ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের অনিয়মবিরোধী বিশাল বিক্ষোভ দমনে পুলিশি গণগ্রেফতার ও ব্যাপক ধরপাকড়ের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দফতর (ওএইচসিএইচআর)। বিক্ষোভের পূর্ব মুহূর্তে এবং চলাকালীন আন্দোলনকারী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের বেআইনি আটকের প্রেক্ষিতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি আন্তর্জাতিক আইন মেনে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছে জাতিসংঘের এই অঙ্গপ্রতিষ্ঠানটি।
গত শনিবার (১০ অক্টোবর ২০২৬) সুইজারল্যান্ডের জেনেভা থেকে দেওয়া এক তাৎপর্যপূর্ণ বিবৃতিতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দফতরের মুখপাত্র থামিন আল-খিতান স্পষ্ট উল্লেখ করেন যে, সাধারণ নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ প্রদর্শনের ওপর যেকোনো ধরনের প্রশাসনিক বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ‘প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতা’ অত্যন্ত কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের তাগিদ দিয়ে অন্যায় ও বেআইনিভাবে আটককৃত সকল নাগরিককে অবিলম্বে এবং কোনো শর্ত ছাড়াই বেকসুর খালাস দেওয়ার জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়। ওএইচসিএইচআর মনে করে যে, বলপ্রয়োগ না করে আন্দোলনকারীদের উত্থাপিত যুক্তিসঙ্গত ক্ষোভ ও উদ্বেগের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে ভারত সরকারের উচিত অবিলম্বে এক অর্থবহ ও ফলপ্রসূ রাজনৈতিক সংলাপে বসা।
উল্লেখ্য, ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগ এবং বিতর্কিত ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর)-এর নামে ভোটারদের বাদ দেওয়ার অনিয়মের অভিযোগে তরুণদের রাজনৈতিক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-এর ব্যানারে দিল্লির ঐতিহ্যবাহী যন্তর মন্তরে গণবিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ সেই বিক্ষোভে মূল প্রবেশপথে বাধা সৃষ্টি করে এবং রাজধানীজুড়ে নজিরবিহীন সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে দুই হাজারের বেশি মানুষকে পুলিশি হেফাজতে নিয়ে নেয়। আটককৃতদের মধ্যে প্রবীণ অধিকারকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী এবং বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আন্দোলন প্রতিহত করতে মেট্রো চলাচল ও ইন্টারনেট সেবার ওপরও সাময়িক বিধিনিষেধ জারি করেছিল পুলিশ।
এদিকে, দিল্লিতে গণগ্রেফতার ও ধরপাকড়ের ঘটনায় জাতিসংঘের দেওয়া ওই সতর্কতামূলক বক্তব্য ও উদ্বেগকে মুহূর্তেই পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত সরকার। জেনেভায় জাতিসংঘে নিযুক্ত ভারতের স্থায়ী মিশন এক পাল্টা বিবৃতিতে জাতিসংঘের এই মন্তব্যকে ‘ভিত্তিহীন, বিভ্রান্তিকর’ এবং দেশটির সার্বভৌম অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ও অযাচিত হস্তক্ষেপ’ বলে তীব্র সমালোচনা করেছে।
ভারতের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় দাবি করা হয়েছে যে, বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতীয় সংবিধানে প্রতিটি নাগরিকের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত করা হয়েছে, তবে জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার স্বার্থে নির্দিষ্ট আইনি সীমার মধ্যে থেকে কিছুটা যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপের একচ্ছত্র অধিকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রয়েছে। দেশটিতে স্বাধীন বিচার বিভাগ, মুক্ত গণমাধ্যম এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সচল থাকায় যেকোনো নাগরিকের অধিকার রক্ষায় তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, দেশের প্রচলিত আইন অনুসরণ করেই যথাযথ পুলিশি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং কোনো নাগরিকের ক্ষোভ থাকলে তার জন্য আদালতের দরজা উন্মুক্ত রয়েছে। তাই জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতরকে ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিষয়ে অযাচিত মন্তব্য না করে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের চলমান বড় বড় আন্তর্জাতিক সংকটের দিকে সমান মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে নতুন দিল্লি।























