চব্বিশের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগের দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে সংঘটিত গুম, অবৈধ আটক, শারীরিক নির্যাতন ও হত্যাসহ মানবতাবিরোধী নানা অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুটি বেঞ্চে বর্তমানে মোট ২২টি মামলার বিচারকাজ চলছে। এসব বিচারাধীন মামলায় মোট আসামি রয়েছেন ২৭৫ জন। যার একটি বিশাল অংশ অর্থাৎ ২০৪ জনই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন, আর গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আটক আছেন মাত্র ৭১ জন আসামি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলমান ২২টি মামলার মধ্যে একটি মামলার বিচারকাজ একদম শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং যেকোনো মুহূর্তে এর রায় ঘোষণা হতে পারে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলাটিতে সাবেক ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফসহ মোট চারজন আসামি রয়েছেন। গত ১০ জুন উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সমাপ্ত হওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল-২ মামলাটির রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ বা সিএভি রাখেন। উল্লেখ্য যে, এই মামলার চারজন আসামির সবাই পলাতক অবস্থায় আছেন।
এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, একই সময়সীমার মধ্যে আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনকাল এবং চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আরও ৪৪টি মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এই তদন্তাধীন মামলাগুলোতে নতুন করে ১৪৪ জন আসামির নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চলমান বিচারিক প্রক্রিয়াধীন মামলাগুলোর মধ্যে বিগত সরকারের ক্ষমতার মেয়াদে সংঘটিত গুম, আটক, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের গুরুতর অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছয়টি। এর মধ্যে র্যাবের টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল এবং ডিজিএফআইয়ের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) সংঘটিত গুম, আটক ও নির্যাতনের দুটি মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ বর্তমানে চলমান রয়েছে। পাশাপাশি শাপলা চত্বরের মহাসমাবেশ কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, রাজধানীর কল্যাণপুরের তথাকথিত ‘জাহাজ বাড়ি’, গাজীপুরের জয়দেবপুর এবং টেকনাফে ঘটে যাওয়া কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোও বিচারাধীন তালিকায় রয়েছে।
আলোচ্য মামলাগুলোর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১-এর অধীনে ৩৪টি এবং ট্রাইব্যুনাল-২-এর অধীনে ১০টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে গুমসংক্রান্ত ১১টি, কথিত ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের দুটি, জঙ্গি দমনে অভিযানের নামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের একটি এবং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ৩০টি মামলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই সার্বিক বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম মন্তব্য করেছেন যে, গুমের ঘটনাগুলোর তদন্ত কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। খুব দ্রুতই এই ১১টি গুমসংক্রান্ত মামলার আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে দাখিল করবে তদন্ত সংস্থা।
এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর থেকে নিখোঁজ থাকা আড়াই শতাধিক ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আরও একটি নতুন মামলা প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া চলছে। এসব অভিযোগের তালিকায় বিএনপির প্রবীণ নেতা এম ইলিয়াস আলী এবং চৌধুরী আলমের গুম হয়ে যাওয়ার মর্মান্তিক ঘটনাগুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।


























