ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে দ্রুত অপসারণের মূল দাবিতে শুরু হওয়া রাজপথের গণআন্দোলন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে ক্ষমতা থেকে না সরানো পর্যন্ত অবিরাম চলবে বলে জোরালো ঘোষণা দিয়েছেন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা ও কংগ্রেস শীর্ষনেতা রাহুল গান্ধী।
গত সোমবার (১২ অক্টোবর ২০২৬) নয়াদিল্লিতে সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে বিরোধীদের পূর্বঘোষিত পদযাত্রার আগে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে রাজপথের আন্দোলনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরে রাহুল গান্ধী বলেন, ‘এটি বিচ্ছিন্ন বা আলাদা আলাদা কোনো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; রাজপথের সকল আন্দোলন মূলত একই সুনির্দিষ্ট দাবির অংশ। নির্বাচন কমিশন ও গণতন্ত্র রক্ষার উদ্দেশ্যে একটিই আন্দোলন এখন সচল রয়েছে—আর তা হলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণ করা। এরপর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধেও এই সর্বাত্মক আন্দোলন ধারাবাহিকভাবে চলবে। আমাদের এই সংগ্রাম কোনো বাধা পেয়ে থেমে থাকবে না।’
সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলে রাহুল গান্ধী দাবি করেন, বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের সামগ্রিক কার্যক্রমে নজিরবিহীন অনিয়ম ও অনাস্থা তৈরি হয়েছে এবং সিইসি জ্ঞানেশ কুমার সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে নিজের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করছেন না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের তীব্র রাজনৈতিক প্রভাব ও চাপের মুখে নতি স্বীকার করে নির্বাচন কমিশন পরিচালনা করা হচ্ছে বলে তিনি বিস্ফোরক মন্তব্য করেন।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা অক্ষুণ্ন রাখতে জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত। পদত্যাগ করে নির্বাচনী ব্যবস্থার অনিয়ম ও জালিয়াতির পেছনে প্রকৃত অর্থে কারা দায়ী, সে বিষয়ে সত্য উন্মোচনে সহায়তা করা তাঁর নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের মূল লক্ষ্য কেবল একজন সিইসিকে পদ থেকে সরানো নয়; বরং সমগ্র নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ভোটাধিকার নিয়ে যে গভীর প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট জবাব আদায় করা।’
নয়াদিল্লিতে বিরোধী বিক্ষোভকারীদের গণমিছিল ও চলাচলে বাধা প্রদান, মোড়ে মোড়ে কাঁটাতারের ব্যারিকেড তৈরি এবং ব্যাপকভাবে পুলিশ মোতায়েন করার কঠোর সমালোচনা করেন কংগ্রেসের শীর্ষ এই নেতা। তিনি মন্তব্য করেন, ‘রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ করে বা পুলিশ নামিয়ে ভারতীয় নাগরিকদের চিন্তা, মতপ্রকাশ ও মনোজগতকে কখনোই অবরুদ্ধ করা যায় না। বিরোধীরা কেবল রাজপথ দখলের প্রদর্শনী করার জন্য নেমে আসেনি, বরং ভারতের গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক কাঠামো রক্ষা করার মূল দাবিতে রাজপথে নেমেছে।’
এদিকে, দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ এবং বিতর্কিত ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে ভারতীয় বিরোধী দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ মোর্চা ‘ইন্ডিয়া জোটের’ আন্দোলন দিন দিন আরও বেশি জোরালো হয়ে উঠেছে।
সোমবার দুপুরে রাহুল গান্ধীর প্রত্যয়ী নেতৃত্বে ইন্ডিয়া জোটের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারা সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে বিশাল পদযাত্রায় শরিক হন। এই ঐতিহাসিক কর্মসূচিতে রাহুল গান্ধী ছাড়াও কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরজেডির প্রধান নেতা তেজস্বী যাদবসহ বিরোধী জোটের শতাধিক জাতীয় পর্যায়ের শীর্ষনেতা অংশ নেন।
তবে সুপ্রিম কোর্টে প্রবেশের মুখে দিল্লি পুলিশ ব্যারিকেড তুলে তাদের পদযাত্রার পথ আটকে দিলে, বিকল্প আইনি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ইন্ডিয়া জোটের পক্ষ থেকে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে একটি বিশেষ রিট আবেদন দাখিল করা হয়। বিশিষ্ট আইনজীবী এস প্রসন্ন বিরোধী জোটের পক্ষে আবেদনটি জমা দেন, যেখানে ১০টি মূল ও সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরা হয়েছে।
রিট আবেদনে ইন্ডিয়া জোটের প্রধান দাবি হলো—সমগ্র ভারতে ভোটার তালিকার বিতর্কিত ও অস্পষ্ট ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়াটির বিষয়ে আইনি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তা অবিলম্বে সম্পূর্ণ স্থগিত ঘোষণা করা।
এছাড়াও ভোটার তালিকায় নাম কাটা, জালিয়াতি এবং পদ্ধতিগত ত্রুটি বা কারচুপি রুখতে সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে এবং শীর্ষ কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি নিরপেক্ষ ও স্বতন্ত্র তদন্ত ও অডিট কমিটি গঠনের জোরালো দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সব গোপন নথি, গুরুত্বপূর্ণ ফাইলের কার্যবিবরণী এবং ডিজিটাল ডাটাবেজের যাবতীয় অ্যাক্সেস লগ আদালতের এখতিয়ারে তলব করারও বিনীত অনুরোধ জানানো হয়।
সাধারণ ভারতীয় নাগরিকদের পবিত্র ভোটাধিকার সুরক্ষার স্বার্থে আবেদনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বুথ-ভিত্তিক যাদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাদের সুনির্দিষ্ট কারণসহ পূর্ণাঙ্গ তালিকা সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করতে হবে। যথাযথ লিখিত নোটিশ এবং শুনানির পূর্ণ সুযোগ প্রদান করা ব্যতীত একক সিদ্ধান্তে ভোটার তালিকা থেকে কারও নাম বাদ দেওয়া যাবে না বলেও আবেদনের মূল দাবিতে উল্লেখ করা হয়েছে।























