানা, বাবা-মার অজানা’, ‘স্কুলের কয়েদখানায় প্রতিদিন’—এ ধরনের শিরোনামগুলো সমাজের সংবেদনশীল দিকগুলো তুলে ধরে।
বইটিতে অটিজম, মেদস্থূলতা, জন্মগত সমস্যা, অপুষ্টি, শিশুর আচরণগত পরিবর্তন বা গুরুতর অসুস্থতার পাশাপাশি অতিরিক্ত আদর, শাসন, সামাজিক বৈষম্য, প্রযুক্তির আসক্তি, পড়াশোনার চাপ এবং পারিবারিক অবহেলার মতো বিষয়গুলোও উঠে এসেছে। ‘টিভির চ্যানেলে বন্দি শিশু’, ‘ফেসবুকের নেশায় অচল’, ‘বন্ধু আর খেলাধুলাবিহীন একাকী অসহায়’—এসব অভিজ্ঞতা বর্তমান সময়ের অভিভাবকত্বের নানা সংকটকে স্পষ্ট করে।
বইটির বিশেষ আকর্ষণ হলো এর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। চিকিৎসকের কাছে আসা শিশুকে কেবল ‘রোগী’ হিসেবে না দেখে তার ভয়, আনন্দ, অভিমান, স্বপ্ন ও পারিবারিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে অসুস্থ শিশুর সঙ্গে মায়ের দীর্ঘশ্বাস, বাবাকে হারানোর বেদনা, কিংবা সাম্প্রদায়িক সীমানা পেরিয়ে মানবিক হওয়ার মতো মর্মস্পর্শী গল্পও স্থান পেয়েছে।
সব মিলিয়ে, এই বইটি শুধু শিশু চিকিৎসার অভিজ্ঞতার সংকলন নয়; এটি আমাদের সন্তান প্রতিপালন, পারিবারিক সম্পর্ক এবং মানবিক দায়িত্ববোধের এক চিত্রলেখা। চেম্বারে কয়েক মিনিটের সাক্ষাৎ যে কখনো একটি পরিবারের গভীর সত্য উন্মোচন করতে পারে—বইটি তারই প্রমাণ। লেখক হিসেবে চিকিৎসকদের এমন সব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ থাকে, যা সাধারণ লেখকদের জন্য দুর্লভ। এই কারণে বইটির একটি আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। বইটির ভাষায় সাহিত্যিক মেজাজ রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছে।


























