দেশের বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে বর্তমান সরকারের গৃহীত সুনির্দিষ্ট নীতি ও কৌশলগত কর্মসূচিগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের পূর্ণ ঐকমত্য বজায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক কর্মসূচি ও রূপকল্পের সঙ্গে পুরোপুরি একমত পোষণ করে সরকারের পাশে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর ২০২৬) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সম্মেলনের অংশ হিসেবে বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অর্থমন্ত্রী এই স্বস্তিদায়ক তথ্য প্রকাশ করেন।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট ও পটভূমি বিশ্লেষণ করে বলেন, বর্তমান সরকার যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে, তখন জাতীয় অর্থনীতি নানামুখী গভীর সংকট এবং বিপুল পরিমাণ আর্থিক দেনা ও দায়ভারের মুখোমুখি ছিল। বিগত সময়ের বিপুল দেনার বোঝা বহনের পাশাপাশি চলমান বৈশ্বিক যুদ্ধবিগ্রহের ফলে সৃষ্ট বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বিপর্যয় বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতির ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশ্বব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্ব বাংলাদেশের এই কঠিন বাস্তব প্রেক্ষাপটকে পূর্ণ সহানুভূতি ও গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করছে এবং সংকট উত্তরণে সরকার যেসব সংস্কারমূলক নীতি গ্রহণ করেছে, সেগুলোর প্রতি সংস্থাটি তাদের পূর্ণ আস্থা ও সমর্থন জ্ঞাপন করেছে।
তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় সরাসরি সহযোগী অংশীদার হিসেবে কাজ করতে অত্যন্ত আগ্রহী। সরকার মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক গতিপথ এবং সার্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে যে রূপরেখা প্রণয়ন করেছে, তার সঙ্গে সংস্থাটি নীতিগতভাবে পুরোপুরি একমত প্রকাশ করেছে। আগামী দিনগুলোতে এই যৌথ অংশীদারত্ব আরও জোরদার হবে।
গণমাধ্যমে বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজেট সহায়তার অনুরোধের খবরের বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বিভ্রান্তি দূর করে নিশ্চিত করেন যে, এ বিষয়ে এখনও কোনো চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকারের এই দরকষাকষি ও দ্বিপক্ষীয় সংলাপ একটি দীর্ঘমেয়াদী চলমান প্রক্রিয়া। এই কৌশলগত আলোচনার ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে সার্বিক দিক পর্যালোচনা করে বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, যা চূড়ান্ত হতে আগামী কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তিনি অপপ্রচার বা ভুল বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদন থেকে বিরত থাকারও তাগিদ দেন।
অর্থমন্ত্রী জানান, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার এবং বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের অগ্রাধিকার ক্ষেত্রগুলোর চমৎকার সামঞ্জস্য রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সহায়তা চুক্তির জন্য ‘পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক’ বা অংশীদারত্ব কাঠামোর একটি লিখিত প্রস্তাবনা ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হয়েছে। এই কাঠামোর আওতায় ধারাবাহিকভাবে আলোচনা ও কারিগরি পর্যালোচনা প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে যথাক্রমে ৩.২ শতাংশ এবং ৩.৪ শতাংশে নামার যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, সেই বিষয়ে আলোকপাত করেন অর্থমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক এসব বহুপাক্ষিক দাতা সংস্থার পূর্বাভাস ও সরকারি প্রক্ষেপণের বিষয়ে তিনি জানান, সরকার দাতা সংস্থাসমূহের দেওয়া পূর্বাভাসকে কোনোভাবেই বিতর্কিত বা চ্যালেঞ্জ করতে চায় না। বিভিন্ন সংস্থা নিজস্ব ডাটা, হিসাববিজ্ঞান ও বিশ্লেষণী মডেলের ভিত্তিতে পূর্বাভাস প্রদান করে থাকে। সরকার নিজস্ব বাজেট কৌশলে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে এবং বাজেটে প্রাক্কলিত লক্ষ্যমাত্রা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অর্জন করা সম্ভব হবে বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি।
উল্লেখ্য, আইএমএফের বার্ষিক সভার পাশাপশি আয়োজিত সাইড ইভেন্টেও বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার ২০২৬ সালে ৩.১ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকট, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও মধ্যপ্রাচ্য অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি যখন মারাত্মক চাপে রয়েছে, ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের এই ইতিবাচক সমঝোতা ও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত বড় ধরনের স্বস্তির বার্তা বহন করে আনছে।






















